সোমবার ১০ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঝিনাইদহের চুয়াডাঙ্গায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযান দুই জন গ্রেফতার ॥ পাঁচটি বোমা উদ্ধার

 

খুলনা অফিস : খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ধানহাড়িয়া চুয়াডাঙ্গা গ্রামের জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে প্রান্ত ও সেলিমের বাড়িতে চালানো অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে প্রেস ব্রিফিং করে খুলনা র‌্যাপিড এ্যকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব-৬ এর সিও খন্দকার রফিকুল ইসলাম এ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, সোমবার রাতে একই এলাকার আত্তাবউদ্দিন ওরফে আতার ছেলে সেলিম (৩৩) এবং মতিয়ার রহমানের ছেলে প্রান্তকে (১৭) গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে সোমবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে তাদের বাড়ি ঘিরে রাখে র‌্যাব-৬ এর সদস্যরা। এর মধ্যে সেলিমের বাড়ির পেছনে দু’টি সুইসাইডাল ভেস্ট ও প্রান্তর বাড়ির কাছের কলাবাগান থেকে পাঁচটি বোমা উদ্ধার করা হয়। 

খুলনা র‌্যাব-৬ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) খন্দকার রফিকুল ইসলাম আরো জানান, বাড়ির মালিক সেলিম হোসেন ও প্রান্ত রহমান জেএমবির সদস্য। তাদের বাড়িতে পাওয়া যায়নি, তবে এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়েছে। সেলিমের বাড়িতে অভিযান অব্যাহত থাকে। মঙ্গলবার ভোর থেকে গ্রামের সেলিম ও তার চাচাতো ভাই প্রান্ত রহমানের বাড়ি ঘিরে রাখে। 

অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনী ঝিনাইদহ র‌্যাব-৬ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মনির আহমেদ জানান, খুলনা থেকে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট আসার পরই অভিযান শুরু হয়। র‌্যাব ক্যাম্প থেকে আধা কিলোমিটার দূরেই জঙ্গি আস্তানা দুটির অবস্থান। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বাড়ি দু’টির মালিকের নাম সেলিম ও প্রান্ত। তারা সম্পর্কে চাচাতো ভাই। সেলিম হচ্ছে মহেশপুর উপজেলার বজরাপুরে গ্রামের অভিযানে নিহত জঙ্গি তুহিনের ভাই। তিনি বলেন, দুপুরে একটি বাড়ির পাশ থেকে ডিনামাইট ও বোমা তৈরির সার্কিট বোর্ডগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। 

র‌্যাব-৬ এর একটি সূত্র জানায়, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নব্য জেএমবি সদস্য সেলিম হোসেন ও প্রান্ত রহমানের দেয়া তথ্যানুযায়ী পাশের আরেকটি জঙ্গি আস্তানার বাঁশঝাড় থেকে এবার ২০টি ডিনামাইট স্টিক, ৪০টি বোমা তৈরির সার্কিট উদ্ধার করা হয়েছে। সন্দেহজনক জঙ্গি আন্তানায় অভিযানে এর আগে কখনও এই ধরনের অস্ত্র পাওয়া যায়নি বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। 

ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এর আগে তিন দফা ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু তখন কিছুই পাওয়া যায়নি।

একের পর এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধানে আতঙ্কিত এলাকাবাসী : ঝিনাইদহে জেলায় বারবার বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ায় এলাকাবাসী চরমভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এখানে জনগণের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সম্মিলিত প্রতিরোধেই জঙ্গি দমন করা সম্ভব। এদিকে গত রোববার বিকেলে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাজেদুর রহমানের আদালতে মহেশপুর জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেফতারকৃত বাড়ির মালিক নব্য জেএমবি জহুরুল হক ও তার ছেলে জসিমকে হাজির করা হয়। এ সময় বিচারক জহুরুল হককে পাঁচদিন ও ছেলে জসিমকে তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দুই হোমিও চিকিৎসক, পুরোহিত ও সেবায়েত হত্যাকান্ডের পর ঝিনাইদহ জেলায় এবার একের পর এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মিলছে। এ সব আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে জঙ্গিদের নাশকতা কাজে ব্যবহৃত শক্তিশালী গ্রেনেড, বোমা, অস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গুলশান হোলি আর্টিজান হামলার মূল হোতা নিবরাসসহ জঙ্গিদের নিরাপদ ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনাকারী ও আশ্রয়দাতাদের নামও বেরিয়ে আসছে। ঘটনার শুরু ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি গান্না ইউনিয়নের বেলেখাল বাজারে ধর্মান্তিক বৃদ্ধ হোমিও চিকিৎসক খাজা ছমির উদ্দিনের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে। এরপর একের পর এক হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে জঙ্গিরা ঝিনাইদহে নিজেদের উপস্থিতির প্রমাণ দিয়েছেন। ঝিনাইদহ জেলা এখন পরিণত হয়েছে আতঙ্কিত জনপদে। নিরাপত্তা বাহিনীর জালে গুপ্ত হত্যাকারী জঙ্গিরা ধরা পরার পর কিছুদিন তারা এলাকা থেকে সরে যায়। এরপর গত ২২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায় ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটি গ্রামের ঠনঠনিয়া পাড়ার নব্য মুসলিম আব্দুল্লাহ’র বাড়িতে। সে ওই ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিল। গত ৭ মে মহেশপুর উপজেলার বজ্রাপুরে ও সদর উপজেলার লেবুতলা গ্রামে সন্ধান পাওয়া যায় দুইটি জঙ্গি আস্তানার। মহেশপুরে অভিযান চালালে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নব্য জেএমবির সদস্য সেই আব্দুল্লাহ ও পুলিশের গুলীতে তুহিন নিহত হয়। সেখান থেকে আটক করা হয় বাড়ির মালিক জহুরুল হক ও তার ছেলে জসিমকে। জঙ্গিবাদের ব্যাপারে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের দাবি, তিনটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল তা সফলভাবে নির্মূল করতে পেরেছি। এখানে জনগণের আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। আমরা সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে আছি।

এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ কলেজ অধ্যক্ষ বাদশা আলম জানান, ইসলামে জঙ্গিবাদের কোন স্থান নেই। নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা পাঠাপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করে বেশি বেশি পাঠাদান করালে জঙ্গিবাদ অনেকটা কমে আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

জামায়াতের চার কর্মীসহ ৪২ জন গ্রেফতার : ঝিনাইদহের ছয় উপজেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে জামায়াতের চার কর্মীসহ বিভিন্ন মামলায় ৪২ আসামীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার আলী শেখ জানান, সন্ত্রাস ও নাশকতাবিরোধী বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে রাতে জেলার ছয় উপজেলায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় সদর উপজেলা থেকে ১৭ জন, শৈলকুপা থেকে চারজন, হরিণাকুন্ডু থেকে দুইজন, কালীগঞ্জ থেকে সাতজন, কোটচাঁদপুর থেকে তিনজন এবং মহেশপুর থেকে চার জামায়াত কর্মীসহ নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি আরও জানান, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস নাশকতাসহ বিভিন্ন মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ