মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রমযান মাসে দ্রব্যমূল্য

মাহমুদুল হক আনসারী : পবিত্র মাহে রমযান সমাগত। মুসলমানদের নিকট রমযান মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ মাসের ইবাদত বন্দেগীর সাওয়াব অন্য মাসের চেয়ে শতগুণ বেশী। অন্য মাসে যারা ইবাদত বন্দেগীতে অলসতা দেখায়, তারা এ মাসের এবাদতে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করে। চন্দ্র মাসের বার মাস ঘুরে বছরে একবার রমযান মাস মুসলমানদের নিকট মেহমান হিসেবে আসে। সমস্ত মাসের মধ্যে রমযান মাসকে বছরের সর্দার বলা হয়েছে। এ মাসে পুণ্য আদায় করলে যেভাবে সাওয়াব দেয়া হয়, একইভাবে ইসলাম ও শরীয়ত বিরোধী কর্ম করলেও গুণাহের পাল্লাভারী হয়। ইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলমান চায় তাদের ভাল কাজের পাল্লা ভারী  হোক। কোন মুসলমান কামনা করে না যে, এ মাসে আল্লাহ ও বান্দার ন্যায্য অধিকার নষ্ট করে অপরাধীর খাতায় নাম লিখি। ইসলাম ধর্মের মধ্যে অপরাধ শুধুমাত্র মানুষ খুন করলেই অপরাধ হবে এমন ভাবা ঠিক না। আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে অতি মুনাফা অর্জনের জন্য পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করা বড় অপরাধ। এ অপরাধ ছোট অপরাধ নয়। মানুষের অন্ন প্রাপ্তিতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মানবতাকে সংকটে ফেলা কবিরা বা বড় গুণাহের মধ্যে পড়ে। এ গুণাহের জন্য শরীয়ত বা ইসলামের ফয়সালা মতে তওবা করতে হয়। তওবা ছাড়া কবিরা গুণাহ আল্লাহ ক্ষমা করেন না। রহমত, মাগফিরাত, নাযাতের এ মাসে কোন মুসলমানের পক্ষে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে কৃত্রিম সংকট তৈরী করা মারাত্মক গুণাহের কাজ। পবিত্র রমযানের রহমত, নাযাত, বরকত আশা করলে কোন মুসলমান ব্যবসায়ী এমন আচরণ করতে পারে না। পৃথিবীর অন্য দেশে পবিত্র রমযান মাসে দ্রব্য মূল্য স্থিতিশীল রাখা হয়। রোজাদারদের জন্য সহনীয় আচরণ করা হয়। ছোলা, চিনি, মাছ, মাংসের বাজার স্থিতিশীল রাখা হয়। আর এর বিপরীতভাবে দেখা যায় বাংলাদেশের বাজারের অবস্থা। বাংলাদেশ ছিয়াশি পারসন মুসলমানের দেশ। এখানে রমযান মাসে কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান রোজা, নামায, তারাবিহ আদায় করে থাকে। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, কর্মচারী সকলেই সমানতালে রোজার মাসকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে সিয়াম পালন করে। দেখা যায় এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী অতিমুনাফা লাভের আশায় দ্রব্যমূল্য  বৃদ্ধি করে রাতারাতি কোটিপতি, শিল্পপতি বনে যায়। অতিমুনাফা কৃত্রিম সংকট, মানবজাতির আহার ও ভোগের বিরোধিতা করে, যারা সংকট সৃৃষ্টি করে শিল্পপতি হয়ে যায় তাদের জন্য এ আয় সম্পূর্ণভাবে হারাম। এটা অবৈধ ও অনৈতিক আয়ের মধ্যে পড়ে। এমনভাবে সংকট সৃষ্টি করে আয় করাকে ধর্ম ও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় অবৈধ আয় বলা হয়ে থাকে। আইন ও ধর্মের দৃষ্টিতে তারা অপরাধী। এ অপরাধ যারা করে তাদের শাস্তি ধর্মে ও প্রচলিত দেশের আইনেও আছে। অনৈতিকভাবে মূল্য বৃদ্ধিকে ব্যবসা বলা যায় না, সেটা অন্য কিছু। ইসলামে ব্যবসাকে হালাল করা হয়েছে। মূল্য বৃদ্ধি ও গোডাউনজাতকে হারাম করা হয়েছে। যে কোন ধর্মের  মধ্যে ব্যবসায়ে অনৈতিক আচরণ ও সমাজকে অস্থির করা অবৈধ। এ সব অপরাধকে যারা অপরাধ মনে করে না, তারা আরো বড় অপরাধী। ব্যবসা-বাণিজ্য শিল্প কারখানা, সবকিছু মানব কল্যাণের জন্য। যে ব্যবসা, শিল্প মানব বিরোধী সেটা ব্যবসা হতে পারে না। ব্যবসা হিসেবে সেটাকে কোন ধর্মের মধ্যেই গণ্য করে না। ব্যবসায়ীদের উচিত ব্যবসাকে ব্যবসার নিয়মমতে পরিচালনা করা, ব্যবসা যেন হারাম ও অবৈধ না হয়। প্রকৃত ব্যবসার মধ্যে এক এ দশগুণ লাভ পাওয়া যায়। অবৈধ ও অনৈতিক ব্যবসার মধ্যে গুণাহের পরিমাণও সেরূপ। ইসলাম ধর্ম মতে সৎ মুসলমান ব্যবসায়ীর স্থান হবে হযরত ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এর সাথে। তার বিপরীত হলে তাদের অবস্থা কাদের সাথে হবে সেটা এখানে বলছি না। দুনিয়ার লোভে না পড়ে মানবতা ইসলাম ও রোজাদারদের সাহায্যে এগিয়ে আসি। এখানে শুধু মুসলমানদের কথা বললে হবে না। অন্য ধর্মের যারা অনুসারী আছে তাদেরকেও সংকটে ফেলা যাবে না। তারাও আল্লাহর বান্দা। সৃষ্টির সেরা মানুষ। এক কথায় কোন শ্রেণীর মানুষকেই কষ্ট দেয়া যাবে না। সব ধর্ম, গোত্র ও শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও অধিকার পাওয়া নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সমাজকে খাদ্যে স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের ভূমিকার তুলনা নাই। ব্যবসায়ীরা দেশকে স্থির ও অস্থির দুটোই করতে পারে। তাদের কাছে দেশ প্রেম, মানব প্রেম, জাতির প্রতি স্নেহ মায়া মমতা থাকলে তারা কখনো সমাজ ও মানব বিরোধী কাজ করতে পারে না। মুনাফার নিয়ম মেনে ব্যবসা করেও মানুষ প্রচুর অর্থের মালিক হচ্ছে। “যত কম তত গম” যত বেশ তত শেষ। হালাল ও ন্যায্য ব্যবসার শান্তি সুখ অন্যরকম। সে চিন্তা মাথায় রেখে ব্যবসা করলে ইহাও পরকাল শান্তিপূর্ণ হবে। সরকারের যত প্রচেষ্টাই থাক না কেন? এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীগণ এগিয়ে না এলে বাজার নিয়ন্ত্রণ কখনো সফল হবে না। তাই আশা রাখব, সরকারের সাথে সমন্বয় করে ব্যবসায়ীগণ রমযান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখতে এগিয়ে আসবেন।
লেখক : সংগঠক ও প্রাবন্ধিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ