বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

’১৮ নির্বাচনের সময় প্রস্তুত, আওয়ামী সুবিধাবাদীরাও প্রস্তুত

জিবলু রহমান : [চার]
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা-উপজেলা কমিটি কাউকে বহিষ্কার করতে পারে না। এমনকি কেন্দ্রীয় কমিটিও কাউকে বহিষ্কার করতে হলে কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক ডেকে অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে কারণ দর্শানো এবং জবাব পাওয়ার পর সেটা গৃহীত না হলেই কেবল এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জেলা-উপজেলা কমিটি কাউকে বহিষ্কার করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের কাছে সুপারিশ করে চিঠি দিতে হবে। সেটি গৃহীত হলে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
দলের গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৪৬নং অনুচ্ছেদে প্রাতিষ্ঠানিক শৃংখলা শিরোনামের ‘ঠ’ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় নির্বাচনে কেহ দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হইলে দল হইতে সরাসরি বহিষ্কার হইবেন এবং যাহারা দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করিবেন, তদন্ত সাপেক্ষে মূল দল বা সহযোগী সংগঠন হইতে বহিষ্কার হইবেন।’
‘ক’ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘দলের কোনো সদস্য আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, গঠনতন্ত্র ও নিয়মাবলী বা প্রতিষ্ঠানের পরিপন্থী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করিলে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল, কার্যনির্বাহী সংসদ, সংসদীয় বোর্ড বা সংসদীয় পার্টির বিরুদ্ধে কোনো কাজ করিলে শৃংখলাভঙ্গের অভিযোগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ তাহার বিরুদ্ধে যে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।’ ‘ঙ’ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যুক্তিসঙ্গত সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হইবে।’ এছাড়া অন্যান্য অনুচ্ছেদের সারসংক্ষেপ এমন দাঁড়ায় যে, কাউকে বহিষ্কার করতে হলে সংশ্লিষ্ট কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন, তার ওপরের কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে তা দলের সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠাতে হবে। সাধারণ সম্পাদক সেটা কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তুলবেন। ওই বৈঠকে অনুমোদন হলেই কেউ বহিষ্কার বলে গণ্য হবেন। তবে কেউ চূড়ান্ত বহিষ্কার হলেও জাতীয় কমিটিতে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন। এ সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রকৃষ্ট উদাহরণ দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য লতিফ সিদ্দিকীর বহিষ্কারের ঘটনা।
পাঁচ সিটি কর্পোরেশন এবং উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় কিছু নেতাদের বহিষ্কার করা হলেও পরে বহিষ্কৃত নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে সাধারণ সম্পাদক বরাবর আবেদন করেন ‘নামমাত্র’ বহিষ্কৃত নেতারা। ১৮ মার্চ ২০১৫ দলের সাধারণ সম্পাদক এবং তৎকালীন এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ের একজন স্টাফ দু’টি চিঠিতে তার স্বাক্ষর নিতে যান। এর মধ্যে একটি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেসব নেতাকে জেলা কমিটি বহিষ্কার করেছে সেগুলো প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে এবং অন্যটি জেলায় জেলায় সদস্য নবায়ন ও সংগ্রহের রসিদের মুড়ি চেয়ে চিঠি। (সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ২ এপ্রিল ২০১৫)
আওয়ামী লীগ সমর্থক ভুঁইফোড় সংগঠনের সংখ্যা গত ৩ বছরে অনেক বেড়ে গেছে। নিবন্ধন, গঠনতন্ত্র ও কার্যালয় কিছুই নেই। কেন্দ্রীয়ভাবেও নেই কোনো স্বীকৃতি। সংগঠনের নেতা-কর্মীও হাতেগোনা। দাবি, তারা আওয়ামী লীগের অঙ্গ বা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। দলের জন্য তারা কাজ করেন। বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একশ্রেণির মানুষ যেভাবে লম্বা লম্বা বুলি ঝাড়ছে, ত্যক্তবিরক্ত দেশবাসী ব্যাপারটিকে ‘অতি আওয়ামী লীগার সাজার প্রতিযোগিতা’ বলে অভিহিত করছেন। যারা জীবনে কখনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, এমনকি তাদের চৌদ্দগোষ্ঠীর কেউ কখনো বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণও করেননি বা দলটির সমর্থকও ছিলেন না, তাদেরই এখন বুক চিতিয়ে নিজেদের আওয়ামী লীগার বলে জাহির করতে দেখা যায়। এদের চোটপাট ও আস্ফালন দেখে দীর্ঘদিনের ত্যাগী-পরীক্ষিত আওয়ামী লীগ নেতারা হতাশার সুরে বলছেন, ‘এত আওয়ামী লীগার আমরা রাখব কোথায়!’ (সূত্রঃ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ২৬ মার্চ ২০১৬)
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৭৫-এর আগেও এ ধরনের আওয়ামী লীগারের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ১৫ আগস্টের পর লণ্ঠন হাতে পইপই করে খুঁজেও ওই অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগারদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তখন ত্যাগী নেতারাই দলের হাল ধরতে এগিয়ে আসেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ফের হাইব্রিড আওয়ামী লীগারদের উপদ্রব শুরু হয়। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরও দলের চরম দুর্দিনে সেই হাইব্রিড-ভুঁইফোড়রা হাওয়া। মামলা-হামলা, জেল-জুলুম সবকিছুই মোকাবিলা করেছেন খাঁটি ও ত্যাগীরাই। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর ভুঁইফোড়দের আত্মপ্রকাশের হিড়িক লেগে যায়। তারা নানা কিসিমের ‘সংগঠন’ বানায় এবং ‘নেতা’ হয়ে ছড়ি ঘোরায়। গত ৩ বছরে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে হাস্যকর ও অশোভন চেহারার অনেক সংগঠন। খোদ রাজধানীতেই দুই থেকে আড়াই শতাধিক এই সংগঠনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। তারা জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, সিরডাপ, পাবলিক লাইব্রেরি, জাতীয় জাদুঘর ও মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরে হল রুম ভাড়া করে অনুষ্ঠান করে থাকে। আলোচনা সভার নামে মূলত এক ধরনের চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হন সংগঠনের নেতারা। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে গভীর আগ্রহের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করছেন। অবস্থার দৃষ্টে রসিকজনরা বলেন, ‘মলমেই তো ঘা, শরীরের ক্ষত সারবে ক্যামনে?
এসব নাম-প্যাড সর্বস্ব সংগঠনের কার্যালয় দূরের কথা পূর্ণাঙ্গ কমিটি পর্যন্ত নেই। অনেক সংগঠনের প্যাডে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, ঢাকার ঠিকানা লেখা আছে। একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন নামে একাধিক সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দিনের বেশির ভাগ সময় তাদের সচিবালয়ে তদবিরে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরে এসব সংগঠন নিয়ে মুখরোচক আলোচনাও হচ্ছে।
ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদ পেতে ভুঁইফোড় এসব সংগঠন আওয়ামী লীগ কিংবা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য যতটা না কাজ করছে তার চেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়ছে বিতর্কে। প্রশ্ন উঠেছে, এসব সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক কারা? রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন থেকে নির্বাচিত একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ‘নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী’-কে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। সরকারি একটি ব্যাংকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া অন্তত দুজন পরিচালক এসব সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নেন বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা কৌতুক করে এসব সংগঠনের নাম দিয়েছেন ‘স্বার্থ হাসিলের নতুন দোকান’ বলে। সংগঠনের নেতৃত্বে যারা আছেন ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে তাদের পরিচয় স্রেফ ধান্ধাবাজ। সচিবালয়, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেখা যায় ভুঁইফোড় এসব সংগঠনের নেতাদের নানান তদবির-বাণিজ্য নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতে। সরকারের প্রভাবশালীদের আশীর্বাদ কীভাবে পেতে হয় তার সব কৌশলই যেন জানা এসব সংগঠনের কথিত নেতাদের। ভুঁইফোড় সংগঠনের আত্মপ্রকাশ আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও বঙ্গবন্ধুর নামে দু-একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের কাছে আস্থা কুড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে দলের জন্য আপসহীন ও সাহসী ভূমিকা রেখে শেখ হাসিনারও দৃষ্টি কেড়েছে এসব সংগঠন।
সময়ের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা এসব সংগঠনও এখন আর একটি কমিটিতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রায় প্রতিটি সংগঠনের নেতৃত্বেই দুই কিংবা ততোধিক কমিটি রয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট’-এও এখন বিভক্তি। এর একাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন অ্যাডভোকেট তারানা হালিম এমপি ও অরুণ সরকার রানা এবং অন্য অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চিত্রনায়ক ফারুক ও অভিনেত্রী ফাল্গুনী হামিদ। ‘বঙ্গমাতা পরিষদ’-এও বিভক্তির নেতৃত্ব। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, অন্য অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন একজন সাংবাদিক। বঙ্গমাতা পরিষদ দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সাংগঠনিক কর্মসূচির নামে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশেও ছুটছেন এই সংগঠনের নেতারা। আওয়ামী লীগের মূলধারার নেতা-কর্মীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এদের দাপট। ‘ওয়ান-ইলেভেনে নেত্রীর মুক্তি আন্দোলনে যখন কেউ ছিল না তখন আমরাই ছিলাম রাজপথে’ এমন কথা উচ্চারিত হয় ধান্ধাবাজ হিসেবে পরিচিত এসব সংগঠকের মুখে মুখে। টানা দুবার ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগে নৌকার পালে যখন হাওয়া বইছে ঠিক তখনই সংগঠনের নামে নতুন ‘নতুন দোকানদাররা’ নৌকার মাঝি, নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী নামে ‘দোকান’ খুলেছেন। মতলববাজ সংগঠনের নেতারাও বসে নেই। সংগঠনকে ব্যবহার করে যে যার মতো হাতিয়ে নিচ্ছেন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সংগঠনের এই নামসর্বস্ব দোকান ব্যবহার করেই কেউ কেউ রাজধানীতে ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও একাধিক। সংগঠনের নতুন নতুন দোকান খুলে মতলববাজ এসব সংগঠক টার্গেট করেছেন প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও ব্যাংক-বীমার মালিক, পরিচালক ও করপোরেট হাউসের মালিকদের। বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে এসব সংগঠনের নেতারা সভা-সেমিনারের নামে অর্থ উপার্জনের নতুন পথ খুলছেন। হুমায়ুন কবির মিজি নামে এক সংগঠকের নিয়ন্ত্রণেই একাধিক সংগঠন। ‘নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী’, ‘বঙ্গবন্ধু একাডেমি’ সবখানেই রয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক ইস্যু ছাড়াও সরকারের উল্লেখযোগ্য সফলতায় প্যাডসর্বস্ব এসব সংগঠন দিচ্ছে অভিনন্দন কর্মসূচি। ডিজিটাল ব্যানার যেন আগের থেকেই সাজানো। শুধু প্রধান অতিথির তালিকায় নাম বসালেই দায়িত্ব শেষ। মিডিয়া কাভারেজ কীভাবে পেতে হয় সে ব্যাপারেও সিদ্ধহস্ত এসব সংগঠনের কর্মকর্তারা। সংগঠন ভুঁইফোড় হলেও সংগঠনের ক্যারিশমা অন্য জায়গায়। প্রধান অতিথি হিসেবে আসছেন যারা তাদের অনেকেই মন্ত্রী কিংবা ক্ষমতাসীন দলের আলোচিত নেতা। আর দর্শক সারিতে যেন একগুচ্ছ চেনামুখ। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ