সোমবার ১০ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রভাবশালী আসামীদের বিদেশে পালানো ঠেকাতে ‘সতর্ক’ পুলিশ ॥ দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

* ধর্ষণ মামলার আসামীরা যতই প্রভাবশালী হোক, গ্রেফতার করা হবে : ডিসি-ডিবি

* ঘটনা তদন্তে মানবাধিকার কমিশনের ৫ সদস্যের কমিটি

* সেই তরুণীর ভাষায় ওই রাতের ধর্ষকদের কা-

* উল্টো মানহানী মামলা করার হুমকী দিলেন আপন জুয়েলার্সের মালিক

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর বনানীতে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তরা যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারে সে ব্যাপারে ইমিগ্রেশন পুলিশকে নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি। গতকাল সোমবার বিকেল থেকে ডিএমপির নির্দেশনায় বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইমিগ্রেশন পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন ,দেশের সকল বিমান বন্দর , স্থল বন্দরসহ নৌবন্দরগুলোতে এ নির্দেশনার বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে , ওই ঘটনার সাথে অভিযুক্তরা যাতে কোন ভাবেই দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে । তাদের চিহ্নিত করতে সম্ভাব্য ফটোগ্রাফও জানানো হয়েছে ।

এদিকে , ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি, উত্তর) উপ-কমিশনার (ডিসি) শেখ নাজমুল আলম জানিয়েছেন, মামলার আসামীদের অবস্থান শনাক্ত করা গেছে। আসামীরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাদের গ্রেফতার করা হবে, ছাড় দেয়া হবে না ।

অপরদিকে , জোড়া ধর্ষণের ওই ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তদন্তের অংশ হিসেবে কমিশন ইতোমধ্যে ওই দুই তরুণীর সঙ্গে সেদিনের ঘটনা নিয়ে কথাও বলেছে। তারা ওই ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন । ওই ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও তুমুল আলোড়ন তুলেছে । সবত্রই হৈচৈ পড়েছে । আসামীরা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাদের গ্রেফতারে কালক্ষেপনসহ মামলার তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হতে পারে বলে বিভিন্ন মহল থেকে আশংকা প্রকাশ করা হচ্ছে ।

গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনার ৪০ দিন পর গত ৬ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যায় দুই তরুণী বনানী থানায় মামলা করেন। বনানী থানার পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে।

ইমিগ্রেশন পুলিশের এএসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ধর্ষণের ওই ঘটনায় কোনো আসামী যাতে পালাতে না পারে সেজন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে লিখিত ও মৌখিক নির্দেশনা পেয়েছি। কেউ যাতে পালাতে না পারে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণে জড়িতদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে সতর্ক রয়েছেন বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।আসামীরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের গ্রেপ্তারে বনানী থানা পুলিশের সঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডিবির উপ কমিশনার শেখ নাজমুল আলম। গত শনিবার বনানী থানায় মামলাটি দায়েরের ( নং-৮ ) পর এখনও পাঁচ আসামীর কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

আসামীদের মধ্যে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদ (২৬) রয়েছেন। অন্য আসামীদের মধ্যে নাঈম আশরাফ (৩০) একজন ঠিকাদারের ছেলে, সাদমান সাকিফ (২৪) পিকাসো রেস্তোরাঁর মালিকের ছেলে। বাকি দুই আসামীর একজন সাফাতের দেহরক্ষী ও অন্যজন গাড়িচালক।

মাস খানেক আগের ঘটনাটিতে ধর্ষণের মামলা হওয়ার পর তুমুল আলোচনার মধ্যে ডিবির উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, তারা এই মামলার ‘ছায়াতদন্ত’ করছেন। বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে আসামীদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তদন্তের স্বার্থে আসামীরা কোথায় আছে, তা বলা যাবে না। তবে তাদের শনাক্ত করা হয়েছে।” 

অপরাধীরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তাদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়ে নাজমুল বলেন, “আসামীরা যাতে দেশ ছাড়তে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।”এখন পর্যন্ত কোনো আসামীর দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য পুলিশের কাছে নেই বলে জানান এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

এর আগে যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামী আবুল কালাম আযাদ পুলিশের ‘নজরদারিতে’ থাকার মধ্যেই বিদেশে পালিয়ে যান। আলোচিত মামলায় বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার নজির আরও রয়েছে। এর মধ্যে ইতালীয় নাগরিক চেজারে তাভেল্লা হত্যামামলার আসামী বিএনপি নেতা এম এ কাউয়ুম, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের আসামী কাউন্সিলর নূর হোসেনও রয়েছেন। নূর হোসেনকে পরে ভারত থেকে ফেরত আনা হয়।

বনানীর ‘দি রেইনট্রি’ হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে দুই তরুণীর একজনের দায়ের করা মামলায় বলা হয়। এজাহারে ধর্ষণকারী হিসেবে সাফাত ও নাঈমের নাম উল্লেখ করা হয়। বাকি তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয় সহযোগী হিসেবে।

তদন্তের দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সাফাতকে গ্রেপ্তারে তাদের গুলশান-২ নম্বরের বাসায় বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়েছেন তারা। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সাফাত, নাঈম, সাদমান এবং ঢাকার একজন সংসদ সদস্যের ছেলে বনানী ১১ নম্বর সড়কে একটি রেস্তোরাঁ চালান। এছাড়া তাদের একাধিক সীসা বার রয়েছে।

তবে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে ধর্ষণের ঘটনায় দুই তরুণীর ওপর দায় চাপিয়েছেন অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ।তিনি দাবি করেছেন, তার ছেলের সঙ্গে পূর্বশত্রুতার জের ধরে এমন কাজ করেছেন তার সাবেক স্ত্রী।

দিলদার আহমেদ বলেন, ‘আমার ছেলে (সাফাত) একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপিকাকে বিয়ে করে। তবে আমি সেই বিয়ে মেনে নেইনি। বিয়ের পর সেই মেয়ের নানা ধরনের অসৎ উদ্দেশ্য দেখে আমার ছেলে তাকে তালাক দেয়। সাফাতের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী তাদের দিয়ে এমনটি করিয়েছে। কারণ মামলা করার জন্য ওই মেয়েই দুই তরুণীকে থানায় নিয়ে যায়।’

 সেদিন রাতে রেইন ট্রি হোটেলে সাফাতের ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেই রাতে যদি কিছু হয়ে থাকে সেটা আপসেও হতে পারে। ধর্ষণ হলে নিশ্চই ৪০ দিন মামলা করার অপেক্ষা করত না তারা। পুলিশের রিপোর্ট পেলে দুই তরুণীর বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করা হবে বলেও হুমকি দেন দিলদার আহমেদ।

অন্যদিকে মামলা দায়েরের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ওই দুই তরুণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ধর্ষণের আলমত সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে ধর্ষণের আলামত পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। তিনি জানান, সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষণের আলামত মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। যেহেতু তারা বলছে ধর্ষণের ঘটনাটি প্রায় দেড় মাস আগের, সেজন্য আদৌ কোনো আলামত পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সোহেল মাহমুদ ছাড়া কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন কবির সোহেল, মমতাজ আরা, নিলুফার ইয়াসমিন ও কবিতা সাহা। বোর্ডের অধীনে দুই তরুণীর মাইক্রোবায়োলজি, রেডিওলজি ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানান বোর্ডপ্রধান।

এ বিষয়ে দুই তরুণীর পরিবারের কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি। তবে পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তারা কয়েকদিন ধরে ওই দুই তরুণীকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছিল। তাই তারা মামলা করেছে।

এদিকে মামলার তিনদিন পরও ধর্ষক কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে জানতে বনানী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আব্দুল মতিন বলেন, ‘আসামিদের ধরতে আমাদের অভিযান চলমান। তবে এ পর্যন্ত কাউকে আটক কিংবা গ্রেফতার করা হয়নি।’

ঘটনা তদন্তে মানবাধিকার কমিশনের ৫ সদস্যের কমিটি : দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তদন্তের অংশ হিসেবে কমিশন ইতোমধ্যে ওই দুই তরুণীর সঙ্গে সেদিনের ঘটনা নিয়ে কথাও বলেছে। যৌন নির্যাতনের শিকার তরুণীদের একজন জানিয়েছেন, মানবাধিকার কমিশন তাদের সঙ্গে কথা বলে সেদিনের ঘটনা জানতে চেয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘আমরা তদন্ত শুরু করেছি। ইতোমধ্যে মিডিয়ায় অনেক কিছু প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও আমরা ভিকটিমদের সঙ্গে কথা বলেছি। আজকেই (সোমবার) আমরা পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।’ তিনি বলেন, ‘ এ ঘটনা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তদন্ত শেষে পুরো বিষয়টা নিয়ে আমরা কথা বলব। নজরুল ইসলামকে আহবায়ক করে কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- নুরুন নাহার ওসমানী, এনামুল হক চৌধুরী, শরীফ উদ্দীন ও এম রবিউল ইসলাম।’ কমিশন সূত্রে জানানো হয়, তদন্ত কমিটি প্রয়োজনীয় স্থান পরিদর্শন, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। 

সেই তরুণীর বর্ণনায় ধর্ষণকা- : ঘটনার সময় ওরা মদ্যপ ছিল, ওদের কথায় রাজি না হওয়ায় আমাদের চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। ওদের অনেক অনুরোধ করছিলাম আমাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ছাড়া পাইনি। বনানীর রেইনট্রি রেস্টুরেন্টে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর একজন এভাবেই সেদিনের ‘ভয়াবহ ঘটনা’ নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন।

এ প্রতিবেদকের কাছে সেই ভয়াল রাতের কথা বলেন তিনি। নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী বলেন, ‘কেবল ধর্ষকদের শাস্তি চাই আমরা। নিজেদের পরিবারকে সমাজের কাছে বিব্রত করতে চাইনি বলেই এতদিন আইনের আশ্রয় নেইনি।’

 সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করতে গিয়ে আমাদের এক বন্ধু সাদমান সাকিফের মাধ্যমে ওদের সঙ্গে পরিচয়। ওদের অনেক অনুরোধের পর আরও দুই বন্ধুকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। যেখানে আমাদের সঙ্গে একটা ছেলে বন্ধু রয়েছে সেখানে এমন কিছু হতে পারে আমরা ভাবতেই পারিনি। ওরা আমাদের বলেছিল, রেইনট্রি রেস্টুরেন্টের ছাদে সাদাফের জন্মদিনের অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরে আমাদের ভালো লাগেনি। আমরা চলে আসতে চাই। তখন ওরা আমাদের ছেলে বন্ধুটিকে অনেক মারধর করে, আমাদের রুমে নিয়ে যায়। ওরা সাইকো ছিল।’ তিনি বলেন, ‘অনেক অনুরোধ করি আমাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য, তখন নাঈম আমাদের একজনকে থাপ্পড় মারে, অনেক মারে। আমাদের ফোন আর ঘড়িও ওরা নিয়ে নেয়, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় ছিল না। ঘটনাগুলো এমনভাবে হয়েছে যে কিছুই বুঝতে পারিনি। আমাদের পূর্ব পরিচিত সাদমান সাকিফ ওদের সঙ্গে পরিকল্পনা করেই আমাদেরকে ওখানে নিয়ে যায়, সে একবার রুমে এসে আমাদের অবস্থাও দেখে যায়। কিন্তু আমাদের জন্য কিছু করেনি। পারতো পুলিশকে জানাতে। এমনকি পরে সেসব অস্বীকার করেছে। সাফাত, নাঈম আর আমরা দু’জন একসঙ্গে বসেছিলাম, ওদেরকে কতভাবে অনুরোধ করেছি, কিন্তু ওরা কথা শোনেনি। অনেক ড্রাংক ছিল।’ সাফাতের ড্রাইভার বিল্লাল সব ভিডিও করেছে। তবে সেই রাতে নাঈম সবকিছু করেছে, সেই সবচেয়ে বেশি নোংরামি করেছে। আর নাঈমের দেখাদেখি সাফাতও তাই করেছে। তবে ওদের বিরুদ্ধে কথা না বললে, এমন ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে, ওদের অনেক ক্ষমতা সেই ক্ষমতার কারণেই তারা সবকিছু করে। এমনও শুনেছি, তারা বনানী থানাকে কয়েক লাখ টাকা দিয়েছে, যার কারণে থানা আমাদের থেকে মামলা নিতে চায়নি।তিনি বলেন, ‘আমরা তো অভিযোগ করেছি, এখন তারাই বলুক তারা সেদিন রাতে কী করেছে।’

এতদিন পর কেন ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য গেলেন-জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা ভয়ে ছিলাম। সাহস করে যেতে পারছিলাম না। আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তখন কারও কাছে সহযোগিতা পাইনি। সবাই যদি এক না হয় তাহলে অভিযোগ করতে পারি না। এত ধনী মানুষের বিপক্ষে মামলা করে জেতার মতো পরিবারও আমাদের না। তাই চাইনি আমার পরিবার এতে জড়িয়ে পড়ুক। আমাদের যা হওয়ার হয়েছে। কিন্তু পরিবারকে বিব্রত করতে চাইনি। এ কারণেই এতদিন চুপ করেছিলাম। যখনই অনেকের কাছে শুনতে পেলাম তারা সেদিনের ঘটনার কথা জেনেছে, তখনই আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই তারা ফোন করে হুমকি দিয়েছে, মেসেজ দিয়েছে। ঘটনার কথা আমরা কাউকে বললে তারা আমাদের খুন করে ফেলবে- এমন হুমকিও দিয়েছে। বলেছে, তারা অনেক অপরাধ করেছে যেগুলোর কোনও বিচার হয়নি। যখনই তারা চাইবে তাদের সঙ্গে মিট করতে হবে। তাতে আমরা রাজি হইনি। তারপর থেকেই তাদের অত্যাচার শুরু হয়।’

নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী বলেন, ‘সেদিনের রাতের ভিডিও আমাদের বন্ধুদের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও জানতে পারি। এছাড়া তারা বলতে থাকে, তোমাদের ভিডিও রয়েছে, সেগুলো ভাইরাল করে দিলে পরিবার আর সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। আমি বলেছিলাম, ভিডিও আছে তো কী হয়েছে, সেখানে তোমাদের ছবিও রয়েছে। কিন্তু ওরা বলে, নিজেদের ছবি তারা এমনভাবে এডিট করে দেবে যেন বোঝা না যায়। শুধু আমাদের ছবি-ই থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ভিকটিম অথচ ওরা আমাদেরই অপরাধী বানাচ্ছে। তাই শেষ পর্যন্ত আইনের কাছে গিয়েছি। আমি জানি, ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। আগে ভয়ে চুপ করেছিলাম। তবে আর চুপ করে থাকতে চাই না। সেটা আর সম্ভব না। ওদের মতো জানোয়ারের কাছ থেকে কোনও আমন্ত্রণ পাওয়া যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, সেটা কেবল আমরাই বুঝতে পারছি। এটা অন্য কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব না।’তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমগুলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, বাসার ঠিকানা প্রকাশ করেছে। তারা কি জানে এর ফলে দুটি পরিবারকে কিসের ভেতর দিয়ে যেতে হবে? আমরা কিভাবে বাঁচবো? আমাদের সমাজ ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে মেয়েদের দোষই খোঁজে। আমাদের ক্ষেত্রেও সেটাই করা হচ্ছে। মানছি, আমাদেরও দোষ ছিল, কিন্তু আমি তো ধর্ষণের শিকার হতে চাইনি। একটি মেয়ে ‘না’ বলেছে, মানে ‘না’। কিন্তু সমাজ এটা বুঝছে না।’

গত ২৮ মার্চ পূর্বপরিচিত সাদাত আহমেদ ও নাইম আশরাফ ওই শিক্ষার্থীদের জন্মদিনের দাওয়াত দেয়। ওইদিনই তারা ওই ছাত্রীদের বনানীর কে ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর ‘দ্য রেইনট্রি’ নামের একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে জন্মদিনের অনুষ্ঠান চলার সময় দুই তরুণীকে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়। পরদিন বিষয়টি জানাজানি হলে হত্যার পর লাশ গুম করার ভয় দেখিয়ে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে দুই তরুণী তাদের বাসায় ফিরে আসেন। প্রথমে ভয়ে বিষয়টি কাউকে না জানালেও পরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তারা মামলা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আসামীরা প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হওয়ায় বনানী থানা পুলিশ প্রথমে তাদের মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ