মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

‘বাল্যবিয়ে’ বনাম বিশেষ ক্ষেত্রে

-লাবিন রহমান
প্রাত্যহিক সংসারে যখন আমরা রান্না করি তখন মাছ, গোশত, তরিতরকারির অনেক ময়লা জমে। নির্দিষ্ট সময়ে লোক এসে ময়লা নিয়ে যায়। পরিবারে সদস্য বাড়লে এ ময়লার পরিমাণও বাড়ে। ময়লা আমরা কখনোই বসার, শোয়ার বা খাওয়ার ঘরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখি না। কিন্তু বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ নামে একটি লেজ যোগ করে যে পাঁয়তারা চলছে- তাতে মনে হয়, ময়লা পুরো সমাজে ছড়িয়ে দেয়া হবে। গত ২৪ নভেম্বর ২০১৬ “বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনে বিশেষ ক্ষেত্রে ‘সর্বোত্তম স্বার্থে’ আদালতের নির্দেশে এবং মা-বাবার সম্মতিতে যেকোনো অপ্রাপ্তবয়ষ্ক কন্যাশিশুর বিয়ে হতে পারবে” বিধান রেখে আইনটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। এখন এটি রয়েছে মন্ত্রণালয়ে, আরো খতিয়ে দেখার কাজ চলছে।
একটি মেয়েকে ১৮ বছরের আগে বিয়ে দেয়া যাবে না, এটি আমার জন্মের আগে করা আইন। সময়ের প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন ইত্যাদি করা যায়। তবে একটি আইন যখন পরিবর্তন করা হয়, তখন সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে- এটি অপরাপর আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি দেখা। এটি যেন সাংঘর্ষিক না হয়ে যায়। কিন্তু বিশেষ বিধান যোগ করে আইনটি পাস করলে কন্যাশিশুর বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর করার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিশুর বিয়েকে বৈধতা দেয়া হবে। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ধরা হয়, বিয়ের পর অন্তঃসত্ত¡া হলে একটি শিশুর গর্ভে আসে আরেক শিশু। এই বিধানের অধীনে বিয়ে হলে তা রাষ্ট্রীয় আইন, এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ বিশেষ করে শিশু অধিকার সনদের সাথে সাংঘর্ষিক হবে।
 অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে নারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বাড়বে; নারী শিক্ষার চলমান অগ্রগতি ব্যাহত হবে; বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার বাড়বে; বিয়ের নামে কন্যাশিশুদের অনেককেই পারিবারিক নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়া হবে; নারী-পুরুষ  বৈষম্য বাড়বে, এমনকি বিয়ের নামে শিশুপাচার বাড়বে এবং এক শ্রেণীর দুর্বৃত্ত এর সুযোগ নিতে পারে।
এ আইনে পিছিয়ে দেয়া ছাড়া এগিয়ে দেয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠন একই প্লাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে এবং আইনটি পাস না করার জোর দাবি জানিয়েছে।
সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে কিছু যুক্তি আছে। আমরা পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন ইত্যাদির মাধ্যমে জানতে পারি, বিভিন্ন সময় কন্যাশিশুর সাথে কিছু দুর্বৃত্ত অনৈতিক কাজ করে, অনেক সময় বখাটেরা তাদের পিছু নেয়। নানা প্রলোভনে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে। এর ফলে অনেক সময় সেই কন্যাশিশুটি অন্তঃসত্ত¡া হয়। মেয়ের জন্য মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের জীবন বিপন্ন হয়। এসব ঘটনা যখন ঘটে, তখন সেই পরিবার কী করে? অনেক সময় মেয়ে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায় বা বয়স কমিয়ে বিয়ে দেয়। অভিভাবকেরা এ কাজগুলো করেন লুকিয়ে, রাতের অন্ধকারে বা গোপনে। সরকারের অভিমত, তারা এই অভিভাবকদের কষ্ট লাঘব করতে চান এবং গর্ভের ওই শিশুটির একটি সামাজিক পরিচয় দিতে চান। এ কারণেই সরকার বিশেষ ক্ষেত্রের এ বিধানটি যোগ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আইনটি পাস হলে এসব মা-বাবা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন। কারণ আর লুকিয়ে বা চুরি করে কিছু করতে হবে না। তবে দুর্বৃত্ত কুকর্মগুলো পুরোদমে কর্মে পরিণত করবে, আর সেই সাথে বাড়বে তাদের উত্তরসূরি। এ যেন রান্নাঘরের ময়লা পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে দেয়ার মতো।
বর্তমানে দেশে ১৮ বছরের আগে একটি মেয়েকে বিয়ে দেয়া যাবে না, এ আইন থাকার পাশাপাশি রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি নানা কর্মসূচি। এর পরও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছরের আগে। সমাজে মানুষের নোংরা কাজ বা ময়লাগুলো ঢাকনা দিয়ে চাপা না দিয়ে বরং আইন পরিবর্তন করলে কী অবস্থা দাঁড়াতে পারে, তা একটু ভেবে দেখবেন।
শক্ত আইন করে নোংরা মানুষদের কঠিন শাস্তির আওতায় না এনে বরং প্রচ্ছন্নভাবে তাদের মন্দ কাজের বৈধতা দিলে, মানুষের মধ্যে পশুপ্রবৃত্তি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।
আগে ভয়ে যে কিছু করছিল না, সেও উসকানি পেতে পারে। নারীর শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, বিভিন্ন পর্যায়ে উন্নয়নসহ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি অর্জন করেছে। কিন্তু বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের এই ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ নামে লেজটি টেনে ধরতে পারে উন্নয়নের তেজি ঘোড়ার লেজ।
labinrahman@yahoo.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ