শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

রামপাল নিয়ে ঝাঁঝ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ঝাঁঝ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে বলেই মনে হচ্ছে। সম্প্রতি সরকার জাতিসংঘকে চিঠি দিতে বাধ্য হয়েছে যে, এটি হলে পরিবেশের কোনও ক্ষতি হবে না। অথচ পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা সুন্দরবনের কাছে এমন মেগা প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সোচ্চার এবং প্রতিবাদমুখর। তাঁরা বলছেন, এটি হলে সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। এর ছাইয়ে দূষিত হবে সুন্দরবনের সব নদীনালা। নদ-নদীর মাছসহ সকলপ্রকার জীবজন্তু বিলুপ্ত হয়ে যাবে। গাছপালা যাবে মরে।
সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের ঐতিহ্য নয়। এটি হচ্ছে এখন বিশ্বঐতিহ্যের অংশ। সুন্দরবন ও এর জীব এবং উদ্ভিদবৈচিত্র্য রক্ষা করবার দায়িত্ব কেবল বাংলাদেশেরই নয়। এ দায়িত্ব সমগ্রবিশ্বের। কাজেই এখানে পরিবেশবিরোধী কোনও স্থাপনা তৈরি করতে চাইলে তা দেখবে জাতিসংঘ। এটি হচ্ছে আশার কথা। নিজের জিদরক্ষা কিংবা কোনও বন্ধুরাষ্ট্রকে খুশি করতে যদি বর্তমান ক্ষমতাসীনরা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে দৃঢ়সংকল্প হন তাহলে নিশ্চয়ই জাতিসংঘ চুপ করে বসে থাকবে না। তাই জাতিসংঘকে পক্ষে রাখতেই উল্লিখিত চিঠি পাঠাবার মূল মর্মার্থ।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে,  রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন এবং পরিবেশের কোনও ক্ষতি হবে না। এছাড়া কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ হবে কম। কমদামে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ দেয়া যাবে। কিন্তু সরকারের এমন প্রচারণায় পাবলিক আর মাতে না। জনগণ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কেউ কেউ সুর মেলাচ্ছেন। টিভি’র টকশোতে গিয়ে আমতা আমতা করে কথা বলতে চেষ্টা করছেন আমলাদেরও কেউ কেউ। মুখ দিয়ে ফেনা বেরোয় যুক্তি দিতে দিতে। কিন্তু তাঁরা হালে পানি পাচ্ছেন না। বলতে বলতে খেই হারিয়ে ফেলছেন। তার মানে নিজেরাও বোঝেন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে বারোটা বাজবে পরিবেশের। তবু চাকরি রক্ষার জন্য সরকারকে সাপোর্ট করা ছাড়া তাঁদের কোনও উপায় নেই। মন্ত্রী, এমপি ও আমলারা বলছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র না হলে কম দামে বিদ্যুৎ দেয়া যাবে না। গ্যাস ও ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উদপাদন করলে এর মূল্য আরও বাড়বে। এমন হুমকিও দেয়া হচ্ছে জনগণকে। ইতোমধ্যে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে সরকার। আরও বাড়াবার প্রক্রিয়া চলছে।
 আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল, ফার্নেস অয়েলের দাম কমেছে কয়েক দফা। কিন্তু এখানে কমানো হয়নি। জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজার অনুপাতে করলে এবং আমদানি শুল্ক কমালে যে তেলের দাম পড়ে মাত্র ২৬ টাকা, তা নেয়া হয় ৫৫/৬০ টাকা করে। কেন তেল নিয়ে এই তেলেসমাতি? জনগণের পকেট কাটবার রাস্তা খোলা রেখে একথা-ওকথা বলে কোনও লাভ নেই।
আমাদের পরিবেশবাদীদের মধ্যে বাম ও ডান উভয় ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা আছেন। এদের অনেকেই নামকরা শিক্ষাবিদ। পবিবেশবিজ্ঞানীরাও রয়েছেন এ আন্দোলনের সঙ্গে। তাঁরা তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বলছেন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে পরিবেশের সর্বনাশ হবে। সুন্দরবনের ক্ষতি হবে বেশি। ধীরে ধীরে এ বনভূমি মরুভূমিতে পরিণত হবে। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদীরা এটা সমর্থন করছেন। জাতিসংঘে চিঠি লিখলে সত্য মুছে ফেলা সম্ভব নয় বলেই মনে হয়।
পিডিবি বলছে এখন বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি নেই। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি। তাহলে বিদ্যুৎ যাচ্ছে কোথায়? মন্ত্রী বলছেন উৎপাদন কম। লোডশেডিংয়ের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন কয়েকদিন আগে। তবে দুঃখ প্রকাশ করে বা মাফ চেয়ে পাড় পাবার উপায় নেই। বিদ্যুতের বিল কম নেয়া হয় না।
কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ নিয়ে যথেষ্ট কেলেঙ্কারি হয়েছে। বহু যুক্তি দেয়া হয়েছে বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে। চাপানো হয়েছে বিলের বোঝা। কিন্তু জনগণ তা মেনে নেয়নি। সময় আসলে এর ঝাল ক্ষমতাসীনদের বুঝতে হবে বৈকি।
সারাদেশে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। একবার নয় বারবার। গেলে আর আসবার মনে থাকে না বিদ্যুৎবাবুর। দুই-তিন ঘণ্টা পর এসেই আধা-একঘণ্টা থেকে আবারও হাওয়া। এমনই বিদ্যুতের আসা আর যাওয়ার খেলা অব্যাহত দেশব্যাপী। ঢাকা মহানগরীতেও একই অবস্থা। কোনও ছাড় নেই। গ্রামে কিছু গাছগাছালি আছে বলে বাঁচা। বাতাসও পাওয়া যায় সেখানে। কিন্তু শহরের অবস্থা করুণ। শহরে বিদ্যুৎ গেলে মানুষের দমবন্ধ হবার উপক্রম। এই গরমে দিনরাত সমানে বিদ্যুৎ যায়। বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করে লাভ হয় না।
 পরিবেশবাদী শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী, পরিবেশবিজ্ঞানীরা যেভাবে রামপাল নিয়ে এগোচ্ছেন তাতে মনে হয় সরকারের জিদ হালে পানি হারাতে বসেছে। এছাড়া এই রামপাল সরকারের জন্য গলার কাঁটাতেও পরিণত হতে পারে। কেন না, দেশের সিংহভাগ মানুষ সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপালের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চান না। সরকারের প্রচারণায় মানুষ আর বিভ্রান্ত হবেন বলে মনে হচ্ছে না।
 আগেই বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লা ছাই হয়ে উড়ে গিয়ে সুন্দরবনের গাছগাছড়া ধ্বংস করে ফেলবে। নদীতে পড়ে এর পানি দূষিত করবে। সবপ্রজাতির মাছসহ জলজপ্রাণি মরে যাবে। স্থলপ্রাণি তথা হরিণ, বাঘ, ভল্লুক, বানর এবং পাখপাখালির জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে। মানে মারাত্মক পরিবেশ দূষণের দরুন বিরাট এলাকা মানুষেরও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। আশপাশের কৃষিজমি ধ্বংস হবে। ফসল উৎপাদন কমে যাবে। এছাড়া নদীপথে ভারত থেকে কয়লা আনতে গিয়েও দূষণ ছড়িয়ে পড়বে মারাত্মকভাবে। অর্থাৎ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনওরকমেই সুবিধাজনক হবে না। বিদ্যুতের চাহিদা অবশ্যই মিটাতে হবে। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিকল্প নেই। তবে তা রামপাল ছাড়াও অন্যত্র হতে পারে।
আমাদের সকলের মনে রাখা খুব দরকার যে, সুন্দরবন শুধু একটা বনই নয়, এখানে কিছু সবুজ গাছপালা, বনজঙ্গল, নদীনালা, জীবজন্তুই নেই; এটি বিশ্ব-ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য। এ বন কেবলই আমাদের এমনও নয়। এ বন দক্ষিণ এশিয়ারতো বটেই, এটি বিশ্বধরিত্রীর ফুসফুস। এ ফুসফুস নিরাপদ ও অক্ষত না থাকলে পৃথিবী অসুস্থ হয়ে পড়বে। দক্ষিণ এশিয়াসহ ধরিত্রীর বিপুল অংশ হয়ে পড়বে বিপন্ন। একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে আমরা কি পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ অংশকে পঙ্গু করতে চাই? নিশ্চয়ই না।
যাই হোক, সামনে নির্বাচনের দিনক্ষণ দ্রুতই এগিয়ে আসছে। বিএনপি-জামায়াত জোটকে তছনছ করে দেয়া সম্ভব হলেও বর্তমান ক্ষমতাসীনরা নিরাপদ নন বলে মনে হয়। তাঁরা নিজেরাও সেটা অনুভব করছেন নিশ্চয়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেখানেই যাচ্ছেন, ভোট প্রার্থনা করছেন। অন্যদের অবশ্য মিটিংমিছিল করতেও দিচ্ছেন না। তবে ৫ জানুয়ারি যতো সহজে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল আগামীতে তা সম্ভব নাও হতে পারে। তাছাড়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ দক্ষিণ এশিয়াসহ ধরিত্রীর ফুসফুস বলে খ্যাত সুন্দরবন ধ্বংস করে কোনও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেবেন না এদেশের সাধারণ মানুষ। এই সহজ কথা ক্ষমতাসীনদের বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় আদৌ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ