বৃহস্পতিবার ২৭ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

বিএনপির ভিশন ২০৩০ অন্ধকার গহ্বরের শেষে আলোর রেখা -মির্জা ফখরুল

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সেন্টার ফর ন্যাশনাল এন্ড রিজিওনাল রিসার্চ স্টাডিজের উদ্যোগে বিএনপির ভিশন-২০৩০ বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

 

# ভাল ভাল কথা শেষ এখন কাজ করতে হবে -জাফরুল্লাহ # ভিশন কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে -মাহবুব উল্লাহ # গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলনে নামতে হবে -গাজী

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপির ভিশন ২০৩০ অন্ধকার গহ্বরের শেষ আলোর রেখা। বলতে হবে চিন্তা ও কাজের ক্ষেত্রে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ভিশন ২০৩০ এর বড় প্রমাণ। বিএনপির দর্শন অনুকরণ করে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক দর্শন, কর্মসূচি পরিবর্তন করেছে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব। 

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বিএনপি ঘোষিত ভিশন-২০৩০ নিয়ে এক গোল টেবিল আলোচনায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ন্যাশনাল রিজিওনাল রিসার্স স্টাডিজ এর আয়োজন করে। সভার সঞ্চালক ছিলেন ব্যারিস্টার পারভেজ আহমেদ। 

আওয়ামী লীগকে বিএনপি অনুসরণ করছে আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন আওয়ামী লীগই বিএনপিকে অনুসরণ অনুকরণ করে। এর ব্যাখ্যায় বিএনপি মহাসচিব বলেন, ১৯৭৫ সালে এই আওয়ামী লীগ সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে দিয়ে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করেছিল। সব পত্রিকা বন্ধ করে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করেছিল। সরকারপন্থী মাত্র ৪টি পত্রিকা রেখে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন বহুদলীয় গণতন্ত্র দিলেন সেটাকে অনুকরণ করে নিবন্ধিত হয়ে তারা রাজনীতি শুরু করলেন।

সবার আন্তরিক সহযোগিতা পেলে ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়ন সম্ভব জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, তার আগে প্রয়োজন সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আর গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।

মির্জা ফখরুল বলেন, ২০৩০ সালের যে ভিশন, যে কথা বলা হয়েছে একটি স্বপ্ন। আসলে এই স্বপ্নই আমরা দেখতে চাই, বার বার সেই অন্ধকারে ফিরে যেতে চাই না। আমরা অন্ধকারের গহবরের শেষে একটা আলোর রেখা দেখতে চাই। সেই আলোর রেখা আমরা মনে করি, দেশনেত্রীর এই ২০৩০ সালের যে ভিশন, সেই ভিশন। উই ওয়ান্ট টু ড্রিম। আমাদের বয়স প্রায় শেষের দিকে। দেশনেত্রী তার জীবনের শেষ সায়াহ্নে গেছেন। এখন তিনি জাতির সামনে কিছু দিতে চান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে যে কথা বলতে চান, এসো তোমরা স্বপ্ন দেখো, সেই স্বপ্নকে আমরা এইভাবে দেখতে চাই, আসো আমরা একসাথে কাজ করি।

বিএনপি মহাসচিব ‘ভিশন-২০৩০’ যুবক-যুবতীসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের মজুরি, ২০৩০ সালে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ৫০০০ মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়া, বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ডবল ডিজিটে উন্নীত করা, তথ্য প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ দমন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাখাত, অর্থনৈতিক সংস্কার প্রভৃতি বিষয়ে বিএনপির ভবিষ্যৎ ভাবনাগুলো ব্যাখ্যা করেন।

ভিশন-২০৩০ ঘোষণা শেষ হতে না হতেই আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিক্রিয়া দেয়ার সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, তারা বলছেন এটা অন্তঃসারশুন্য, ফাঁপা বেলুন। কেউ আবার বলছেন, বিএনপি তাদের অনুকরণ করেছে। কিন্তু বিএনপির দর্শন অনুকরণ করে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক দর্শন, কর্মসূচি পরিবর্তন করেছে।

বিএনপি আওয়ামী লীগের ভিশন অনুকরণ করেনি দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, যেভাবেই হউক আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বে। তাদের কাছ থেকে আমরা গঠনমূলক ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

বিএনপির ভিশনে জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতের কথা উল্লেখ না থাকার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে এই বলে ঐক্য হয়েছিলো যে, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় রাজপথের আন্দোলনে বিএনপির পাশে জামায়াত থাকবে। এর বাইরে অন্য কিছু না। তাদের সঙ্গে যে জোট এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক। তাই ২০৩০ সালে জামায়াতের সঙ্গে আমাদের কি সম্পর্ক হবে সেটা এই মুহূর্তে বলার অবকাশ নেই। সুতরাং এখানে জামায়াতের বিষয়টি উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

আলোচনায় অংশ নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী খালেদা জিয়ার ঘোষিত ভিশন-২০৩০ এর বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, খালেদা জিয়া তার অনেক বক্তব্যে র‌্যাব বিলুপ্তির কথা বলেছেন। কিন্তু যে ভিশন দিয়েছেন সেখানে র‌্যাব বিলুপ্তির কথা বলেননি। এমনকি জনগুরুত্বপূর্ণ রামপাল ইস্যু নিয়ে কোনও কথা বলেননি। এমনকি রামপাল শব্দটিও নেই। তিনি বলেন, ভিশনে একইভাবে ভারতীয় আগ্রাসন, অত্যাচার, নির্যাতন, বিশেষ করে দেশে ‘র’য়ের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কি ব্যবস্থা নিবেন সে বিষয়েও কিছু বলেননি।

বিএনপির ভিশন নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, পরীক্ষার হলে নকল ছাড়া সব নকল করা ভালো। আপনারা বলছেন, বিএনপি অনুকরণ করেছে। খারাপ কিছু অনুকরণ না করা ভালো, ভালোর অনুকরণ করলে দোষের কিছু নেই।

বিএনপি নেতাদের উদ্দেশ্যে ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, ভালো ভালো কথা শেষ। এখন কাজ করতে কবে মাঠে নামবেন। না এবারও বলবেন ঈদের পর। আপনারা আর কত অজুহাত দেবেন।

নাগরিক ঐক্য আন্দোলনের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আপনাদের ২০ দল, যা আছে থাক। আপনারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা করবেন, মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত রকম গৌরব ফিরিয়ে দেবেন, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন। জামায়াতে ইসলামীসহ? ওরা কী যাবে? বলতে পারেন জামায়াতে ইসলামের তো রেজিস্ট্রেশনই নাই, সমস্যা কী?

কিন্তু যদি এ রকম হয়, দেড় বছর-দুই বছর পরে নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসে, তখন জামায়াতে ইসলামী আপনাদের সাথেই থাকবে। জামায়াতে ইসলামী একটা মামলা ঠুকে দেবে যাদের যুদ্ধাপরাধীর নামে বিচার করা হয়েছে, তাদের পুনঃবিচার করতে হবে। কী করবেন আপনারা? না এখনই আপনাদের বিব্রত করতে চাইছি না। আমি এটা বুঝতে চাইছি, আপনাদের স্ট্রাকচার কী, অর্গানোগ্রাম কী যেটা নিয়ে পুরো বিষয়টা বাস্তবায়ন করতে চান।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রেখে বিএনপির উদ্দেশে মান্না বলেন, যদি ভিশনের কথা বলেন, আমি এই প্রশ্ন করতে পারি যে, আট বছর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর শাসন দেখবার পরে, তার বিগ্রহ দেখবার পরে আপনারা বলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করতে হবে। কিন্তু তিন বার প্রধানমন্ত্রী তো আপনিও ছিলেন, এই ক্ষমতা আপনিও এক্সসারসাইজ করেছেন, তখন বুঝতে পারেন নাই যে, এটা আপনাকে স্বৈরশাসক বানিয়ে দিতে পারে। তখন তো পরিবর্তন করা হয়নি।

দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভালো কথা বলেছেন সংখ্যানুপাতিক একটা প্রতিনিধিত্ব চান। কিন্তু উচ্চকক্ষ বলবার পরও কেনো বললেন উচ্চ কক্ষ নিয়ে আরো চিন্তাভাবনা করা হবে। এতদিন ধরে আলাপ আলোচনা করবার পরও এটা স্থগিত কেনো? যখন আপনি ভিশন দেবেন, ভিশনারি হবেন, সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। তখন আপনাকে দৃঢ়চিত্ত হতে হবে, দোদুল্যমান মানুষগুলোকে বুঝিয়ে সাথে আনতে হবে অথবা দোদুল্যমান মানুষগুলোকে বলতে হবে তুমি পথ ছেড়ে দাও, আমি এগিয়ে যাই। নানা সমালোচনার করলেও এরকম একটা পরিকল্পনা দেয়ার জন্য খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদও জানান মান্না।

ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, খালেদা জিয়ার ঘোষিত ভিশন ২০৩০ কাগজে লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে আরও অনুশীলন করতে হবে। সম্ভব হলে সারাদেশে বিএনপির কর্মীদের মাধ্যমে জনগণের কাছে এই ভিশন তুলে ধরতে হবে। আর যদি সেই ইচ্ছা, ধৈর্য, মানসিকতা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকে সেক্ষেত্রে বিএনপির ঘোষিত ভিশন বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। হয়তো এক সময় হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, আন্তরিকতায় হউক, পরিস্থিতির চাপে হউক বা মুখ রক্ষায় হলেও দেশের প্রধান বড় দুটো রাজনৈতিক দল তাদের ভবিষ্যত ভিশন উপস্থাপন করায় আমি ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক রুহুল আমিন গাজী বলেন, ভিশন ২০৩০ দিয়ে মূলত আগামীতে বিএনপি কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে সেকথা ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই ভিশন বাস্তবায়ন করতে হলে দেশে সবার আগে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। এজন্য জনগণের কাছে তাদের কোনো জবাবদিহিতা নাই। তারা চেষ্টা করছে, আগামী নির্বাচনটা এমনভাবে করা যাতে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল ক্ষমতায় না যেতে পারে। এজন্য তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলনের ওপর জোর দেন। 

জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেন খালেদা জিয়া ভিশন-২০৩০ এর মাধ্যমে যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপূরক। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশে মত প্রকাশের সুযোগ দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে আসছে। গণতন্ত্র নাই। দেশে গণতন্ত্র অত্যন্ত প্রয়োজন। দেশের জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা রয়েছে। সময় এসেছে আমাদের সবাইকে এখন জাতি হিসেবে সুসংগঠতি হবার। আর সেক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োজন হবে দেশে একটি অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন।

গোলটেবিল আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক সচিব ইসমাঈল জবিউল্লাহ, সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সাখাওয়াত হোসেন বকুল, সাংবাদিক নেতা কাদের গনি চৌধুরী প্রমুখ। এছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ