বৃহস্পতিবার ২৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ভ্রাম্যমাণ আদালত বাতিলের রায় স্থগিত

স্টাফ রিপোর্টার : নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ (মোবাইল কোর্ট) আদালত পরিচালনা অবৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের দেয়া রায় চারদিনের জন্য স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালত। একইসঙ্গে আদালত এ বিষয়ে শুনানির জন্য সরকারের করা আবেদন আগামী ১৮ মে দিন নির্ধারণ করে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দিয়েছেন। 

গতকাল রোববার সকালে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করে সরকার। দুপুরে চেম্বার জজ আদালত বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ১৮ মে পর্যন্ত হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে ওইদিন শুনানির জন্য নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। 

আদালতে সরকার পক্ষে শুনানিতে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি এটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী ব্যারিস্টার হাসান এম এস আজিম।

পরে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, হাইকোর্টের রায় ১৮ মে পর্যন্ত স্থগিত করে ওই দিন বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠিয়েছেন চেম্বার জজ বিচারপতি। এতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আপাতত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে আইনগত কোনো বাধা নেই

গত ১১ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ (মোবাইল কোর্ট) আদালত পরিচালনার ২০০৯ সালের আইনের ১১টি ধারা ও উপধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এই আইনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অবৈধ ঘোষণা করা হয়। 

ভ্রাম্যমাণ আদালতের আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা পৃথক তিনটি রিটে এর আগে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

আদালতের রায়ে বলা হয়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ১১টি বিধান বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় আঘাত করেছে। আইনের ধারা ৫, ৬ (১), ৬ (২), ৬ (৪), ৭, ৮ (১), ৯, ১০,১১, ১৩ ও ১৫ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ধারাগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে (নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ) ক্ষমতার পৃথক্করণ-সংক্রান্ত সংবিধানের দুটি মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। অনাকাঙ্খিত জটিলতা ও বিতর্ক এড়াতে উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়া বিষয়গুলো ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেয়া সব আদেশ, সাজা ও দন্ডাদেশ অতীত বিবেচনায় সমাপ্ত বলে মার্জনা করা হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, আইনের এসব বিধানের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা দেয়া সংবিধানের লঙ্ঘন এবং তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় আঘাত এবং ক্ষমতার পৃথক্করণের নীতিবিরোধী। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ বাংলাদেশ কর্মকমিশনের সব সদস্য (প্রশাসন) প্রশাসনিক নির্বাহী। প্রশাসনিক নির্বাহী হিসেবে তারা প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম বিচারিক ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন না, কেননা মাসদার হোসেন মামলার রায়ে এ বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বলা আছে। আরও বলা হয়, ধারা ৫, ৬ (১), ৬ (২), ৬ (৪), ৭, ৮ (১), ৯, ১০,১১ ও ১৩ ‘কালারেবল প্রবিশন’। ধারাগুলো সরাসরি মাসদার হোসেন মামলার রায়ের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পৃথক দুটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ছয় বছর আগে এবং অপর একটির রিটে পাঁচ বছর আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ১১ টি বিধান কেন অবৈধ ও বেআইনী ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। গত মার্চে রুলের ওপর চুড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছিলেন। এরপর গত বৃহস্পতিবার ( ১১ মে) কার্যতালিকায় রায় ঘোষণার জন্য আসে।

জানা যায়, ভবন নির্মাণ আইনের কয়েকটি ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এসথেটিক প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান খানকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন। ছয়দিন পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন (মোবাইল কোর্ট অ্যাক্ট-২০০৯) কয়েকটি ধারা ও উপধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ১১ অক্টোবর কামারুজ্জামান হাইকোর্টে রিট করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। রুলে রিট আবেদনকারীর সাজা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি সাজার আদেশ স্থগিত করা হয়।

এছাড়া ২০১১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভবন নির্মাণ আইনের কয়েকটি ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে টয়েনবি সার্কুলার রোডে অবস্থিত এক বাড়ির মালিক মজিবুর রহমানকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। আইনের বিধান ও অর্থ ফেরতের নির্দেশনা চেয়ে ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর রিট করেন মজিবুর রহমান। প্রাথমিক শুনানি শেষে ওই দিন তার সাজা স্থগিত করে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। 

পৃথক আরেকটি রিট দায়ের করেন দিনাজপুরের বেকারি মালিকদের পক্ষে মো. সাইফুল্লাহসহ ১৭ জন। ২০১২ সালে ২ মে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের কয়েকটি বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন তারা। ওই রিটে বেকারিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ক্ষেত্রে খাদ্য বিশেষজ্ঞ ও পরীক্ষার জন্য যন্ত্রপাতি সঙ্গে রেখে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা চাওয়া হয়। প্রাথমিক শুনানি শেষে ওই বছরের ৮ মে হাইকোর্ট রুল সহ অন্তবর্তীকালীন আদেশ দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ