মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দেশের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিচার বিভাগ শতভাগ ভালো

 

স্টাফ রিপোর্টার : ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিতে ষষ্ঠ দিনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা সরকারের এটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেছেন, বিচার বিভাগের প্রতি দেশের ৯০ ভাগের বেশি মানুষের আস্থা আছে। দেশের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিচার বিভাগ ১০০ ভাগ ভালো। 

এদিকে রিট আবেদনের কৌসুলি আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেছেন, জনগণের পক্ষ থেকে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর কোন দাবি আসেনি। একটি মামলার প্রেক্ষাপটে স্পিকারের রুলিং এসেছিল। এছাড়া চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাহাত্তরের সংবিধানের বিচারকদের অপসারণের বিধান বিলোপ করেছিলেন। ফলে যেটা বঙ্গবন্ধু করেছিলেন, তারই অনুসারী হিসেবে সেটা সমর্থন করা দরকার। যদি কেউ এটির বিরোধিতা করেন, তাহলে সেটি সঠিক হবে না।

উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিলের যুক্তিতর্কের সময় প্রধান বিচারপতি এ মন্তব্য করেন। 

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এ শুনানি চলছে। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।

গতকাল সকাল ৯টা ৯ মিনিটের দিকে ষষ্ঠদিনের শুনানি শুরু হয়। সরকার পক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম অসমাপ্ত বক্তব্য শেষ করেন। এরপর সকাল ১১টার বিরতির আগেই রিটকারীদের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বক্তব্য শুরু করেন। দুপুর পৌনে ১টার দিকে তার বক্তব্যও শেষ হয়। এরপর আদালতের নিযুক্ত করা ১২ জন এমিকাস কিউরির (আদালতকে আইনগত ব্যাখ্যা দিয়ে সহায়তাকারী) মধ্যে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম তার মতামত প্রদান করতে শুরু করেন। তার বক্তব্য অসমাপ্ত অবস্থায়ই দুপুর সোয়া ১টায় দিনের শুনানি মুলতবি করেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার আবারো এই মামলার আপিল শুনানি হবে।

সকালে শুনানির একপর্যায়ে আদালতের ভাবমর্যাদা বিষয়ে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে উদ্দেশ করে বলেন, কোর্টে যা হচ্ছে তা নিয়ে বিচারপ্রার্থী ও জনগণের একটা গণশুনানি নেন।

জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, বর্তমানে বিচারবিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ৯০ ভাগের বেশি। চৌকি আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। আমি বাঁশখালীর চৌকি আদালতে গিয়েছি। ওখানে যতজন বিচারপ্রার্থী আসে, ডিসি অফিসেও এত আসে না। বাংলাদেশের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিচার বিভাগ ১০০ গুণ ভালো। আপনারা তো প্রধান বিচারপতিকে পঙ্গু করে রাখার...। তখন এটর্নি জেনারেল বলেন, আই এম নট টোটালি হ্যাপি।

এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি চেয়েছি, যাদের লেখাপড়া আছে, যোগ্যতা আছে, তাদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিতে। কিন্তু দেড় বছরেও নিয়োগ হয়নি। আপনারা যেটা চাচ্ছেন, আপনিও জানেন, সবাই জানে।

এটর্নি জেনারেল বলেন, মার্শাল লতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করা হয়েছে। এটা সংবিধানের বড় লজ্জা। সেখানে রিলিজিয়াস (রাষ্ট্রধর্ম) বিষয়টাও আছে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ওখানে কম্প্রোমাইজ করলে এখানে নয় কেন?

শুনানির একপর্যায়ে এটর্নি জেনারেল বলেন, সমস্ত পান্ডিত্য আমাদের, আপনাদের। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধানে হাত দিতে পারেন না। যোগ করা যেতে পারে।

আপিল বিভাগ বলেন, জুডিশিয়াল ইমপ্রুভমেন্ট থাকবে না? জুডিশিয়াল রিভিউ থাকবে না? উঠিয়ে দেন। জনগণের অধিকার প্রশ্নে আমরা সংবিধানের এ টু জেড ব্যাখ্যা করব। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে।

শুনানির একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি ইংল্যান্ডের জুডিশিয়ারি নিয়ে একটি লেখা এটর্নি জেনারেলকে পড়তে দেন। পড়া শেষে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি যে লিখিত যুক্তি দিয়েছেন, এ লেখা অনুসারে সেটি না জেনেই ইংল্যান্ডের ব্যাপারে দিয়েছেন। পৃথিবীতে একমাত্র সভ্য দেশ ইংল্যান্ড, যেখানে অলিখিত সংবিধান পালনে চুল পরিমাণ এদিক-সেদিক হয়নি। ব্রেক্সিটে হেরে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কী চেতনা, কী মানসিকতা!’

এটর্নি জেনারেল বলেন, আমি আপনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। ইংল্যান্ড বিদেশিদের লুণ্ঠন করেছে। তাদের সভ্য বলতে পারেন না।

প্রধান বিচারপতি বলেন, লুণ্ঠন অন্য জিনিস। আমেরিকাও লুণ্ঠন করছে। এটর্নি জেনারেল বলেন, তাদের (ইংল্যান্ড) আইনের শাসন ডেভেলপ করেছে-এটা বলতে পারেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ইয়েস, তারা তাদের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পেরেছে। এ সময় এটর্নি জেনারেল বলেন, অন্যদের লুণ্ঠন করে নিজের নাগরিকদের সুরক্ষা দিয়েছে।

এর আগে গত ৮, ৯ এবং ২১, ২২ ও ২৩ মে এ মামলার শুনানি হয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় আপিল শুনানিতে সহায়তার জন্য ১২ জন আইনজীবীকে এমিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়ে তাদের লিখিত বক্তব্য আদালতে জমা দিতে বলেন আপিল বিভাগ। 

ষষ্ঠ দিনের শুনানিতে রিটের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলোপ করেছিলেন। যেটা বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন, আমরা মনে করি, তারই অনুসারী হিসেবে সেটা সমর্থন করা দরকার। যদি কেউ এটির বিরোধিতা করেন, তাহলে আমি মনে করি সেটি সঠিক হবে না।

মনজিল মোরসেদ বলেন, এটর্নি জেনারেল শুনানিতে সব সময় বলার চেষ্টা করেন যে, ষোড়শ সংশোধনী করে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে গেছেন। এ বিষয়ে আমরা বলেছি, বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চেতনা এবং যার নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার নেতৃত্বে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল। সেই সংবিধানের প্রণেতা, আমাদের জাতির পিতার নেতৃত্বেই জাতীয় সংসদ থেকে বিচারক অপসারণের ক্ষমতাটা সংসদ থেকে নিয়ে আসার একটি আইন পাস হয়েছিল চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। তিনি বলেন, যেটি বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন। আমরা মনে করি, তারই অনুসারী হিসেবে সেটিকে সমর্থন করা দরকার। 

মনজিল মোরসেদ আরো বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীতে তো বিচারক অপসারণের বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেল। সবার সঙ্গে আলোচনা করে এ আইনটা করা হলো। হঠাৎ করে কিছুদিন পরেই জনগণের পক্ষ থেকে কোনো সভা-সেমিনারে কেউ কখনো কোনো দাবি তোলেননি যে, এ আইনটির পরিবর্তন করা দরকার। কিন্তু কয়েকটি প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছিল।

তিনি বলেন, যেমন একটি মামলাকে কেন্দ্র করে আদালতের মন্তব্য নিয়ে স্পিকার রুলিং দিয়েছিলেন। স্পিকারের রুলিং নিয়ে আলোচনায় কয়েকজন সংসদ সদস্য সংসদে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন যে আমরা এই ক্ষমতটা সংসদে নিয়ে আসব।’ শুধু এ ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপরই এই ষোড়শ সংশোধনী করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনজিল মোরসেদ বলেন, আমরা যুক্তিতে প্রথমেই ষোড়শ সংশোধনীর প্রেক্ষাপট তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। হঠাৎ করেই কেন এ সংশোধনী? আরেকটি যুক্তিতে বলেছি, এটর্নি জেনারেল আপিল বিভাগে বক্তব্য রেখেছিলেন যে,পঞ্চদশ তম সংশোধনীটি ছিল কাটিং এন্ড পেস্টিং, কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, ১৫তম সংশোধনী যখন পাস হয়, তখন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে পার্লামেন্টে আইন পাসের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। সে সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। সেই হিসেবে তার নির্দেশেই ওই দিন সংশোধনী হয়েছিল।

এই আইনজীবী বলেন, এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও আদালত অবমাননা আইনে সরকারি কর্মচারীদের সুবিধা দেয়া হয়েছিল। আমরা রিট মামলা করায় হাইকোর্ট সেগুলো অবৈধ ঘোষণা করেন। এর কিছুদিন পরেই নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা ঘটে। সেখানেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত ছিলেন। হাইকোর্টের নির্দেশেই এটি অগ্রসর হয়েছে। এ সামগ্রিক বিষয়গুলোর কারণে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল।

আপিল বিভাগের নিয়োগ দেয়া ১২ এমিকাস কিউরি হলেন-প্রবীণ আইনজীবী বিচারপতি টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, এ এফ হাসান আরিফ, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ফিদা এম কামাল, ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি, আবদুল ওয়াদুদ ভূইয়া ও এম আই ফারুকী।

গত বছর ৫ মে ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের নিষ্পত্তি করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য দুই বিচারপতি হলেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির রায় হওয়ায় ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হয়ে যায়।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয় বলতে দ্বিধা নেই ষোড়শ সংশোধনী একটি মেকি আইন (কালারেবল লেজিসলেশন) এবং এটা রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের (নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ) ক্ষমতার পৃথকীকরণের লঙ্ঘন। সংবিধানের ৯৪ (৪) এবং ১৪৭(২) অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এই দুটি অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ। এই সংশোধনী সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের (খ) দফাকে আঘাত করেছে। কেন না সংবিধানের ৭-এর ‘খ’ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৌলিক স্তম্ভ পরিবর্তন করার কোনো বিধান নেই এ কারণে রুলের সারবত্তা রয়েছে এবং রুলটি সফল। রুল যথাযথ ঘোষণা করা হলো কোন ব্যয় ছাড়া। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আইন ২০১৪ (এ্যাক্ট নম্বর ১৩, ২০১৪) মেকি, বাতিল এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হলো।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ (১৬তম) সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নবেম্বর হাইকোর্টে ৯ জন আইনজীবী এই রিট করেন। তারা হলেন-এডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী, এডভোকেট একলাস উদ্দিন ভুঁইয়া, এডভোকেট ইমরান কাউসার, এডভোকেট মাসুম আলীম, এডভোকেট মো.সারওয়ার আহাদ চৌধুরী, এডভোকেট মাহবুবুল ইসলাম, এডভোকেট নুরুল ইনাম বাবুল, এডভোকেট শাহীন আরা লাইলী, এডভোকেট রিপন বাড়ৈ। রিটে দাবি করা হয়, ষোড়শ সংশোধনী বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম অংশ। তাই ওই সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ