মঙ্গলবার ২৬ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

নতুন রেশমপথের উদ্যোগে কয়েক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি

১৫ মে, এএফপি, সিনহুয়া, লুমবার্গ : চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাঁর ‘এক অঞ্চল, এক পথ’ বা নতুন রেশমপথের উদ্যোগে বাড়তি কয়েক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চিন পিং তাঁর পররাষ্ট্রনীতির এই উদ্যোগকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উল্লেখ করে এটি যাতে পুরোনো বৈরিতা আর ক্ষমতার লড়াইতে জিম্মি হয়ে না পড়ে, সেটিও উল্লেখ করেছেন।
চীনের গ্রেট হল অব পিপল-এ গত রোববার বেল্ট অ্যান্ড রোড ফোরাম ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন সম্মেলনের প্রথম দিনে মূল বক্তৃতায় সি চিন পিং এ কথা বলেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেসহ অন্তত ২৯টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা এতে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ভারত এই সম্মেলনে অংশ না নিলেও বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলো প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্বের এক শরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছেন দুই দিনের এই সম্মেলনে। খবর এএফপি, সিনহুয়া ও ব্লুমবার্গের।
নাম উল্লেখ না করলেও ‘পুরোনো বৈরিতা আর ক্ষমতার লড়াই’ বলতে সি চিন পিং তাঁর বক্তৃতায় ভারতের কথাই বুঝিয়েছেন। কারণ এক অঞ্চল, এক পথ (ওবিওআর) নামের তাঁর এই উদ্যোগের অন্যতম প্রকল্প চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মধ্যে গেছে বলে ‘নতুন রেশমপথের’ উদ্যোগের বিরোধিতা করছে ভারত। ভারত এই ভূখ-কে সব সময়ই নিজেদের বলে দাবি করে থাকে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ তার ভূরাজনৈতিক অবস্থানের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ থেকে সুফল নিতে পারে। কারণ, এ ধরনের উদ্যোগ সবার সহযোগিতা ছাড়া বাস্তবায়ন করা কঠিন। কাজেই এর সুফল নিতে হলে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে উন্নয়নের পরিকল্পনাকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের এগোনো উচিত।
জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস-বিস) পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের কারণে ভারত অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ নিয়ে একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধের কারণে এই উদ্যোগ থেকে দূরে থাকা, ওই এলাকার লোকজনকে পণবন্দী করা ঠিক না।
মুন্সি ফয়েজের মতে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনের প্রেসিডেন্টের মহাপরিকল্পনায় যুক্ত হয়েছে। আর এ ধরনের উদ্যোগ সবাইকে মিলেই বাস্তবায়ন করতে হয়। কাজেই বাংলাদেশের উচিত হবে চীন ও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে এবং দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে এই উদ্যোগ থেকে সর্বোচ্চ সুফল আদায় করা।
চীনের প্রেসিডেন্ট তাঁর অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত ও ইউরোপ পর্যন্ত বন্দর, সড়ক, রেলপথ পুনর্নির্মাণ এবং শিল্প পার্ক তৈরির মাধ্যমে আফ্রিকা, এশিয়া আর ইউরোপের সঙ্গে নিজের দেশকে সংযুক্ত করার উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে ‘শতাব্দীর পরিকল্পনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সি চিন পিং। বলা হচ্ছে, এই প্রকল্প বিশ্ব বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে চীনের বিদ্যমান শক্তিশালী অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে।
সি চিন পিংয়ের মতে, প্রাচীন রেশমপথ শান্তিকালীন সময়ে বিকশিত হয়েছিল কিন্তু যুদ্ধের সময় এটি শ্রীহীন হয়ে পড়ে। অঞ্চল ও পথের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন। এই উদ্যোগ যেহেতু ‘শান্তির জন্য রুট’, তাই সব রাষ্ট্রের উচিত আঞ্চলিক অখ-তা ও পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো। তেমনি একে অন্যের উন্নয়নের পন্থা, সামাজিক ব্যবস্থা, মূল স্বার্থ এবং উদ্বেগের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।
সি চিন পিং বলেন, প্রাচীন রেশমপথের পাশের কিছু অঞ্চল দুধ ও মধুর অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হতো। এখনো ওই অঞ্চলগুলো সংঘাত, সহিংসতা, সংকট আর চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। এ ধরনের তৎপরতা চলতে দেওয়া যায় না।
জানতে চাইলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) ভাইস প্রেসিডেন্ট মো হুমায়ুন কবীরপ্রথম আলোকে বলেন, চীনের প্রেসিডেন্টের এই উদ্যোগকে কৌশলগত এবং কৌশলগত দিকের সঙ্গে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট এই দুই দিক থেকে দেখার সুযোগ আছে। চীন বিষয়টিকে বহুমুখিতার দিক থেকে দেখতে চাইলেও ভারত শুধু কৌশলগত দিক থেকেই দেখছে। ভারত যেটা করছে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে গত পাঁচ-ছয় দশকের অভিজ্ঞতায় এ ধরনের অবস্থান খুব কাজে আসেনি।
সম্মেলনের প্রথম দিনে সি চিন পিংয়ের পর ভ্লাদিমির পুতিন এবং রজব তৈয়ব এরদোয়ান বক্তৃতা করেন। তাঁরা দুজনই চীনের প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে সমর্থন জানান।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রেখেই অঞ্চল ও পথের উদ্যোগের সম্ভাবনার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামোগত সংযুক্তি নয়, বিনিয়োগ, পণ্য, সেবা এবং জনগণের সেবার কথাও বিবেচনায় নিতে হবে। সব মিলিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বহুমাত্রিক সংযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ