মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিএনপিসহ বিরোধী জোটের সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত

 

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে সেটি মানে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হলো, সবাইকে সভা-সমাবেশের সুযোগ দেয়া। মূলত দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও এই শ্লোগানকে কেন্দ্র করে সূচনা হয়েছিল। কিন্তু এখন যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দল আওয়ামী লীগই বিষয়টি বেমালুম ভুলে গেছে। তারা এখন একদলীয় শাসন চালাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ও তাদের জোটগত দলগুলো যখন তখন রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে সমাবেশ করলেও বিরোধী পক্ষের জন্য সেটি যেন ‘হারাম’। দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম দল বিএনপি বারবার তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে বলে ঘোষণা দিলেও সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাতে বর্বর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে সমাবেশ করার উপর নিষেধ্জ্ঞাা চলছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে বাববার আবেদন করেও সমাবেশের অনুমতি পায়নি বিএনপি। সর্বশেষ বুধবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ঘোষণা দিলেও অনুমতি না পাওয়ায় সেটি করতে পারেনি দলটি। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুমতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করতে গেলে তাদের সাথে অগণতান্ত্রিক আচরণ করা হয়। এমনকি ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রেখেও সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা দেখা করেন না। অথচ হর-হামেশা ক্ষমতাসীনরা সমাবেশ করেছে। বিশ্লেষকরা ক্ষমতাসীন আ’লীগকে বল প্রয়োগের রাজনীতি ত্যাগ করার আহবান জানিয়ে বলেন, জনগণ যেভাবে পুলিশী ভয়ভীতি, গুলী, কাঁটাতারের বেড়া, জলকামান, রায়ট কারসহ সবধরনের বাধা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসতে শুরু করেছে, তাতে এখনই যদি সরকার তাদের আচরণের পরিবর্তন না ঘটায় তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। দেশে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়বে। কেউকেউ আক্ষেপ করে বলেন, যেখানে জনসমর্থনহীন হয়ে শুধুমাত্র বল প্রয়োগ, কূটকৌশল ও মিথ্যা বচনই ক্ষমতায় যাওয়ার ও টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে পড়ে, সেখানে তা বর্জন করতে বললেই কি কেউ তাতে কর্ণপাত করবে ? বিএনপির পক্ষ থেকেও হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হচ্ছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে অনুমতির জন্য অপেক্ষা করবেনা। 

এছাড়া দেশের আরেক জনপ্রিয় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকেও দীর্ঘ ৭/৮ বছর ধরে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বাধা দেয়া হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উপর সরকারের দমনপীড়ন চোখে পড়ার মত। দলটিরঅভিযোগ, তাদের শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে মিথ্যা অভিযোগ এনে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। এমনিতেই দলটি কোনো সভা-সমাবেশ করতে পারছেনা। দেশব্যাপী তাদের অফিসগুলোও বন্ধ। কেন্দ্রীয় নেতারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে। যারা বাইরে আছেন তাদের অধিকাংশই এখানে-সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারের রোষাণলে পড়ে পরিবারগুলোও এখন অসহায়। জামায়াত-শিবিরের উপর সরকারের এমন কু-নজর ছিল যে, দেখামাত্রই তাদের গুলীর নির্দেশনা ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি। অভিযোগে প্রকাশ, সরকার শুধু জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের দমন পীড়ন করেই ক্ষান্ত হয়নি, যে কোনো ঘটনা ঘটলেই তদন্তের আগেই তার দায়ভার সংগঠনগুলোর উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। আর এর মাধ্যমে শুরু হয় নতুন করে গ্রেফতার ও দমনপীড়ন।

সভা-সমাবেশে বাধা দেয়া প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগ কখনো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির অবৈধ নির্বাচনের পর থেকে যখনই বিএনপি সমাবেশ করতে অনুমতি চেয়েছে, তখনই সরকার অধিকাংশগুলোর অনুমতি দেয়নি। সারা দেশে এখন দুটো আইন। আওয়ামী লীগের জন্য একটি আর অন্য সবার জন্য আরেকটি। তারা ভিন্নমতের জনসভা বা মতামত সহ্য করতে চান না। এর কারণ আওয়ামী লীগ জনগণ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। তিনি বলেন, এই সরকার নিজেরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু গণতন্ত্রের চর্চা করে না। এ কারণেই সমাবেশের অনুমতি দেয় না প্রশাসন। কিন্তু জনগণ যখন ঠেকে যাবে তখন তো আর বসে থাকবে না। তিনি বলেন, শুধু বিএনপি নয়, সব বিরোধী দল ও মতকে রাজপথে নামতে দেয় না এ সরকার। তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির যারা রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রর বিরোধিতা করে আন্দোলন করছেন তাদেরও একই অবস্থা। এরা আবার গণতেন্ত্রর কথা বলে! বর্তমান সরকার রাষ্ট্র এবং জনগণকে মুখোমুখি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো ‘শোডাউন’ দেখতে চান না সরকারের হাই কমান্ড। সূত্রটি জানায়, বিএনপি যাতে রাজধানীর উম্মুক্ত স্থানে কোনো সমাবেশ, মানববন্ধন বা র‌্যালীর আয়োজন করতে না পারে সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি নির্দেশনা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বলা হয়েছে, এই মূহুত্বে বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যাপক লোক সমাগম আয়োজনের অনুমতি সহ্য করা হবেনা। এমনকি ঘরোয়া আয়োজনেও আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারের ধারণা, বিএনপি রাজধানীতে সমাবেশ করতে পারলে দলটির নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠবে। একইভাবে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকার বিরোধী বিরোধী আন্দোলনকে আবারো বেগবান করে তুলবে। এইজন্যই দীর্ঘ দিন ধরেই বড় ধরনের কোনো সমাবেশের অনুমতি পাচ্ছে না বিএনপি। কর্মসূচি ঘোষণা দিলেই বাধার মুখে পড়ছে দলটি। তাদের কোনো ধরনের সভা-সমাবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। ২০১৫ সালের শুরুতে টানা তিন মাস হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করলেও তারপর থেকে দৃশ্যত কোনো বড় আন্দোলন করেনি দলটি। দীর্ঘ এই সময়ে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে তারা কিছু সভা-সমাবেশ করে ঘরোয়াভাবে। কিন্তু প্রকাশ্যে মাঠে কোনো সমাবেশ করতে গেলেই অনুমতি দেয়া হয় না বিএনপিকে। দলটির কর্মসূচি ঘিরে একধরনের বিধিনিষেধ চলছে। দিবসভিত্তিক শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েও মিলছে না অনুমতি। জানা গেছে, গেল বছরে সাতবার সমাবেশের অনুমতি চাইলেও তা দেয়নি পুলিশ। চলতি বছরে একাধিক আবেদন করেও একটিরও অনুমতি পায়নি। 

সূত্র মতে, বিএনপিসহ বিরোধী জোটকে সমাবেশের অনুমতি না দেয়ায় যখন সর্বত্র সমালোচনার ঝড় উঠে তখন চলতি বছরের শুরুতে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রাস্তা বন্ধ করে কোথাও সমাবেশ করতে দেয়া হবেনা। এমনকি তার দলও সমাবেশ করবেনা। নিত্য যানজটের শহর রাজধানীতে বড় দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলে ভোগান্তি চরমে উঠে। মিছিল বা সমাবেশ হলে সড়ক বন্ধ থাকলে যানজট কোনো একটি এলাকার বদলে ছড়িয়ে যায় পুরো শহরজুড়ে। তবে তার এ বক্তব্য মিথ্যাচারে পরিণত হলো কয়েকদিন পরেই। তার এ ঘোষণার পরপরই ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ রাজধানীতে শোভাযাত্রা বের করে। পর দিন পরদিন রাজধানীর রাসেল স্কয়ারে সমাবেশ করে দলটি। ১০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে আওয়ামী লীগ। এসব সমাবেশের দিন চরম ভোগান্তিতে পড়ে শহরবাসী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে সরকারি দলের তীব্র সমালোচনাও হয়। শুধু তাই নয়, এরপরও একাধিক সমাবেশ করে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের মিত্র দল গুলো। শ্রমিক দিবসে রাজধানীতে সমাবেশ করে আওয়ামী লীগ। এছাড়া তাদের শরীক জাতীয় পার্টিও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে। সরকারি দল ধারাবাহিকভাবে সমাবেশ করলেও অনুমতি নেই কেবল বিএনপির ক্ষেত্রে। 

অভিযোগে প্রকাশ, ২০০৮ সালে বিতর্কিত এক প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিএনপি ও জামায়াতের সভা-সমাবেশের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। শুরুতে বিএনপিকে মাঝে মধ্যে সমাবেশ করতে দেয়া হলেও জামায়াতকে দেখা মাত্রই গুলী করা হতো। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির উপরও চাপ বাড়তে থাকে। কারণ দলটি সরকারের সেই একতরফার নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বিএনপি যখনই কোনো ইস্যুতে বা কোনো বিশেষ দিবসে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি চায়, তা নিয়ে গড়িমসি শুরু হয়। এমনকি ঘরোয়া সভাতেও বাধা দেয়া হয়। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বিএনপির নেতাদের সাক্ষাৎও দেননা। যখনই সমাবেশের দাবি উঠে তখনই আইনশৃঙ্খলার অবনতি, যানজট সৃষ্টিহ নানান অজুহাতে বিএনপিকে অনুমতি দেয়া হয়না। কিন্তু সরকারি দল রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে হর-হামেশাই রাজধানীতে সভা-সমাবেশ করছে। 

সূত্র মতে, গেল বছরের ৭ নবেম্বর রাজধানীতে একটি সমাবেশ করার অনুমতি চায় বিএনপি। কিন্তু সরকার সেটি করতে দেয়নি। দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে র‌্যালীসহ সমাবেশ করতে চেয়েছিল। তাতেও অনুমতি মিলেনি। বিজয় দিবসে সমাবেশ করতে চাইলে বদ্ধঘরে আলোচনা সভার অনুমতি মিলে। নতুন বছরে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে যখন সর্বত্র আলোচনা চলছিল, যখন সারাদেশে বিরোধী দলের তেমন কোনো রাজপথের কর্মসূচি নেই, তখন অনেকে মনে করেছিল সরকারের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছিল, সরকার এবং বিরোধী দল একটি গঠনমূলক রাজনীতি উপহার দিবে। কিন্তু সরকারের আচরণে যে মোটেও পরিবর্তন হয়নি সেটি এখন সবাই টের পাচ্ছে। গত ২৮ ডিসেম্বর একটি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি ৫ জানুয়ারি সারাদেশে কালো পতাকা মিছিল এবং ৭ জানুয়ারি রাজধানীতে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়। এর পরপরই সরকারি দলের মনোভাব যে মোটেও পাল্টায়নি তার প্রমাণ পাওয়া গেল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিএনপির কর্মসূচি প্রতিহতের ঘোষণা দেয়া হলো। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। সারাদেশে বিএনপির সমাবেশে অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালানো হলো। সমাবেশের স্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও ঢাকায় সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। চলতি বছরে শ্রমিক দিবস সহ কয়েকটি ইস্যুতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশাপাশি নয়াপল্টনে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েও পায়নি বিএনপি। 

সূত্র মতে, নানান অজুহাতে বিএনপিকে সমাবেশ করতে না দিলেও প্রতিনিয়ত সরকারি দল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করছে। চলতি বছরের মুরুতে ছাত্রলীগ তাদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে আনন্দ র‌্যালী বের করে। এতে পুরো ঢাকাশহর যানজটের নগরীতে পরিণত হয়। ক্ষমতাসীন আ’লীগের শরীক জাতীয় পার্টিও নতুন বছরের প্রথম দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে। ছাত্রলীগের কর্মসূচির পরের দিন ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ ঢাকার দুটি স্পটে গণতন্ত্র রক্ষা দিবস পালন করে। তখনও রাজধানী জুড়ে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। ১০ জানুয়ারিও বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করে আ’লীগ। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, শ্রমিক দিবসসহ নিয়মিতই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কর্মসূচি পালন করছে। সরকারি দল হর-হামেশা সভা সমাবেশ করলেও বিপত্তি শুধুই বিএনপিসহ বিরোধী মতের ক্ষেত্রে। বিএনপির পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও তাদের অনুমতি দেয়া হয়না। অনেকেই বলছেন, সরকার নিজেই কর্মসূচি পালনে বাধা দিয়ে সংঘাতের উসকানি দিচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ