বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

মাহে রমযানে মু’মিনের করণীয় ও বর্জনীয়

-মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
মাহে রমযান মুমিনের জন্য বড়ই মূল্যবান মাস। মু’মিন এ মাসকে নেয়ামত মনে করে। এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে জান্নাতী করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চলায়। এ মাস যেহেতু রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস সেহেতু এ মাসের রহমত, মাগফেরাত ও নাজাত লাভ করে নিজেকে ধন্য করতে মু’মিন সদা ব্যস্ত থাকে।
করণীয় : দিনে সিয়াম রাতে কিয়াম: রমযান মাসের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো সিয়াম পালন। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- (হে মুমিনগণ) তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো (সূরা বাকারা-১৮৩)। মাহে রমযানের সিয়াম সাধনা আল্লাহর অনন্ত অসীম রহমতের দ্বার খুলে দেয় এবং মু’মিনকে আল্লাহর গুনে গুনান্বিত করে তোলে। মানব জীবনকে পূত পবিত্র এবং সুন্দরতম করে গড়ে তোলার একটি অত্যন্ত কার্যকরি পন্থা হলো মাহে রমযানের রোযা। সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার, পাপাচার প্রভৃতি কাজ পরিহার করে মানুষ যে একটানা সংযম সাধনা করে তার ফলই হলো দয়াময় আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও করুণা লাভ। আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির তথা আত্মার পবিত্রতা লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয় রমযানের এই রোযা। সুতরাং যথাযথ হক আদায় করে রোযা পালন করা মু’মিনের কর্তব্য। মাহে রমযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো তারাবীর নামায। এ নামাযের গুরুত্ব অধিক। এ নামায আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি অন্যতম মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (সা:)  বলেছেন- যে ব্যক্তি রমযান মাসের রাত্রে ঈমান ও আত্মসমালোচনা সহকারে নামায আদায় করে, তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয় (সহীহ মুসলিম)। অপর হাদীসে রয়েছে- রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন- নিশ্চয়ই রমযান মাসের রোযা আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের উপর ফরয করেছেন। আর আমি তোমাদের জন্য সুন্নতরূপে চালু করেছি তারাবীর নামায। রমযান মাসব্যাপী আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদতে কিয়াম তথা তারাবীর নামায মুমিনকে গুনাহ মাফের সুযোগ করে দেয়। মহানবী (সা:)  বলেছেন যে ব্যক্তি এ মাসের রোযা পালন করবে এবং আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়াবে ঈমান ও আত্মসচেতনতা সহকারে, সে তার গুনাহ হতে নিষ্কৃতি লাভ করে সেদিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল (নাসায়ী, মুসনাদ আহমদ) সুতরাং মু’মিনের এ আমলটি গুরুত্বের সাথে করা উচিত।
কুরআন তিলাওয়াত : রমযান মাসের আরেকটি নাম ‘শাহরুল কুরআন’ তথা কুরআনের মাস। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- ‘রমযান মাস, এতে রয়েছে মানুষের দিশারী এবং সৎ পথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যের সাথে পার্থক্যকারী রূপে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। সূরা বাকারা- ১৮৫)। সুতরাং এ মাসে অধিক পরিমানে কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করা আবশ্যক। অনুবাদ ও তাফসীর সহ পড়ার জন্য সচেষ্ট হওয়া কর্তব্য। সহীহ শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করার প্রশিক্ষণ নেয়ার মূখ্য সময় এ মাস। কুরআন মাজীদের একটি অক্ষর রমযান ছাড়া তিলাওয়াত করলে ১০টি নেকী পাওয়া যায়। অতএব, রমযানে পড়লে কত বেশী নেকী পাওয়া যাবে তা চিন্তা করে অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত।
নফল নামায : রমযান মাস পুণ্য লাভের বসন্তকাল। এ মাসের একটি নফল কাজ অন্যমাসের ফরযের সমতুল্য। একটি ফরয অন্য সময়ের ৭০টি ফরজের সমতুল্য (মিশকাত পৃষ্ঠা ১১৫)। তাই মু’মিনের কর্তব্য অধিক হারে নফল নামায আদায় করা। সেহেরী খাওয়ার জন্য উঠে তাহাজ্জুদ নামায, সূর্য উঠার পর ইশরাকের নামায সালাতুদ্দোহার (পূর্বাহ্নের) নামায, সালাতুত তারাবীহ, আওয়াবীন এবং পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের সাথে সংশ্লিষ্ট সুন্নত ও নফল নামায সমূহ রমযান মাসে গুরুত্বের সাথে আদায় করা উচিত। মহানবী (সা:) বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দাহ আমার নিকটবর্তী হয়, এমনকি আমি তাকে ভালোবাসি। অতঃপর যে হাত দিয়ে সে ধরে তা আমি হয়ে যাই, যে পা দিয়ে সে চলে তা আমি হয়ে যাই, যে তাকে ভালোবাসল সে আমাকে ভালোবাসল, আর যে তাকে কষ্ট দিল সে আমাকে কষ্ট দিল।
যাকাত ও দান-সদকা : এ মাসে যাকাত ও দান-সদকা বেশী করে করা উচিত। এ মাসের একটি নাম হলো শাহরুন মুয়াসাত তথা সমবেদনার মাস। এ মাসে অসহায় লোকদেরকে আর্থিক সহযোগিতা করে সমবেদনা দেখানো কর্তব্য। সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ রোযার অন্যতম উদ্দেশ্য। ধনীরা রোযার মাধ্যমে ক্ষুধার্তদের জঠর জ্বালা অনুভব করার সুযোগ লাভ করে। রোযাদার দুঃখী দুস্থদের পাশে দাঁড়াবার তাগিদ অনুভব করে। আর এটাই রোযার কাম্য। প্রত্যেকটি মু’মিনের উচিত নিজেদের সাধ্যানুযায়ী দান-সদকার মাধ্যমে গরীব-মিসকীনদের দুঃখ- বেদনা দূর করা। রাসূল (সা:) বলেন- যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে পানি পান করাবে তাকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন আমার হাউয থেকে পানি পান করাবেন, যার ফলে জান্নাতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সে পিপাসার্ত হবে না (মিশকাত পৃষ্ঠ নং ১৭৩)।
ক্ষমা প্রার্থনা : রাসূল (সা:) বলেছেন এ মাসে চারটি কাজ বেশি বেশি কর। দু’টি এমন যা দিয়ে তোমরা তোমাদের প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জন করবে এবং দু’টি কাজ এমন যা ছাড়া তোমাদের গত্যন্তর নেই। ‘তোমাদের প্রভুর সন্তুষ্টি বিধানকারী কাজ দু’টি হলো কালেমা পাঠ এবং বেশি বেশি ইস্তেগফার করা। আর যে দুটি কাজ করা ব্যতীত গত্যন্তর নেই তা হলো- আল্লাহর কাছে জান্নাত লাভের দোয়া করা এবং দোযখ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা। বিশেষ করে ক্বদরের রজনীতে খুব বেশী করে ইসতেগফার করা কর্তব্য।
মানব সেবা : মহানবী (সা:) সাতটি কাজের আদেশ করেছেন। যেমন- রোগীর সেবা করা, জানাযায় অংশগ্রহণ করা, হাসির উত্তর দেওয়া, সালামের উত্তর দেয়া, কেউ ডাকলে তার ডাকে সাড়া দেয়া, শপথ করলে তা পূরণ করা, মযলুমকে সাহায্য করা। রমযান মাসে মানবসেবা বেশি করে করা মু’মিনের কর্তব্য। মানুষকে দান ও সাহায্য সহযোগীতা করা পক্ষান্তরে, আল্লাহ তায়ালাকেই দান করা। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন- হাশরের দিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন আমি তোমার নিকটে খাদ্য চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে খাদ্য দাওনি, আমি তোমার নিকট পানি চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে পানি দাওনি, আমি তোমার কাছে বস্ত্র চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে বস্ত্র দাওনি, মানুষ তখন আশ্চর্য হয়ে বলবে- আল্লাহ! আপনিইতো সকলকে অন্ন, বস্ত্র, পানি ইত্যাদি দান করেন, কখন আপনি আমাদের কাছে চেয়েছেন, আল্লাহ তায়ালা বলবেন- আমার অমুক বান্দাহ তোমার কাছে অন্ন-বস্ত্র চেয়েছিল, তুমি তাকে দাওনি, তাকে দিলে আমাকে দেয়া হতো এবং আমার কাছে আজ তার পুরস্কার পেতে।
সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ : মাহে রমযানে যে কাজটি সবচেয়ে অধিক করা কর্তব্য তাহলো আমরে বিল মায়ারুফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার তথা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দেওয়া। মহানবী (সা:)  বলেছেন- যারা সৎ কাজের আদেশ দেন এবং অসৎ কাজে বাধা দান করেন, তারা আল্লাহর প্রতিনিধি, রাসূল (সা:)  এর প্রতিনিধি এবং কিতাব তথা কুরআনের প্রতিনিধি।
আত্মশুদ্ধি : মু’মিন রোযার দ্বারা আত্মাকে পরিশুদ্ধি করে। তাছাড়া রোযার দ্বারা মু’মিন ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদি দমন করতে সক্ষম হয় এবং একজন পরিপূর্ণ মুত্তাকী ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হিসেবে পরিগনিত হয়। রোযার প্রকৃত উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন। আর তাকওয়ার বৈশিষ্ট হলো ৬টি। ১. সত্যের সন্ধান ২. সত্য গ্রহণ ৩. সত্যের উপর সুদৃঢ় ও প্রতিষ্ঠিত থাকা ৪. আল্লাহ ভীতি ৫. দায়িত্বানুভুতি ৬. জবাবদিহিতা।
যিকির-আযকার : যিকির তিন প্রকার। যেমন- ১. অন্তরে আল্লাহ তা’য়ালাকে স্মরণ করা ২. মুখে যিকিরের বাক্য উচ্চারণ করা ৩. আমল করা। যেমন- নামায, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি। মু’মিন রমযান মাসে তিন প্রকারের যিকির বেশি বেশি করে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার ব্যাপারে সচেষ্ট হয়।
বর্জনীয় :
সর্বপ্রকার পাপাচার বর্জন : রমযান তাকওয়া অর্জনের মাস। নিজেকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করার মাস। তাই এ মাসে সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি, উৎপীড়ন, ব্যবসায় ভেজাল, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, পরনিন্দ, গীবত, হিংসা, বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীল গান-বাজনা, ছায়াছবি, অশ্লীল চিত্র মোবাইলে, ইন্টারনেটে খারাপ কিছু দেখা ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা:)  বলেছেন- রোযা রোযাদারের জন্য ঢালস্বরূপ, যতক্ষণ একে ছিন্ন করা না হয় অর্থাৎ রোযা রোযাদারকে পাপাচার থেকে রক্ষা করে, যদি একে মিথ্যা, চোগলখুরী ও হারাম ভক্ষণের দ্বারা ছিন্ন করা না হয়। তিনি আরো এরশাদ করেন অনেক রোযাদার এমন আছে যাদের পানাহারের কষ্ট ছাড়া রোযার দ্বারা কোন লাভ হয়না। কারণ সে পাপাচার থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি।
পার্থিব ব্যস্ততা কমিয়ে ইবাদতে অধিক আত্মনিয়োগ : মাহে রমযানে নিজেদের পার্থিব ও বৈষয়িক ব্যস্ততা কমিয়ে বেশিরভাগ সময় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে এবং আত্মজিজ্ঞাসায় লিপ্ত থাকা মু’মিনের একান্ত কর্তব্য। মহানবী (সা:)  বলেছেন- তোমরা হিসাবের সম্মুখীন হওয়ার পূর্বে নিজেদের হিসাব গ্রহণ কর। ইমাম শাফেয়ী (রহ) বলেছেন- বুদ্ধিমান ঐ ব্যক্তি যে দুনিয়াকে বর্জন করে, দুনিয়া তাকে তাকে বর্জন করার পূর্বে।
লেখক : প্রধান ফকীহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ