মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পুঁজি পাচারের বিশাল অপকর্মের কি কোন শাস্তি হবে না

অর্থনীতিবিদ রেহমান সুবহানকে আমার বেশ মনে পড়ে। পাকিস্তান আমলে তিনি তৎকালীন ইউনাইটেড ব্যাংকের (বর্তমান জনতা ব্যাংক) গবেষণা বিভাগের স্থপতি ছিলেন। তার স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম কৃতিত্ব ছিল পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের বৈষম্য নিয়ে প্রণীত প্যানেল রিপোর্ট। এই রিপোর্টের একটি অংশজুড়ে ছিল তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পুঁজি পাচারের তথ্য। রিপোর্টে তিনি পূর্ব-পাকিস্তানে অর্জিত অর্থ (স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রায়) পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়ের একটা উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরেছিলেন। তার হিসাব অনুযায়ী একুশ বছরে পুঁজি পাচারের এই পরিমাণ ছিল দেড় থেকে দু’হাজার কোটি টাকা। এই রিপোর্ট সারা প্রদেশের মানুষের মধ্যে বিরাট ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল এবং পরবর্তীকালে এই ক্ষোভ বিক্ষোভ স্বাধীনতা আন্দোলনের ইন্ধন সরবরাহ করেছিল।
সম্প্রতি গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটি নামক একটি প্রতিষ্ঠান পুঁজি পাচারের উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে যা বাংলাদেশের মোট জাতীয় বাজেটের দ্বিগুণ। রিপোর্টে প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী প্রতিবছর গড়ে পাচার হয়েছে ৫৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। জিএফআই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১২৫৭ কোটি ডলার বা ১ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে যা আগের বছরের চেয়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা বেশি। এতে ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোনও পরিসংখ্যান দেয়া হয়নি। তবে অনুমান করা হচ্ছে যে, এই দুই বছরে অন্যূন ২ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতিবেদনে পাচার প্রক্রিয়ার উপরও আলোকপাত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যে চারটি প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে, এগুলো হচ্ছে- বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির মূল্য বেশি দেখানো (Over invoicing), রফতানিতে মূল্য কম দেখানো (under invoicing), হুন্ডি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা প্রভৃতি। প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী ১০ বছরের মধ্যে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। ২০১৪ সালে একটি নির্বাচন হবার কথা ছিল এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে সরকার পরিবর্তন হবে এই আশঙ্কায় অনেক রাজনৈতিক ডাকাত ও সরকারী কর্মকর্তা যারা ২০০৯ সাল থেকে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেছে তারা বিদেশে অর্থ পাচারের সাথে জড়িয়ে পড়েছে বলে অনেকে ধারণা করছেন। এদের মধ্যে আছেন ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গ সংস্থার নেতাকর্মী, ক্ষমতাসীন জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহের নেতাকর্মী এবং সরকারের মদদপুষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং আঁতেল সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা। পাচারকৃত এই অর্থের ডেস্টিনেশন দেশ ছাড়িয়ে বিভিন্ন মহাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভারতসহ পশ্চিম আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ পুঁজি পাচারকারীদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। মালয়েশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের দেশে বিনিয়োগের শর্তে পুঁজি পাচারকারীদের দ্বিতীয় আবাস বা সেকেন্ড হোম প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে তারা বিলাসবহুল বাড়ি-ঘরও কিনছেন।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। সরকারী খাত বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে; তার পক্ষে ব্যবসায় বা শিল্প পরিচালনা সম্ভবপর নয়। বেসরকারি খাতের ব্যবসায়িক পুঁজি যদি বিদেশে পাচার হয় এবং তা সরকারী মদদে, তাহলে দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি নস্যাত হয়ে যায়। বাংলাদেশে এখন এটাই হচ্ছে। এই অবস্থায় অর্থনীতিবিদ এবং দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের উষ্মাবিহীন অবস্থান এবং নিদ্রাজনিত অবস্থা দেশের জন্য নতুন নতুন সংকটের সৃষ্টি করতে পারে। এজন্যেই রেহমান সুবহানদের ন্যায় এককালের সক্রিয় অর্থনীতিবিদদের এই সময়ে সোচ্চার ভূমিকা অত্যন্ত কাম্য ছিল। অর্থনীতির এই সংকটকালে দেবপ্রিয় বাবুরাও নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন বলে মনে হয়। নাকি তারা পছন্দনীয় দল ও নেতাদের অপছন্দনীয় কাজের ছন্দপতন ঘটাতে চান না, এটা বুঝাও মুশকিল বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষও সম্ভবত অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছেন। হয়তো সরকারের অব্যাহত হামলা-মামলা ও অত্যাচার-নির্যাতনে তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছে গেছেন যে, জাতিবিনাশী যে কোন রকম অপকা- এখন আর তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে না। সবকিছুই গা সওয়া হয়ে গেছে। তা না হলে পুঁজি পাচারের এত বড় ঘটনা অন্ততঃ সামান্য হলেও দেশে কিছু উত্তাপ, কিছু প্রতিবাদ বিক্ষোভের সৃষ্টি করতে পারতো। কেন হলো না? পুঁজি পাচারে তারাও কি জড়িত আছেন। এর সাথে কারা কারা জড়িত অন্তত: তাদের একটি তালিকা তৈরির দাবিও কি আমরা করতে পারতাম না? যারা জড়িত তাদেরকে কি আমরা চিনি না? গত দশ বছর কারা ক্ষমতায় ছিল? সরকার কেন এ ব্যাপারে নিশ্চুপ? অর্থ পাচার যারা করেছেন তাদের দলীয় পরিচয় কি? কারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গ্রেফতার বাণিজ্য, সরকারী অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, সম্পত্তি জবরদখল, ঘুষ বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য, হোস্টেলে সীট বাণিজ্য, মেগা প্রকল্পের নামে দেশে ‘হরিলুটে’র পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তাদেরকে কি আমরা চিনি? যদি চিনে থাকি তাহলে তাদের মুখোশ খুলে দিচ্ছি না কেন? দিলে দেশবাসী জানতো ও চিনতো। কানাডার বেগমপাড়ার বাসিন্দা কারা তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগসহ ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মী, এমপি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাদের জোট শরিকদের সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা কে কত টাকা কামাই করেছেন তার তথ্য এলাকাতেই পাওয়া যাবে, ব্যাংক পর্যন্ত যেতে পারলে তো আর কথাই নেই। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের দেশপ্রেম কোথায় গেল? ব্যক্তি অর্থ উপার্জন করে; উপার্জিত অর্থ সে কোথায় ব্যয় করবে এর অধিকার সম্পূর্ণ তার নিজস্ব। তথাপিও রাষ্ট্রের কিছু অধিকার এখানে আছে। তার নাগরিক হিসেবে ব্যক্তিকে নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং তাকে আইন মেনেই নাগরিক অধিকার ভোগ করতে হয়। দেশপ্রেমের দাবি হচ্ছে, বিনিয়োগযোগ্য পুঁজি দেশে বিনিয়োগ করা।
দেশ ও দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে বিদেশে বিনিয়োগ করা অন্যায়। এক্ষেত্রে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনগত বাধ্যবাধকতা যৌক্তিক। এটা হচ্ছে বৈধ পন্থায় উপার্জিত এবং আয়কর বাবদ সরকারের পাওনা পরিশোধকৃত অর্থের বিষয়। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটির রিপোর্টে উল্লিখিত পাচারকৃত অর্থ বৈধভাবে উপার্জিত অর্থ নয়। বিষয়টি পরিষ্কার। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়েও এই অর্থ বিদেশে যায়নি। অর্থাৎ সকল বিচারে এই অর্থ অবৈধভাবে অর্জিত এবং স্থানান্তরিত বা পাচারকৃত। এ প্রেক্ষিত পাচারকে অস্বীকার না করে সরকারের উচিত এর বিরুদ্ধে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কিন্তু সরকার ঐ পথে হাঁটছেন বলে মনে হয় না, হাঁটলে দলীয় লোক ধরা পড়ার ভয় আছে। দেশপ্রেমিক মহলকে এ ব্যাপারে সোচ্চার ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসা উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ