বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

ইসলামই নিশ্চিত করে শ্রম অধিকার

উম্মে নকিব : ১লা মে। বিশ্ব শ্রমিক দিবস। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত এই দিনটি। মেহনতি মানুষেরা এই দিনে নিজেদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে নেমেছিল। মালিক পক্ষের অন্যায় নিপীড়নে পিছু না হটে সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল নিজেদের সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার প্রাপ্তির দৃঢ়তাকে।

ইতিহাসে ১লা মে : ১৮৮৬ সালের ১লা মে’র এই দিনটির আগে শ্রমিকদের মানবিক, অর্থনৈতিক অধিকার বলতে কিছু ছিলনা। তারা মালিকের দাসানুদাস ভৃত্যের মতো খেটে যেতো। ছিলো না বিশ্রাম, সামাজিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি পাওয়ার নিশ্চয়তা। মালিকরা যেমন খুশি খাটিয়ে নিতো তাদের। দৈনিক ১৮-২০ ঘণ্টা পর্যন্তও কাজ করতে বাধ্য থাকতো শ্রমিকরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক শ্রেণীর মানুষেরা এ অন্যায়, জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নেয়। 

সর্বস্তরে ৮ ঘণ্টা কর্ম সময়, সাপ্তাহিক ১ দিন ছুটি ও ন্যায্য শ্রম আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রমিকরা তীব্র আন্দোলন শুরু করে ও ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকা ও কানাডার প্রায় ৩ লক্ষাধিক  শ্রমিক শিকাগোর ‘হে মার্কেটে’ ঢালই শ্রমিক এইচ. সিলভিসের নেতৃত্বে এক বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সর্বাত্মক শ্রমিক ধর্মঘট পালন করে। সমাবেশে মালিক পক্ষের স¦ার্থরক্ষাকারী পুলিশ ও কতিপয় ভারাটে গুণ্ডাবাহিনী অতর্কিতে গুলি চালিয়ে ৬ জন শ্রমিককে নিহত ও শতাধিক শ্রমিককে আহত করে। শ্রমিকরা এতে দমে যায়নি। ২রা মে’তেও ধর্মঘট চলতে থাকে। ৪ঠা মে আবার সমাবেশ করা হয় এবং সেখানে আবার গুলি চালিয়ে ৪ জন শ্রমিককে নিহত ও বিপুল সংখ্যককে আহত করা হয়। গ্রেফতার করা হয় শ্রমিক নেতা হিগজ ও কিলভেনকে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ফিশার, লুইস, জর্জ এঞ্জেলসহ আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শ্রমিক নেতাদের। ১৮৮৬ সালের জুন থেকে মালিক পক্ষ সমর্থনকারী জুরি বোর্ডের সমন্বয়ে বিচারের নামে শুরু হয় প্রহসন। বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে ফিশার, হিগজ, এঞ্জেলসহ ৭ জন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১৮৮৭ সালের ১২ নভেম্বর এই রায় কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে এই ঘটনাটি গোটা বিশ্বের শ্রমিক আন্দোলনে দেয় নতুন মাত্রা। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলনে আলোরিত হয় পুরো বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণী। 

১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে ১লা মে উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ১২৬ বছর আগে এই ঘটনাটি এভাবেই স্মরণ করিয়ে দেয় শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের কথা। বাংলাদেশে প্রথম ১৯৩৮ সালে নারায়ণগঞ্জে এই দিবসটি পালন করা হয়। বর্তমানে রাষ্টীয়ভাবেও এই দিবসটি শ্রমিক দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে।

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার :

১ মে’র ইতিহাস খুব পুরনো নয়। তবে এর থেকেও আগে দেড় হাজার বছর পূর্বে আরেকজন ব্যক্তি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি আর কেউ নয়, মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। আল্লাহ্ প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ বিধান ইসলামে কিভাবে একজন শ্রমজীবী মানুষকে মর্যাদা দেয়া হয়েছে তা রাসূল (সাঃ) বিভিন্নভাবে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। মানুষের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সর্বাধিক উপযোগী এই জীবনবিধান কিভাবে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করেছে তা একটু জেনে নেওয়া যাক-

শ্রমের মর্যাদা : রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘কারো জন্য স্বহস্তের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য আর নেই। আল্লাহ্র নবী দাউদ (আঃ) স্বহস্তে জীবীকা নির্বাহ করতেন।” (বুখারী) 

এভাবে মানুষকে শ্রমের প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে। (সূরা জুমআ: ১০)

পারিশ্রমিকের অধিকার : শ্রমিকের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো ন্যায্য পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার। রাসূল (সাঃ) এ প্রসঙ্গে বলেন, “তোমরা শ্রমিককে তার ঘাম শুকানো পূবের্ই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।” (ইবনে মাযাহ)

ইসলামে মালিক-শ্রমিক সর্ম্পক : ইসলামে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক হবে পিতা-সন্তানের ন্যায়। নিজের পরম আত্মীয়ের মতো শ্রমিকের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করা, পরিবারের সদস্যদের মতোই তাদের আপ্যায়ন করা, শ্রমিকের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার প্রতিটি মুহূর্তের প্রতি মালিকের খেয়াল করা এবং সেই সাথে শ্রমিকের সুবিধা, অসুবিধা বিবেচনা করা মালিকের দায়িত্ব-কর্তব্য।

শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত করে তাদের কম পারিশ্রমিক দেয়ার চেষ্টা করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। রাসূল (সা:) বলেন, “কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। তাদের শ্রমিকের নিকট থেকে পূর্ণ শ্রম গ্রহণ করে অথচ তার পূর্ণ মজুরী প্রদান করে না।” (বুখারী)

অপরদিকে শ্রমিকের দায়িত্ব হলো চুক্তি মোতাবেক মালিকের প্রদত্ত কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে সম্পাদন করা। রাসূল (সাঃ) বলেন, “আল্লাহ ঐ শ্রমিককে দ্বিগুণ সওয়াব দান করবেন, যে নিজের মালিকের হক আদায় করে এবং আল্লাহ্র হকও আদায় করে।” (বুখারী ও মুসলিম)

রাসূল (সাঃ) আরো বলেন, “সৎ শ্রমিকের জন্য দু’টি প্রতিদান রয়েছে।”

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, “যেই সত্তার হাতে আবু হুরায়রার প্রাণ তাঁর কসম, যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, হজ্জ ও আমার মায়ের প্রতি সদ্বব্যবহারের ব্যাপারগুলো না থাকতো, তাহলে আমি শ্রমিক হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে পছন্দ করতাম।” (বুখারী)

সভ্যতার চাকা সচল রাখতে শ্রমজীবী মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। এই জগতের সব সৃষ্টির পেছনে মেহনতি মানুষের ঘর্মসিক্ত দেহের অবিরাম প্রয়াস রয়েছে। তাই এই অবদানকে সঠিক মূল্যায়ণ দিয়ে শ্রমিকের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। ১লা মে শুধুমাত্র একটি দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

এই দিবসটি প্রতিষ্ঠিত হবার পরও ১২৬ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো শ্রমিকের অধিকার শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে তা বলা যাবে না, এখনো পৃথিবীর নানা প্রান্তে শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। শ্রমিকের প্রকৃত দাবি প্রতিষ্ঠায় ইসলামী শ্রমনীতির কোন বিকল্প নেই। 

তাই ইসলামী বিধানের অনুসরণের মাধ্যমেই সুষ্ঠু ও ইনসাফপূর্ণ শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। শ্রমিক-মালিক যথার্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে সম্ভব একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়া। বিশ্ব শ্রমিক দিবসে এই অনুুপ্রেরণাই হোক আমাদের সংকল্পের মূল ভিত্তি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ