বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০
Online Edition

ম্যানচেস্টারে হামলাকারী মুসলমানের শক্রমহলের এজেন্ট

-মো. তোফাজ্জল বিন আমীন
এই নিবন্ধনটি শুরু করছি হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত একটি হাদিস দিয়ে। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, “ভবিষ্যতে মানুষের সামনে এমন একটা যুগ আসবে যখন নাম ব্যতিরেকে ইসলামের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, আল কুরআনের আক্ষরিক তিলাওয়াত ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তাদের মসজিদগুলো হবে বাহ্যিক দিক দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হবে হেদায়াতশূন্য। আর তাদের আলেমগণ হবে আকাশের নিচে জমিনের উপরে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ তাদের মধ্য থেকে ইসলাম/দ্বীন সম্পর্কে ফিতনা প্রকাশ পাবে। অতঃপর সে ফিতনা তাদের দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে।” (বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান অধ্যায়) দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে হাদিসটি খুবই প্রণিধানযোগ্য। আজ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ক্যান্সারের মতো আকার ধারণ করেছে। এমন কোন দেশ নেই যে দেশ ও দেশের নাগরিকরা সন্ত্রাসের ভয়ে আতংকিত নয়। এক কথায় সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সন্ত্রাসের কারণে বিশ্ব মানবতার শান্তি, নিরাপত্তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একের পর এক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছে। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের পর ব্রিটেনে একাধিক সন্ত্রাসী হামলার বহু লোকের প্রাণহানি হয়েছে। সর্বশেষ সন্ত্রাসী হামলায় আবারো রক্তাক্ত হলো ব্রিটেন। সোমবার রাতে দেশটির ম্যানচেস্টার নগরীর এরিনা কনসার্ট হলে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে শিশুসহ ২২ জন নিহত এবং ৫৯ জন আহত হয়েছে। ২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর দেশটিতে এটিই সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। এ ঘটনার নিন্দা ও ধিক্কার জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। নিহতদের মধ্যে শিশু ও কিশোরও রয়েছে। ব্রিটেনের পুলিশ আত্মঘাতী হামলাকারীর পরিচয় প্রকাশ করেছে। বিবিসি জানিয়েছে, পুলিশের ধারণা হামলাকারীর নাম সালমান আবেদি। ২২ বছর বয়সের ওই তরুণের জন্ম ম্যানচেস্টারে। যারাই এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকুক তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হোক। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোন নিরীহ মানুষের জীবন যেন বিপন্ন না হয়।
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের সমস্ত দায় যখন শুধুমাত্র মুসলমানদের উপর লেপন করা হয় তখন সত্যিই মনে দাগ কাটে। ইরাক, পাকিস্তান, সিরিয়া, আফগানিস্থান, মিয়ানমার, লিবিয়া, কাশ্মিরসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের নির্যাতিত মুসলানরা কতটা অসহায় তা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। দুঃখজনকভাবে বিশ্বের যেখানেই সন্ত্রাসী কমকাণ্ড কিংবা জঙ্গি তৎপরতা দেখা দিয়েছে, সেখানেই ঘৃণ্য কর্মের সাথে মুসলমানদের যোগসূত্র আবিষ্কার করা হয়েছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম এটা ইতিহাসে প্রমাণিত। তারপরও পবিত্র ইসলামকে উগ্রবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ইসলামী মৌলবাদীরা সর্বত্র সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে। বিশ্বব্যাপী মুসলিম জাতি ও ইসলামকে কলংকিত করার ষড়যন্ত্র ইসলাম বিদ্বেষীরাই যে করছে এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কারণ ইসলাম কখনো জঙ্গিবাদ কিংবা সন্ত্রাসীর পক্ষে সাফাই গায় না। ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের ধর্মকে কটূক্তি করতে ইসলাম উৎসাহ দেয়নি। পৃথিবীর যে কোন ভূখন্ডে মুসলমানরা যদি স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলন সংগ্রাম করে,তাহলে তাদেরকে সন্ত্রাসী উগ্র মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। অথচ ইসরাঈল, আমেরিকা, রাশিয়া কিংবা মিয়ানমারের মতো দেশ যখন স্বাধীন ভূখন্ড দখল ও নিরপরাধ মানুষের রক্তে হোলি খেলায় মেতে উঠে তখন তাদেরকে কেউ সন্ত্রাসী কিংবা উগ্র হিন্দুবাদী বা মৌলবাদী বলে না।  কিন্তু কেন? এ সকল প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ আলোচনা যা এ ক্ষুদ্র পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। তবে এতটুকু বলা যায় মানবতার ধর্ম ইসলাম ও শান্তিপ্রিয় মুসলিম জাতিকে কলংকিত করার প্রয়াসে ইসলামের দুশমনরা কিছু অশিক্ষিত নামধারী মুসলমানের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। আলকায়দা ও আইএস কার সৃষ্টি এটি বুঝার জন্যে পন্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইতিহাসের পাতায় চোখ ভুলালেই সহজে উত্তর পাওয়া যাবে। সন্ত্রাসী সংগঠনটি খিলাফত প্রতিষ্ঠার নামে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে, যা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তারা ইসলামের সম্মান ও মর্যাদাবোধকে ভুলুন্ঠিত করছে। খেলাফত প্রতিষ্ঠার নামে এভাবে বেসামরিক নিরীহ নারী ও শিশুকে হত্যা করা ইসলাম অনুমোদন করে না। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের নামে যেভাবে নারী ও শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে তার দায় কী পশ্চিমা বিশ্ব এড়াতে পারবে? ইরাক,সিরিয়া,লিবিয়া ও ফিলিস্তিনে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ ও নিপীড়নকে পুঁজি করে এসব সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে কী না সে বিষয়টি পশ্চিমা বিশ্বের বিবেচনা করা উচিত। শুধুমাত্র সামরিক কায়দায় কিংবা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে না। এর পেছনে কোন ধরনের ক্ষোভ রয়েছে কী না তা ও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
নিকট অতীতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অন্তত ছয়টি স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় ১৩০ জন নিহত হয়েছে। ভয়াবহ এ হামলায় দুইশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম এ ধরনের জগন্যতম রক্তাক্ত এক ম্যাসাকার সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটল। ঘটনার ধরন ও প্রকৃতি দেখে নিঃসন্দেহে বলা যায় এটি ছিল দুর্ধর্ষ সিরিজ সন্ত্রাসী হামলা। ফ্রান্সে বছরজুড়ে বেশকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে বছরের শেষ প্রান্তের সন্ত্রাসী হামলাটি ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত। এর আগে ২০০৪ সালে মাদ্রিদে ট্রেনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলো ১৯১ জন। যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১’র হামলার পরে পশ্চিমাগোষ্ঠী বিশ্বের যেখানেই সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তা যাচাই বাচাই ছাড়াই মুসলিমদেরকে দায়ী করেছে। তাদের হাতে যথেষ্ট প্রমাণের অভাব থাকলেও মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাবের কারণে সকল অভিযোগের তীরটা মুসলিমদের দিকে ছুড়েছে। এক অনুসন্ধানে জানা যায়,২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইউরোপে সন্ত্রাসী হামলাগুলোর মাত্র ২%  ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। ২০১৩ সালের ১৫২টি সন্ত্রাসী হামলার মধ্যে মাত্র ১% ও ২০১২ সালের ২১৯টি হামলার মধ্যে মাত্র ৩% হামলা ধর্মীয় উগ্রবাদের ফসল। ওই সময়ের সংগঠিত আক্রমণগুলোর সিংহভাগই উগ্র জাতীয়তাবাদী অথবা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা সংঘটিত। ২০১৩ সালে ৫৫%  হামলার কারণ উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ২০১২ সালের অধিকাংশ হামলা অর্থাৎ ৭৬%  হামলার কারণ জাতীয়তাবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। হিটলারের নাৎসি জার্মান বাহিনী ও এদের দালালদের হাতে নিহত হয় ৬০ লাখ ইহুদি। এ ছাড়া এ গণহত্যার সময় আরো ৫০ লাখ অ-ইহুদিকেও হত্যা করা হয়েছিল। তবে ইতিহাসবেত্তারা নিহতের সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখের কথা উল্লেখ করে থাকেন। এই হত্যাকান্ড চলে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত। এই নৃশংস হত্যা যদি হিটলার না করে কোনো মুসলিম করতেন,তাহলে মুসলিমদের ধরে পাইকারি দরে খুন করা হতো। হিটলার যত মানুষকে খুন করেছেন তার জন্য বিধর্মীরা একটু উচ্চবাচ্য করেননি। কারণ হিটলার তাদেরই স্বগোত্রীয় নেতা ছিলেন।
ব্রিটের জনগণের সাথে আমাদের রক্তের সর্ম্পক নেই। এমনকি তারা আমাদের ভাষা ভাষি মানুষও নন। তারপরেও তাদের জন্য হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা একজন মুসলিম হিসেবেই হয়েছে। হৃদয়ের সমস্ত ঘৃণা দিয়ে এই হত্যার নিন্দা জানাচ্ছি। এমনও তো হতে পারে এই হামলার নেপথ্যে কোন মুসলমান নন অন্য কেউ জড়িত । শুধুমাত্র মুসলমানদের শায়েস্তা করার জন্যে এই হামলা করা হয়েছে। কারণ ইউরোপের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ব্রিটেনে মুসলমানরা ভালো অবস্থানে রয়েছে। দেশটিতে মুসলমানরা মূলধারার রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। তারা ধমীয় ও নাগরিক স্বাধীনতা ভোগ করতে কোন বাধার সম্মুখীন এতো দিন হতো না। এখন যে ভাবে অব্যাহত হামলা হচ্ছে তাতে ইউরোপে মুসলমানদের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কার্যত এসব হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মুসলমানেরা। গোটা বিশ্বে ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। অথচ প্রকৃত মুসলমানদের চেয়ে মানবিক,হিতৈষি ও কল্যাণকামী মানুষ অন্য ধর্মে খুঁজে পাওয়া মেলা ভার। ইসলামে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভীতি প্রদর্শন, সন্ত্রাস, জুলুম, পীড়ন, নির্যাতন করাকে ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। যারা ইসলামের নামে মানুষ হত্যা করছে,বোমাবাজি করছে,সন্ত্রাস করছে তারা ইসলামের প্রকৃত শত্রæ। মুসলিম পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি ইসলামের নামে সৃষ্ট জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদের অবসান ঘটনোর জন্যে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার বিস্তার সর্বত্র চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ