বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

শহীদী ঈদগাহে

আফসানা মিমি : ঘন ঘন নিঃশ্বাসে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে মতিনের দল। আজ চৌদ্দশত বছর ধরে যাকে লালন করছে হৃদয়ের গহীনে, ধারণ করেছে সমগ্র মুসলিম উম্মাত, ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা মাকড়সার জালসম যুক্তিতে তাকে বাজেয়াপ্ত করতে চায়। ওদের স্পর্ধায় গায়ে জ্বালা ধরে যায় মতিনদের। একটি আসন্ন বিপ্লবের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে তারা। কাল রাতেই আহ্বান জানানো হয়েছে আপামর তৌহীদি জনতাকে।

মোড়ে মোড়ে সাইকেলে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে বিক্ষোভ মিছিলে যোগদনের লিফলেট। প্রায় সবগুলো মসজিদের দেয়ালে এমনভাবে রাখা হয়েছে লিফলেটগুলো, যাতে নামায শেষে মুসল্লীদের বের হওয়ার সময়ই চোখে পড়ে।

কিন্তু পথে হঠাৎ জানা গেল বাতিলের চক্রান্তে নিষিদ্ধ করা হয়েছে প্রতিবাদ সমাবেশ। 

তাদের এই নিষেধাজ্ঞা চলার গতি শ্লথ করতে চায়; কিন্তু যারা শহীদ হানযালার উত্তরসূরী তারা এ নিষেধাজ্ঞা শুনে আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে । 

বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত অপ্রতিরোধ্য গতিতে ঈদগাহ অভিমুখে রওনা দেয় প্রতিবাদী জনতা। আয়োজিত জনসভা রূপ নেয় জনসমুদ্রে।

একজন মঞ্চে উঠে ঘোষণা দেয়- রাসূলে কারীম (সা:) বলেছেন- ‘কুরআন এমন এক সুপারিশকারী যার সুপারিশ নিশ্চিতভাবেই গ্রহণ করা হবে এবং এমন বিতর্ককারী যার তর্ক মেনে নেয়া হবে। 

যে তাকে সম্মুখে রেখেছে তা সেই ব্যক্তিকে জান্নাতে টেনে নিয়ে যাবে, আর যে ব্যক্তি কুরআনকে পিছনে রেখেছে কুরআন তাকে ধাক্কা দিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।’ (ইবনে মাজাহ)

অতএব আপনারা কি তৈরী কুরআনের জন্য লড়াই করতে? সবাই সমস্বরে বলে উঠল- ‘তৈরী’। তাদের নারায়ে তাকবীর- “আল্লাহু আকবার” স্লেøাগানে তন্দ্রাচ্ছন্ন পৃথিবী সজোরে কম্পিত হয়ে ওঠে। 

ব্যর্থ ষড়যন্ত্রে ফুঁসে ওঠে বাতিল শক্তি। বিংশ শতাব্দী সাক্ষী হয় আরেকটি “বীরে মাউনা”-র হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অথবা আরেক কারবালার। 

সামনে থেকে গুলি গুলি ছোঁড়া হচ্ছে, কিন্তু মানুষ গুলিকে ভয় করছেনা। এ যেন জান দেব, তবু কুরআনের অবমাননা হতে দেব না।

হঠাৎ দেখা যায় মতিন সাথীদের রেখে বুলেট-বন্দুককে তুচ্ছ জ্ঞান করে অনেকটা সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। পেছন থেকে সাথীরা ডাকছে-

“মতিন! অতটা সামনে যেও না! ওরা গুলি ছুঁড়ছে। তুমি ওদের নিশানায়।”

মতিন যেন বলছে - “এখান থেকে পেছনে ফেরা যাবে না। আল্লাহকে কী জবাব দেব পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে?”

মুহূর্তেই একটি গুলি যেন গোলাপের মত করে তার বুক ভেদ করে পিঠ ছিদ্র করে বেরিয়ে গেল। মতিন লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। সবুজ জমীনের উপর লাল ছড়িয়ে পড়লো। কিন্তু এখানে লালটিই যেন প্রকট ও শাশ্বত। এরপর শুরু হলো মুষলধারে রক্তবৃষ্টি । 

এ কি অনুপম খোশবু ছড়াতে শুরু করলো চারিদিকে। ঈদের জামাত কি তবে শুরু হয়ে গেলো! ঈমানদীপ্ত হুঙ্কারে বাতিলের ষড়যন্ত্র নিস্তেজ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইলো। আর পৃথিবী বিস্ময়ে নিথর হয়ে গেলো।

“খোদার তরে, এমন করে কীভাবে যায় মরা?”

কী অপূর্ব কুরবানী! 

তারা জীবন দিয়ে রক্ত আখরে লিখে গেল কুরআন। আর রক্তের ঋণে বেঁধে গেল তাদের উত্তরসূরীদের। আজও চলছে নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য কুরআনের নির্দেশ পরিবর্তনের হীন অপচেষ্টা। কুরআনের তৌহিদী চেতনাকে লুপ্ত করে মঙ্গল প্রদীপ আর শিখা চিরন্তন জ্বালিয়ে, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর শহরে বাজারে মূর্তি স্থাপন করে শিরককে যেভাবে দেশব্যাপী ছড়ানো হচ্ছে, তাতে কুরআন প্রেমিক জনতাকে নিরব দর্শকের ভূমিকায় থাকলে চলবে না। 

প্রয়োজন হলে আবারও জীবন দিয়ে শহীদী ইদগাহে শরিক হতে কেন পিছিয়ে রবো আমরা? কুরআনের ঝাণ্ডা হাতে আরেকবার নামতে হবে রক্ত পিচ্ছিল পথে। অন্ধকার বিদীর্ণ করে আলোকোদ্ভাসিত ভোর আনতে হবে। 

এটিই সেই রক্তের প্রত্যাশা, যা আজও শুকায়নি, আর কোনোদিন শুকাবে না। 

লেখিকা : অনার্স প্রথম বর্ষ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল বিভাগ, রাজশাহী অঞ্চল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ