বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিয়েতে বানান নিয়ে বিশাল কাণ্ড

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : ঘটনাস্থল ভারতের উত্তর প্রদেশ। মৈনপুরী জেলা। পাকাকথা অনুযায়ী কুরায়ালিতে কনে ও বরপক্ষ সমবেত হয়েছেন। বিয়ের অনুষ্ঠান। তাই লোকজন অনেক। মেয়ের বাড়ি এ কুরায়ালিতেই। ছেলেপক্ষ এসেছেন পাশের ফারাক্কাবাদ থেকে।
প্রথানুযায়ী চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতার আগে পাত্র-পাত্রী একান্তে কথাবার্তা হয় মৈনপুরী অঞ্চলে। হয় পরিচয়ও খোলামেলা। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে পারেন বর-কনে পরস্পরকে।
সানাই বাজছে। গান-বাজনার কমতি নেই। বিয়ের হৈ হল্লা সব চলছে। ভুঁড়িভোজের আয়োজনও আছে।
একান্তে পরিচয়ের একপর্যায়ে পাত্র ডায়েরি ও কলম কনেকে এগিয়ে দিয়ে কিছু হিন্দিশব্দের বানান লিখতে দেন। কনে সব ঝটপট লিখে ফেলেন পাত্র যা যা বলেন সব। একদম নির্ভুল ও নিখুঁতভাবে। এরপর পাত্রের পালা। কনে পাত্রকে ওর মাতৃভাষা হিন্দিতে 'সাম্প্রদায়িক' ও 'দৃষ্টিকোণ' শব্দ দুটো লিখতে বলেন। ব্যস! দুটো বানানই লিখতে ভুল করেন পাত্রমহাশয়। নিজের টিকানাও লেখেন ভুল বানানে। পাত্রের এ অপাত্রত্ব দেখে পাত্রী রাগে গড়গড় করে ওঠেন। সবার সামনে বিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। উভয়পক্ষ অনেক বোঝান কনেকে। কিন্তু কনে টলেননি। উঠে পড়েন বিয়ের পিড়ি থেকে। সাজঘরে গিয়ে খুলে ফেলেন বিয়ের পোশাকও। উল্লেখ্য, কনে কেবল ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছেন। আর বর উচ্চমাধ্যমিক অবধি। সাম্প্রতিক খবর ইন্টারনেটের।
অবশ্য বর-কনের নাম উল্লেখ করা হয়নি। করলে কোনও সমস্যাও ছিল না। তবে কনে যে মাতৃভাষা সম্পর্কে সচেতন তা বিস্মিত করবার মতো বটে। অন্যথায় পাত্রের ভুল বানান লিখবার জন্য বিয়ের পিড়ি থেকে উঠে যাওয়া পাত্রীর পক্ষে চাট্টিখানি কথা নয় কিন্তু। কজন মেয়ে করতে পারবেন এমন?
মাতৃভাষার জন্য জীবনবিসর্জনের গৌরবজনক অধ্যায় সৃষ্টি করেছি আমরা। আমাদের এ গৌরবের কথা এখন বিশ্ববাসীর মুখেমুখে প্রায়। কিন্তু আমাদের কজন মাতৃভাষা শুদ্ধ করে লিখতে পারি? বিয়ের পিড়ি থেকে উঠে পড়া এই কনের মতো কজনের টান আছে মাতৃভাষার প্রতি আমাদের মেয়েদের? ক্লাস ফাইভ পড়া মেয়েদের কথা বাদ দিন। বিএ, এমএ, এমবিএ পড়েছেন এমন অনেকেই মাতৃভাষা বাংলা শুদ্ধ করে লিখতে পারেন না। এমনকি পিএইচ.ডি. ডিগ্রিধারী অনেককে আমি চিনি যারা নিজের ডিগ্রিটাও শুদ্ধ করে লিখতে পারেন না।
এমনই একজন পিএইচ.ডি. ডিগ্রিধারী আমাদের পত্রিকায় একসময় খুব লিখতেন। পরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির আসনও অলঙ্কৃত করেন।
এই ডক্টর সাহেব তাঁর লেখা একটি বড়সড় বইয়ের কপি নিয়ে আসলেন আমাদের অফিসে। বইটি দুর্ভাগ্যক্রমে আমার হাতে পড়ে। বইয়ের ইনারপ্যাজে যেখানে লেখকের নামটা বড় করে লেখা থাকে সেখানে চোখ যেতেই ভ্রুকুচকে লেখকের মুখের দিকে থাকালাম। না, লেখকের চেহারায় কোনও ত্রুটি নেই মাশা আল্লাহ। এছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নামকরা বিভাগের প্রধানও। এমন বিদ্বজ্জনের প্রতি চোখ তুলে থাকানো নিশ্চয়ই সহজ নয়। কিন্তু আমি বাধ্য হয়ে তাকালাম। বইয়ে লেখকের নামের পরে ডক্টরাল ডিগ্রিটা লেখা আছে এভাবে: পি.এইচ.ডি. ; অথচ ওটা পিএইচ.ডি. লিখতে হবে। এর অর্থ হলো ডক্টর অব ফিলজফি। তিনি লিখেছেন পি, এইচ এবং ডি এর পর ফুলস্টপ দিয়ে। আজকাল অবশ্য অনেকে পিএইচডি অর্থাৎ ফুলস্টপ ছাড়াই লেখেন। এটা অবশ্য একটা নতুন সিস্টেম চালু হয়েছে।
বাংলা আমাদের গৌরবের ভাষা। অহংবোধের ধন। কিন্তু এ ভাষা শুদ্ধ বা নির্ভুল করে লিখতে বা বলতে আমরা সচেষ্ট নই আদৌ। কথা বলতে অবশ্য সব ভুল ধরা পড়ে না সহজে। তবে দুই এক কলম লিখতে দিলেই সব গোমর ফাঁক হয়ে যায়। ভেতরের সব পুরীষ বেরিয়ে আসে বাইরে। এটা শুধু অল্প শিক্ষিতদের বেলাতেই নয়। বড় বড় ডিগ্রিধারীদের বড় বড় ভুল হয় বাংলা লিখতে গেলেই। একজন ডক্টরাল ডিগ্রিহোল্ডার এবং বোল্ডার শিক্ষাবিদের কথাতো বললামই।
সাধারণ মানুষ কথা বলতে, সামান্য লেখাপড়া জানা লোক কিছু লিখতে ভুল করবেন এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু অসাধারণরা যখন খুব সাধারণ ভুল করেন তখন কথা না বলে পারা যায় না।
অনেকে বলেন, কারুর নামের নাকি ভুল নেই। যে যেভাবে পারেন, নিজের নাম লিখতে পারেন। অর্থাৎ কেউ যদি নিজের নাম লেখেন 'ছাগলছানা' কিংবা 'বরাহতনয়' তাই সই। কোনও ভুল নেই। তবে কেউ যদি বোঝেন যে, তার নামের অর্থ 'শূকরছানা' অযথা 'বারবনিতার সন্তান', তখনও কি ওরকম নাম তিনি ধারণ করতে রাজি হবেন? নিশ্চয়ই না।
আমাদের নাম রাখবার ব্যাপারে দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মা প্রমুখের স্নেহ-বাৎসল্য, ভালোবাসা প্রভৃতি কাজ করে। তাঁরা অনেক সময় অর্থ না বুঝে শিশুর ভুল অথবা অর্থহীন নাম রেখে দেন। এমন ঘটে আমাদের দেশে অপেক্ষাকৃত বেশি। অনেকে আবার মুরুব্বিদের রাখা সুন্দর ও অর্থবহ নাম পাল্টে বা বিকৃত করে রাখতে পছন্দ করেন।
আমাদের একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক পৈতৃক নামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাহমান পাল্টে করেছেন 'রেহমান'। অন্য একজন প্রখ্যাত ব্যক্তির নামেও এরকম বিকৃতি আমরা দেখি। অনেকে এসব নাম এভাবে বিকৃত করবার প্রতিবাদ স্বরূপ রেহমানের স্থলে 'রমণ' জুড়ে দেবার প্রস্তাব করেছেন। শুনতে খারাপ মনে হলেও এর অর্থতো একটা পাওয়া যায়। কিন্তু 'রেহমান' রহমান বা রাহমানের শুধু বিকৃতিই নয়। অর্থহীনও। তবে মরহুম কবি শামসুর রাহমান নিজের নাম চিরদিন সুন্দর ও অবিকৃতভাবে লিখে গেছেন। অনেকে কবির সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করলেও অন্তত নিজের নাম অবিকৃতভাবে লিখবার জন্য তাঁকে সম্মান করেন।
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বানান নিয়ে টালমাটাল অবস্থা। পাঠ্যবইয়ে একরকম। ছাপা পত্রিকায় একরকম। সাইনবোর্ড, নামফলকে অন্যরকম। ঢাকার কল্যাণপুর পাইকপাড়ার একটি রাস্তার নাম 'রাজিব স্মরনি' করবার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন কে বা কারা। অথচ বানানটা হবে 'সরণি'।
মুহাম্মদ ও আহমদ দুটোই অর্থবহ এবং মুসলমানদের মাঝে ব্যাপক ব্যবহৃত। এর অর্থ সবচেয়ে প্রশংসিত ও সবচেয়ে বড় প্রশংসাকারী। এছাড়া দুটো নামই আল্লাহর রসুল (স)-এর নাম। এ নামের বিকৃতকরণ ও ভুল উচ্চারণ অন্যায় এবং পাপকর্ম বলে ঈমানদারদের বিশ্বাস। অথচ এ নাম দুটোই মুসলমানরা বিকৃত ও ভুলভাবে উচ্চারণ করেন। লেখেন মুহমেদ, আহমেদ এমন বানানে। যা শুধু অন্যায়ই নয়। পাপকর্মও। কেউ কেউ শুধু  মু, মোঃ, মোহাঃ এরকম লেখেন। এটাও মারাত্মক ভুল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ সাহেব নিজের নামের শেষাংশ 'আহমদ' লেখেন। কোনও কোনও পত্রপত্রিকা তাঁর নামের শেষাংশ বিকৃত করে 'আহমেদ' ছাপে। এটা যে অপরাধ তা সংশ্লিষ্টরা বুঝতে চান না। আসলে ইংরেজ বেনিয়া প্রভুদের শেখানো বদ অভ্যাস ভুলতে অনেকেরই কষ্ট হয় বৈকি।
আমাদের দেশে অনেকের নাম রাখা হয় চেন্টু, মিন্টু, ঝণ্টু, পিন্টু, ঘণ্টু, পপি, রাক্কা, বাক্কা, ঝুনু, নুনু ইত্যাদি। এগুলো প্রায়ই অর্থহীন অথবা খারাপ অর্থবোধক। ইউরোপ-আমেরিকায় কুকুর বা শূকরছানার নাম রাখা হয় ডগি, পপি ইত্যাদি। আমাদের দেশেও একশ্রেণির তথাকথিত কালচারাল পারসন ছেলেমেয়েদের এমনই বিটঘুটে নাম রাখতে পছন্দ করেন।
আমাদের অনেকে ইংরেজিতে নামের আগে এমডি লেখেন। এটা বাংলা মোঃ এর ইংরেজি রূপ বলতে পারেন। নামের আগে এরকম এমডি রেখে কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যের কোনও কোনও দেশে গিয়ে বিপদে পড়েন বলে জানা যায়। আসলে নামের শুরুতে এমন এমডি লিখবার কোনও দরকারই নেই। আর কেউ চাইলে পুরো 'মুহাম্মদ' লিখতে পারেন। এতে সমস্যা নেই।
আমাদের প্রধানশিক্ষকরা প্রায় সবাই পদটির মধ্যে বিরাট একটা ফাঁক রাখতে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু কেন, তার কারণ অজ্ঞাত। অথচ ইংরেজিতে হেডমাস্টার, হেডটিচার শব্দদ্বয় একসঙ্গে আছে ডিকশনারিতে। আসলে এদুটো বাংলাতেও সমাসসাধিত পদ। যিনি প্রধান তিনি শিক্ষক। প্রধানশিক্ষক। এর কোনও ব্যত্যয় নেই। এব্যাপারে আমি বহুবার বলেছি। কিন্তু একগুঁয়ে প্রধানশিক্ষরা তাঁদের 'ফাঁকপ্রিয়তা' ভুলতেই পারছেন না। জানি না, কেন এ ফাঁকের প্রতি তাদের মোহ। দেশের 'প্রধানমন্ত্রী' পদটি একসঙ্গে অর্থাৎ ফাঁকছাড়া লেখা হয়। এর দিকেও প্রধানশিক্ষকদের ভ্রুক্ষেপ নেই। কিন্তু কেন? তাঁরা একবারও ভেবে দেখবার অবকাশ পান না যে, 'প্রধানমন্ত্রী' যদি একসঙ্গে হয়, তাহলে 'প্রধানশিক্ষক' একসঙ্গে হবে না কেন? আশা করি বিষয়টি ভেবে দেখতে আর কোনও 'ফাঁকফোকর' খুঁজবেন না শ্রদ্ধেয় প্রধানশিক্ষরা।
যা হোক, উত্তর প্রদেশের মৈনপুরীতে ভুল বানান লিখবার অপরাধে গ-দেশে কষে চড় বসিয়ে বরকে প্রত্যাখ্যান করে বিয়ের পিড়ি থেকে উঠে এসে মেয়েটি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তা থেকে আমাদের কি কোনও শিক্ষা নেবার মতো উপকরণ নেই? মনে হয় নিশ্চয় আছে। কনে হয়তো ভেবেছেন, যেবর মাতৃভাষার  প্রতি সযত্ন নন, সামান্য বানান লিখতে বেসামাল হয়ে পড়েন, তিনি সংসারজীবনে স্ত্রী-সন্তান প্রতিপালনে কীভাবে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন? তাই মেয়েটি তাঁর হবু বরকে সুপাত্র মনে করতে পারেননি। আমরা আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই মাতৃভাষার প্রতি সযত্ন এ অসামান্য এবং দুঃসাহসী মেয়েটিকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ