শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

আবারো প্রয়োজন ভাসানীর পানি’র সংগ্রাম

[পাঁচ] 

জিবলু রহমান : ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতের নয়জন নাগরিক একটি রিট করেছেন, যাঁদের মধ্যে মৎস্যজীবী ও পরিবেশবিদও রয়েছেন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালে পেশ করা এই আবেদনে বলা হয়, ফারাক্কার কারণে এ অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। গঙ্গা অববাহিকার অর্ধশত কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা এই নদীর ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। বাঁধের কারণে জেলেসহ গঙ্গাতীরের বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কলকাতাভিত্তিক অভ্যন্তরীণ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রণীত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে রিট আবেদনে বলা হয়, যেখানে বছরে নিম্ন অববাহিকার প্রতি হেক্টরে ২০০ কেজি মৎস্য উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল, সেখানে এখন হচ্ছে ৩০ কেজি। আদালত মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেছেন।

২০১৬ সালের আগস্ট মাসে মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে নদী উৎসবেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির ওপর জোর দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা পাক, এটি চান ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সায় না থাকায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দু’দুবার তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির উদ্যোগ নিয়েও সফল হয়নি; একবার ২০১১ সালে, আরেকবার ২০১৫ সালে। দুজন চৌকস প্রধানমন্ত্রীকে তিনি ‘বোকা’ বানিয়েছেন। ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায়, যিনি পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির ডাকসাইটে নেতা ছিলেন, ২৭ আগস্ট ২০১৬ ত্রিপুরা ইনফোর এক সেমিনারে বলেছেন, বাংলাদেশকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়া উচিত। তাঁর প্রশ্ন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনবার যুদ্ধ হওয়ার পরও যদি ‘শক্র’ পাকিস্তান সিন্ধুসহ যৌথ নদীগুলোর পানি পেতে পারে, তাহলে বন্ধু বাংলাদেশ কেন পাবে না? প্রশ্নটি তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে করলেও ইঙ্গিত আছে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের প্রতিই।

তথাগত রায় আরও বলেছেন, ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যৌথ নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকার আছে। তিনি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে অথবা একটি সালিসের মাধ্যমে বাংলাদেশের কত পানি পাওয়া উচিত, সেটি যত দ্রুত সম্ভব নির্ধারণ করার জন্য যৌথ নদী কমিশনকে পরামর্শ দিয়েছেন। ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার গঙ্গা নদীর ওপর দেয়া ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে  দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেছেন, ‘বাঁধটি সরিয়ে ফেলুন।’ বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নিতীশ বলেছেন, ‘আগে যেসব পলি নদীর প্রবাহে ভেসে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত, এখন ফারাক্কার কারণে সেসব নদীর বুকে জমা হয়ে বন্যা ডেকে আনছে। তাই আমি ১০ বছর ধরে বলে আসছি, এই পলির ব্যবস্থাপনা না করলে বিহার কিছুতেই বন্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে না।’ (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬) 

১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ‘উজান-ভাটি দু’দিকেই ক্ষতি করছে ফারাক্কা বাঁধ’ শিরোনামের বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এদিন রাত নয়টা ৩৫ মিনিটে চ্যানেল আইতে বিবিসি বাংলার সরাসরি অনুষ্ঠান প্রবাহ’তে দেখানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিতর্কিত ফারাক্কা বাঁধ সরিয়ে দেয়ার কথা বলেছেন। এই প্রথম একজন ভারতীয় রাজনীতিক এরকম মন্তব্য করলেন বটে কিন্তু শুরু থেকেই এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ছিলেন নদী বিশেষজ্ঞরা। ফারাক্কার প্রভাবে নদীর স্বাভাবিকতা হারিয়ে গঙ্গার উজানে বিহার ও উত্তর প্রদেশ এবং ভাটিতে সুন্দরবন পর্যন্ত পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ থেকে ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীতে বিতর্কিত ফারাক্কা ব্যারেজ চালুর পর গত চার দশকে যেটি গঙ্গা অববাহিকায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৬১ সালে এবং শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। এর দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২৪৫ মিটার।

ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার উজানে বিপুল পরিমাণ পলি জমে প্রতিবছর বন্যা দেখা দিচ্ছে ভারতের বিহারসহ উত্তর প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায়। অন্যদিকে গ্রীষ্ম মওসুমে পানি আটকে রাখার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ক্ষতির শিকার হয়েছে ভাটি অঞ্চলে বাংলাদেশ। এখন বিহারে প্রতি বছর বন্যার জন্য ফারাক্কা বাঁধকেই দায়ী করা হচ্ছে। বিহারে এবার বন্যাতেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা অন্তত ২০ লাখ। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ফারাক্কার সমস্যা তুলে ধরে এ সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান চাইছেন বিহারে তিন বারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার।

বিবিসি জানায়, ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশে অনেক ক্ষতি হয়েছে বলে সব সময় বলা হয়ে থাকে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর ফারাক্কার প্রায় সবগুলো গেট খুলে দেয়া হয়েছে। এর ফলে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ লাখ কিউসেক পানি ঢুকেছে বাংলাদেশে। গত মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট ২০১৬)  রাজশাহীতে গিয়ে দেখা যায় উজান থেকে আসা পানির প্রচ- স্রোত। শহরে ‘টি বাঁধ’ হিসেবে পরিচিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক নম্বর গ্রোয়েনে ছোট ভাঙ্গন ধরেছে। যেটি রক্ষা করতে শত শত বালির বস্তা ফেলতে দেখা যায়।

আমজাদ আলী পদ্মার তীরবর্তী খানপুর গ্রামের বহু বছর বসবাস করছেন। ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার পর থেকে শীত আর বর্ষার পদ্মার পানির বিপরীত চিত্র দেখে আসছেন ষাটোর্ধ্ব আমজাদ আলী। তিনি বলেন, “মনে করেন যখন পানির দরকার ফারাক্কায় তখন পানি দেয় না আর এখন ফারাক্কা ছেড়ে টেড়ে দিয়ে আরো কষ্ট দিচ্ছে।” বর্ষাকালে বন্যা আর ভাঙনে মোটামুটি অভ্যস্ত পদ্মাপাড়ে আমজাদ আলীর মতো এ জনপদের সবাই।

পদ্মার আরো ভাটিতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বাংলাদেশে গঙ্গার পানি পরিমাপ করা হয়। এ এলাকায় পদ্মা নদীতে ৫০ বছরেরও বেশি সময় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন জয়রাম। ফারাক্কা বাধের আগে ও পরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জয়রাম বলেন, “৪০-৫০ বছর আগে যখন নদীতে পানি ছিল তখন রেগুলার মাছ পাতাম। এখন ১০ কেজি ১৫ কেজি মাছ ধরতে তামাম দিন খাটতে হচ্ছে।” তিনি আরো জানান, পদ্মায় গরমকালে পানি এতটাই শুকিয়ে যায় যে তাদের জীবিকা চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। বছরে দুইমাস কোনো মাছই ধরা পড়েনা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, এ মওসুমে সর্বোচ্চ পানি এসেছে ২০ লাখ কিউসেক। আর গ্রীষ্ম মওসুমে পানির সর্বনিম্ন প্রবাহ ছিল ১৫,৩০০ কিউসেক।

বাংলাদেশের নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম ইনামুল হক বলেন, ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার আগে শুষ্ক মওসুমে পানির প্রবাহ ছিল ৬০ থেকে ৮০ হাজার কিউসেক। ফারাক্কা ওদের যে ডাইভারশন ক্যানেল, ব্যারেজের মাধ্যমে তারা ৪০ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নিতে পারে। তো সেটি সরিয়ে নেয়ার পরে যেটি থাকে সেটি পায় বাংলাদেশ।

গঙ্গা চুক্তিতে অন্তত ২৭ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তির আগে অনেক সময় ১০ হাজার কিউসেকেরও কম পানি এসেছে বলে জানান ইনামুল হক। তিনি বলেন, বিশেষ করে ইলিশ মাছ এবং চিংড়ি মাছের বিরাট ক্ষতি হয়েছে, তাদের প্রজননে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে সংখ্যা কমে গেছে। এছাড়া অন্যান্য মাছেরও ক্ষতি হচ্ছে। আর উপকূল এলাকায় মানুষ একটা মিষ্টি পানির ওপর নির্ভরশীল যাদের জীবন, সেটা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিহার মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে ফারাক্কা ইস্যুতে নতুন আলোচনা হতে পারে বলেও মনে করেন প্রকৌশলী ম ইনামুল হক। তিনি বলেন, “নীতিশ কুমার বলছেন এটা তুলে দিতে। তুলে দেয়া যাবে না। কারণ সেটা একটা স্ট্রাকচার যার ওপর রেল আছে, রোড আছে। আমরা একটা বলতে পারি যে, আমরা নদীর যে স্বাভাবিক প্রবাহ সেটাকে বাঁধা দেয়ার বিরোধী এবং ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ কনভেনশন এটা বাঁধা দেয়ার বিরোধী। অতএব এই গেটগুলো তুলে দাও, গেটগুলো খুলে দাও।” (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬)

নিতীশ কুমারের প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলে তেমন কথাবার্তা না হলেও ভারতের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞ মহলে জোরদার বিতর্ক হয়েছে এবং চলমান রয়েছে। দক্ষিণ এশীয় বাঁধ নির্মাণ, নদী ও জনগণবিষয়ক নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী হিমাংশু থাকার বলেছেন, নিতীশের ফারাক্কা বাঁধ তুলে নেয়ার প্রস্তাব এ কারণে সঠিক যে তাতে গঙ্গার অবাধ পানিপ্রবাহের সঙ্গে পলিও নিচে চলে যাবে। ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল হুগলীতে পানিপ্রবাহ বাড়ানো, তা-ও খুব কমই কার্যকর হয়েছে। তিনি বলেছেন, যখন বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা হয়, তখন পানির সঙ্গে প্রচুর পলিও নদীতে জমে থাকে। সেটি যথাযথভাবে খনন করতে না পারলে বাঁধের সব স্লুইস গেট খুলে দিলেও বন্যা ঠেকানো যাবে না। হিমাংশু থাকার মনে করেন, দু’টি বাঁধের কারণে বিহারে নজিরবিহীন বন্যা হয়েছে। এর একটি হলো মধ্যপ্রদেশের বনসাগর বাঁধ ও অপরটি ফারাক্কা বাঁধ। নিতীশ কুমারের প্রস্তাব সমর্থন করে এই পরিবেশবিদ বলেছেন, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী এর আগেও ফারাক্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কেন্দ্র আমলে নেয়নি। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পলি-ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়নেরও দাবি জানান।

ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব পিপলস মুভমেন্টের মধুরেশ কুমারও বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব সমর্থন করে বলেছেন, যেকোনো বাঁধের নির্দিষ্ট আয়ু আছে এবং পলি জমে গেলে বাঁধের কার্যকারিতা আর তেমন থাকে না। যেকোনো বাঁধ সরিয়ে ফেললে পানির প্রবাহ অবাধ হবে। ফারাক্কা বাঁধ রেখে নদী পলিমুক্ত করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ফারাক্কার কারণে যদি উজানের দেশ ভারত সমস্যায় পড়ে থাকে, তাহলে ভাটির দেশের সমস্যাটি যে কত বেশি, তা সহজেই অনুমেয়।

নিতীশ কুমারের বাঁধ ভেঙে দেয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নিতীশের দাবি প্রসঙ্গে নদীবিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি একসময় ফারাক্কা বাঁধের সমালোচনা করেছি। কিন্তু ১৯৭৫ সাল থেকে বাঁধটি চালু আছে। এর ফলে ফারাক্কা থেকে মোহনা পর্যন্ত পরিবেশ বদলে গেছে। একধরনের ইকোলজি তৈরি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে দেয়া হলে তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে পরিবেশের ওপর।’ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর ইউরোপের প্রায় সব দেশ ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপের (ইসিই) সদস্য হয়েছে। ইসিই ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক নদী ও হ্রদ-সংক্রান্ত একটি কনভেনশন (চুক্তি) করেছিল। আন্তর্জাতিক নদীর ন্যায়সংগত, পরিবেশবান্ধব ও অববাহিকাভিত্তিক টেকসই ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ কনভেনশনটি সারা বিশ্বে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এই কনভেনশনের সদস্য বর্তমানে ৪১টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই কনভেনশনের সদস্য বা পক্ষরাষ্ট্র হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে ইউরোপের বাইরের যেকোনো দেশের জন্য।

১৯৯২ সালের কনভেনশন অনুসারে এককভাবে আন্তর্জাতিক নদীর (যেমন: ভারতের প্রস্তাবিত আন্তনদী সংযোগ বা টিপাইমুখ) ওপর প্রকল্প গ্রহণ করে অন্য দেশের বা নদীর ওপর নির্ভরশীল পরিবেশ, জলবায়ু ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি করার কোনো সুযোগ নেই। পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে জরিপ সম্পাদন, অববাহিকার সব দেশের মধ্যে অবাধ তথ্যবিনিময় ও আলোচনা এবং নদীর পানির মান ও পরিবেশ রক্ষা না করে অভিন্ন নদীতে কোনো প্রকল্প গ্রহণেরই সুযোগ নেই। নদীর ব্যবহার, ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন ও সুরক্ষার জন্য অববাহিকাভিত্তিক যৌথ কমিশন গঠন করে সব রাষ্ট্রের সমঝোতার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনার ওপর এতে জোর দেয়া হয়েছে। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ৫ জুন ২০১৬)  

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয়-প্রশান্ত পানি  ফোরাম যমুনা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে চিত্র তুলে ধরেছে, বাস্তবতা তার চেয়েও করুণ। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর যেদিকেই দু’চোখ যায় শুধু ধু-ধু বালুচর। এই ভয়াবহ দুরবস্থার জন্য প্রকৃতি যতটা না দায়ী, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি দায়ভার বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতের। দেশটির পানি কূটনীতির কবলে পড়েই বাংলাদেশের জলবায়ুতে এই বিরূপ প্রভাব দেখা দিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে শত শত নদী হারিয়ে গেছে। আর শুষ্ক মৌসুম এলেই অসংখ্য নদী মরা গাঙে পরিণত  হচ্ছে।  এডিবি ও এশীয়-প্রশান্ত পানি ফোরাম এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পানি সঙ্কট সবচেয়ে ভয়াবহ। বাংলাদেশে পানি সঙ্কটের কারণে প্রায়ই বন্যা, খরা, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ও হ্রদের দূষণ, নগরায়ন এবং ভূ-উপরিস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার হচ্ছে। উপরন্তু ভারতের মতো দেশ জলবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকে পড়ায় বাংলাদেশের পানি সঙ্কট তীব্র হয়েছে।

এছাড়াও ভারত শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানি প্রত্যাহার করে নিতে স্থায়ীভাবে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তায় গজলডোবা বাঁধ, মনু নদীতে নলকাথা বাঁধ, যশোরে কোদলা নদীর উপর বাঁধ, খোয়াই নদীর উপর চাকমা ঘাট বাঁধ, বাংলাবন্ধে মহানন্দা নদীর উপর বাঁধ, গোমতি নদীর উপর মহারানি বাঁধ, মহুরি নদীর উপর কলসী বাঁধ, উমিয়াম ও ধালা নদীর উপর মাওপু ড্যাম এবং সারী ও গোয়াইন নদীর উপর মাইন্ডু ড্যাম নির্মাণ করেছে। মাওপু ও মাইন্ডু ড্যাম নিয়েও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে  কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ওই প্রতিবাদে বলা হয়েছে, মাওপু এবং মাইন্ডু ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন নদী। এই নদীর উপর ড্যাম নির্মাণের ফলে বাংলাদেশে কি ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে তা নিরূপণ করা প্রয়োজন। এটা নিরূপণ না হওয়া পর্যন্ত ভারতের মেঘালয় রাজ্য সরকারকে ড্যাম নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতেও বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের এই আহ্বানে সারা দেয়নি ভারত। (সূত্র : দৈনিক ইনকিলাব ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)

যমুনা বিধৌত এলাকায় ভারতের পানি আগ্রাসন নীতির বিরূপ প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেশের পানি বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, নয়-দশ বছর ধরে যমুনা নদীর পানির স্তর ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেরও অনেক নিচে নেমে গেছে। আগে শুষ্ক মৌসুমে ভূখ- থেকে ৩০ ফুট গভীরে পানির স্তর পাওয়া গেলেও বর্তমানে পানির স্তর নেমে গেছে ৬০/৬৫ ফুট গভীরে। সরাসরি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে যমুনার শাখা নদী ও নালাগুলোতে।

বর্ষা মৌসুমে যে যমুনা নদী ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে কেড়ে নিয়েছে সবকিছু গৃহহারা করে দিয়েছে মানুষের বর্তমানে সেই যমুনার বুকে জেগে উঠেছে বিশাল চর। মাঝ নদীতে বিশাল চর জেগে ওঠায় নদীর গতিপথে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন ক্রমশই ঢুকে পড়ছে ভূঞাপুরের দিকে। যা যমুনার পূর্ব পাড়ের মানুষের জন্য বয়ে আনছে অশনি সংকেত।

নদীর পানি শুকিয়ে চর জেগে ওঠায় এলাকার ৩ শতাধিক জেলের ভাগ্যে নেমে এসেছে দারিদ্র্যের খড়গ। যাদের মূল পেশাই ছিল নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা। নদীতে পানি না থাকায় মাছ আহরণ করতে পারছে না এসব জেলে। ফলে পরিবার নিয়ে তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। সংসারের তাগিদে কেউ কেউ আবার বেছে নিয়েছে দিনমজুরের কাজ।

ভারতের যত্রতত্র বাঁধ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে যমুনা নদীতে বালু পড়ে নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে নদীটি। ফলে বাহাদুরাবাদ-বালাসীর মধ্যে সকল প্রকার ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ছোট ছোট স্যালো মেশিন চালিত নৌকাযোগে একাধিক ঘাট থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতি দিন হাজার হাজার মানুষ নদী পারাপার হচ্ছে।

’৯০-এর দশকের দিকে ফ্রান্স ও জার্মান সরকারের অর্থায়নে ৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে জামালপুরের গুঠাইল বাজার ও কুলকান্দী টেস্ট-স্ট্রাকচার (হার্ডপয়েন্ট) দু’টি নির্মাণ করা হয়। এতে কয়েক জেলার কৃষি পণ্যের একমাত্র হাট গুঠাইল বাজার, কুলকান্দী মাগন মিয়া বাজারসহ উপজেলা সদর ও শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যমুনার ভাঙন থেকে রক্ষা পেলেও দীর্ঘ প্রায় দুই যুগে কোন সংস্কার হয়নি। ২০১১ সালে যমুনার তীর সংরক্ষণ বাধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড সাড়ে ৪শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এত কিছুর পরও মূল সমস্যায় দৃষ্টি না দেয়ায় মানুষের কপালের দুর্গতি কমছে না। [সমাপ্ত]

jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ