শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে সন্দেহ সংশয় বাড়ছে

এইচ এম আকতার : মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) নিয়ে সন্দেহ সংশয় বাড়ছে। সরকার নির্বাচনের আগে জিডিপির প্রবৃদ্ধি পরিসংখ্যানের ধাঁধায় ফেলছে জনগণকে। হাওরাঞ্চলে ভিনদেশী বানে ফসল হানিতে কৃষিতে উৎপাদন কমছে। তবুও সরকারি হিসাবে, বছর ব্যবধানে এই খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়তে যাচ্ছে বড় আকারে। সরকারি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার কথা বলা হলেও, কমছে শিল্পে প্রবৃদ্ধি। এমন অসামঞ্জস্য সমীকরণে জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে সন্দেহ সংশয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতির অনেক সূচক নি¤œমুখী হলেও বছর ব্যবধানে মাথা পিছু আয় বেড়েছে ১৩৭ মার্কিন ডলার বা ১১ হাজার ২৩৪ টাকা।

প্রতিবেশী দেশের আগাম বন্যার পানিতে হাওরে কান্নার রোল। বছরের একমাত্র ফসল ঘিরে আকাশসমান স্বপ্ন ভেসেছে, ভিনদেশী বানের পানিতে। তাই, ভাটি এলাকার লাখো মানুষের এখন খেয়ে পরে বেঁচে থাকায় দায়।

পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, এ বছর ১ কোটি ৯৫ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগাম বন্যার কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমবে। তবে লক্ষ্যমাত্রা কত কমবে তার কোন পরিসংখ্যান নেই তাদের। কৃষিতে অনাকাক্সিক্ষত এই আঘাত এবার পুরো দেশজুড়ে। অকাল বৃষ্টিতে তলিয়েছে ধান ক্ষেত। বাদ যায়নি ভুট্টা, ডালসহ অন্য খাদ্যশস্যও ক্ষেত। তাই, সার্বিক উৎপাদনে দেখা দেবে বড় ঘাটতি-এই আশঙ্কাও নানা মহলে। কিন্তু, সরকার বলছে উল্টো কথা। প্রবৃদ্ধির খাতভিত্তিক হিসাবে দেখানো হয়েছে, এ বছর কৃষির উৎপাদন ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হবে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু, কীভাবে?

হিসাব মিলছে না শিল্পখাতেও। প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, এ বছর বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে গেলো বছরের তুলনায়। কিন্তু কিছুটা বেড়েছে সরকারি বিনিয়োগ। সব মিলিয়ে প্রথমবারের মতো যা ছাড়িয়ে যাবে জিডিপির ৩০ শতাংশ। তাহলে কেন শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি কমছে। ১১ শতাংশ থেকে বছর ব্যবধানে যা নেমে আসবে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগ বাড়ার পরও, কেনো কমবে প্রবৃদ্ধি? এমন প্রশ্নের কোন সঠিক উত্তর নেই।

একই অবস্থা দেখা গেছে, দেশের নির্মাণ খাতেও। গত কয়েক বছর ধরেই এ খাতে নি¤œমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আবাসন খাতেও অবস্থা আরও খারাপ। এখানেও প্রবৃদ্ধি কমছে। তাহলে কোন খাতের উপর নির্ভর করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এমন প্রাক্কলন করছে বিবিএস।

চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি না হওয়ার পরও প্রবৃদ্ধি কীভাবে লক্ষ্য ছাড়াবে জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, প্রবাসী আয় আসলে কমেনি। ২০১৬ সালে বিকাশসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১৪ দশমিক ৩১ ভাগ প্রবাসী আয় দেশে এসেছে।

 এ ব্যাখ্যায় পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের বরাত দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০১৩ সালে ৬৭ দশমিক ৩২ শতাংশ প্রবাসী আয় ‘ব্যাংকিং চ্যানেলে’, আর ৩২ দশমিক ৬৮ শতাংশ আয় ‘নন ব্যাংকিং চ্যানেলে’ দেশে আসত।

কিন্তু ২০১৬ সালের পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসছে ৫০ দশমিক ৭২ শতাংশ, আর নন ব্যাংকিং চ্যানেলে বাকি ৪৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোবাইল ব্যাংকিং শুরু হওয়ার পর সাধারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় কমে গেছে।

মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ নিয়েও সন্দেহ নানা মহলে। কেননা, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কিভাবে ১৩৭ ডলার বা ১১ হাজার ২৩৪ টাকা বাড়তি আয় সম্ভব-সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে বড় আকারে। কারো কারো মতে, নির্বাচনের আগে পরিসংখ্যানের বৃত্তে জনগণকে তুষ্ট করার প্রবণতা রয়েছে সরকারের। 

চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে ১ হাজার ৬০২ ডলার হবে বলে ধারণা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। যা গত বছর ছিল ১৪৬৫ ডলার। হিসেব মতে গত এক বছর তেমন কোন নতুন কর্মসংস্থা হয়নি। বেড়েছে বেকারত্বের সংখ্যাও। নতুন বিনিয়োগ না থাকার কারণেই নতুন করে কোন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তাহলে কিভাবে মাথা পিছু এত আয় বাড়লো।

চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধির এই হিসাব করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চূড়ান্ত হিসাবে গত অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। প্রায় এক দশক ৬ শতাংশের বৃত্তে ‘আটকে’ থাকার পর গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ‘ঘর’ অতিক্রম করে। এরপর গত জুনে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করা হয়।

এনইসি বৈঠকের পর এক ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি হাওড়ে বন্যার কারণে এবার ফসল কম উৎপাদন হতে পারে বলে আমাদের আশঙ্কা। এটা শুধুই আশঙ্কা। তবে প্রমাণিত বিষয় হচ্ছে আমরা প্রতিবছরই প্রবৃদ্ধি করেছি।

মন্ত্রী জানান, পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার দাঁড়াবে ২৪৮ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ২২১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার।

চলতি অর্থবছরে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মোট বিনিয়োগ হয়েছে জিডিপির ৩০ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ দশমিক ০১ শতাংশ, আর সরকারি বিনিয়োগ ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ।

পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপি হিসাবের ক্ষেত্রে তাদের ‘মেথডোলজি’ পরিবর্তন করেনি বলেও জানান মন্ত্রী। বেসরকারি বিনিয়োগে অচলাবস্থা কাটছে না কেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা সব সময় দেখবে বেশি লাভ। আমরা এখনো তাদের অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় চাহিদার যোগান দিতে পারছি না। 

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে। সরকারের ৭ দশমিক ২ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি। কারণ, প্রবৃদ্ধি অর্জনের যেসব খাতের ওপর নির্ভর করছে, সেগুলোর অবস্থা আশানুরূপ নয়। যেমন রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় নিম্নমুখী, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কৃষিতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও একই প্রবৃদ্ধি অপরিবর্তিত থাকবে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। অতীতের ও চলতি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। তবে মধ্য আয়ের দেশ থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হলে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করাই বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য বলে এডিবি জানায়।

সেবা খাতে ২০১৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৬ শতাংশ। ২০১৮ সালে অপরিবর্তিত থাকবে। আমদানি প্রবৃদ্ধি প্রথম ছয় মাসে ৯ শতাংশ হয়েছে। আগামী অর্থবছর এই প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে দাঁড়াবে।

এদিকে এডিবির মতো বিশ্বব্যাংকও প্রবৃদ্ধি অর্জনের ব্যাপারে সরকারের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়। গত রোববার বিশ্বব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়াকে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। তাদের পর্যবেক্ষণ, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। মূলত অবকাঠামো খাত ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে সরকার প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এ অবস্থায় বেসরকারি ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে।

এব্যাপারে এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মীর নাসির বলেন,গত বছরের তুলনায় এ বছর বিনিয়োগ কমেছে। বিনিয়োগ না বাড়লে প্রবৃদ্ধি কমবেই। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ঋণের সুদ হার কমাতে হবে। সেই সাথে ঋণ গ্রহণে হয়রানিও কমাতে হবে। তাহলেই শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে। শিল্পের উন্নয়ন ছাড়া দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। এখাতের উন্নয়নে সরকারকে আরও এগিয়ে আসতে হবে।

এব্যাপারে পিআরআই’র নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, নির্বাচনের আগের পরিসংখ্যায় ধাঁধা নতুন কিছু নয়। এর মাধ্যমে জনগণকে আকৃষ্ট করার সুযোগ রয়েছে। তবে আয় নিয়ে সরকারের যে পরিসংখ্যান তা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। কর্মসংস্থান না হলে কিভাবে এত টাকা আয় হতে পারে তা বুঝে আসে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ