শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

তাড়াশে সমাজচ্যুত তিন পরিবারের মানবেতর জীবন

তাড়াশ : প্রায় দেড় বছর ধরে সমাজচ্যুত অসহায় ৩টি পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে   -সংগ্রাম

শাহজাহান তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদতা : এক বছর তিন মাস ধরে সমাজচ্যুত থাকা তিন আদিবাসী পরিবার মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ইউপি নির্বাচন কেন্দ্র করে পরিবার তিনটি সমাজচ্যুত করে রেখেছে স্থানীয় চেয়ারম্যান। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই পরিবারগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখলে ১০ বার জুতা পেটা আর ১০ হাজার টাকা জরিমাণা দিতে হবে। সমাজচ্যুতের দান করা জায়গাতে মন্দির থাকায় পূজা-অর্চনা বন্ধ রয়েছে। ঘটনাটি জেলার তাড়াশ উপজেলার তালম ইউপির আদিবাসী অধ্যূষিত তারাটিয়া গ্রামের। মঙ্গলবার সমাজচ্যুত জীবন-যাপনের অবসান চেয়ে ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মুহম্মদ মনসূর উদ্দিন বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন পরিবারগুলোর পক্ষে শ্রী সধু চন্দ্র। লিখিত অভিযোগ এবং সমাজচ্যুত পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২৩ এপ্রিল ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তালম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্বাস উজ্জামান সন্দেহ করেন শ্রী সধু চন্দ্র, শ্রী মন্টু চন্দ্র এবং শ্রী মদন চন্দ্র নির্বাচনে তাকে সহায়তা করেনি। যে কারণে শিশু ছেলে মেয়েসহ তিনটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। 

১৩ মাস ধরে সমাজচ্যুত থাকা শ্রী সধু চন্দ্র বলেন, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কয়েকদিন পর চেয়ারম্যান সাহেব পাড়ার লোকজন নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে গ্রাম্য শালিস বসান। সেই শালিসে অন্যায়ভাবে তাদের সমাজচ্যুত করে তা  ঠিকঠাক পালনের জন্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর চাপিয়ে দেন তিনি। বিষয়টি উপজেলার সর্বচ্চ পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে বারবার জানানো হয়েছে। তবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেনি একজন মানুষও। ছয় মাসের শিশু মাটিতে গড়াগড়ি খায় তবু কোলে তুলে নিতে ভয় পায় সকলে। কেউ মারা গেলে দাহ পর্যন্ত করতে দেওয়া হয় না। এ সময় সধু আরো বলেন, সমাজচ্যুত করায় পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তিনি। ১০ কাঠা জমিতে ধান চাষ করে বছরের খোরাক জোটে তার। কিন্তু সমাজচ্যুত হওয়ার পর থেকে জমিতে কেউ সেচ দেয়না। নিরুপায় হয়ে এক বছর পতিত থাকার পর এবারে শুধুমাত্র ১০ কাঠা জমির ওপর স্যালো মেশিন বসিয়ে ইরি আবাদ করেছেন সে। এ ছাড়া এলাকায় যত চুরি-ডাকাতি হয় সবগুলোতেই তাদের মিথ্যে মামলা দিয়ে ফাঁসানো হয়। 

শ্রী মন্টু চন্দ্র বলেন, ৫২ পরিবার নিয়ে তাদের সম্প্রদায়ের রাধা গোবিন্দ মন্দিরটি তার বাড়িতে হওয়ায় ভয়ে পূজা অর্চনা দেয়না  পাড়ার লোকজন। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে মন্দিরটি।

শ্রী মদন চন্দ্র বলেন, দিনমজুরের কাজ না করলে ভাত জোটেনা। সমাজচ্যুত থাকায় গ্রামের কেউ কাজে নিতে সাহস পায়না। দূরের গ্রামগুলোতে কাজ করে দু’বেলা ভাতের যোগার করতে হয় তাদের। নিত্য প্রয়োজনীয় বাজার সদাই করার জন্য দূরের দোকানে যেতে হয়। কারণ, সমাজচ্যুতের কাছে কেনা-বেচা নিষেধ।

সধুর স্ত্রী সবিতা রানী বলেন, তার ভাগিনা রঘুনাথ খাওয়ার জন্য একটা তাল দেওয়ার অপরাধে শালিস বসিয়ে তাকে জুতা পেটা করা হয়। এ ছাড়া তারই ভাতিজা সুরেস একদিন গোপনে মদনের বাড়িতে গেলে তাকেও জুতা মারা হয়। আর এসব সাজা-শাস্তির ব্যবস্থা করে থাকেন ওই আদিবাসী সমাজেরই বিমল চন্দ্র, সুজন চন্দ্র, নলিন চন্দ্র, নিখিল চন্দ্র এবং নৃপেন চন্দ্র।

এ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান আব্বাস উজ্জামান বলেন, যে সভায় ওই পরিবারগুলোকে সমাজচ্যুত করা হয় সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম না। সমাজচ্যুতের বিষয়টিও আমার বোধগম্য নয়। আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক এসব করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ মনসূর উদ্দিন বলেন, লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। পুলিশকেও ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ