শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দেশে পুরোপুরি একনায়কতন্ত্র এবং ফ্যাসিবাদ চলছে

গতকাল সোমবার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপি ঢাকা মহানগরী উত্তরের কর্মী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে এখন পুরোপুরি একনায়কতন্ত্র এবং ফ্যাসিবাদ চলছে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে এখন গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই। স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বেশি সখ্যতা। যাকে এদেশের মানুষ ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল তাকে (এরশাদ) এখন বিশেষ দূত বানিয়েছেন সরকারপ্রধান। এবং এরশাদের দলের তিনজনকে মন্ত্রীও বানানো হয়েছে। মামলা মোকাদ্দমা এই সরকারের হাতিয়ার- এমন মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে বলেই এখন রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে পারছেন না। পুলিশ দিয়ে আর বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের মামলা মোকাদ্দমা দিয়ে রাজনীতিকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এদের (আওয়ামী লীগ) প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশে আর নেই। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর ইন্সটিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে ঢাকা মহানগর বিএনপির (উত্তর) উদ্যোগে আয়োজিত কর্মীসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

আয়োজক সংগঠনের সহ-সভাপতি বজলুল বাসিত আঞ্জু’র সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসানের সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, মহানগর (উত্তর) সহ সভাপতি সাহাবুদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসান, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলী, যুবদল (উত্তর) সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর, ঢাকা মহানগর ছাত্রদল (উত্তর) সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন রুবেল প্রমুখ।

বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর এবং মালেশিয়ার মতো বানাতে চান বলে প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেয়া বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, সিঙ্গাপুরে গণতন্ত্র নেই। মানুষ সেখানে তাদের নিজেদের কথা বলতে পারে না। মালয়েশিয়াতে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। সিঙ্গাপুরের মানুষ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেনি। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। এদেশের মানুষ কোনও দিনই সিঙ্গাপুর আর মালয়েশিয়ার মতো গণতন্ত্র গ্রহণ করবে না। বরং এখানে সত্যিকার অর্থে জনগণের অধিকার নিয়ে গণতন্ত্র চলতে হবে।

প্রধান বিচারপতি অনেকগুলো জরুরি এবং সত্য কথা বলেছেন দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যে কথাগুলো আমরা বারবার বলে আসছি- এদেশে বিচারব্যবস্থা স্বাধীন নয়। এর ওপরে প্রশাসন চাপ দিয়ে বসে আছে, সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা এর ভুক্তভোগী। বিচার বিভাগকে সরকারের ইচ্ছানুযায়ী চলতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিগত ৬ বছর ধরে প্রধান বিচারপতি বিচারপতিদের বিধিমালা চাচ্ছেন, এখনও তা দেওয়া হয়নি। আজও সময় নিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

তিনি বলেন, পার্লামেন্ট নেই বললেই চলে। যেটা আছে সেটা হচ্ছে সরকারের একটি গৃহপালিত বিরোধীদল দিয়ে পার্লামেন্ট। যেখানে সরকারের বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরে আলোচনা-সমালোচনা হওয়ার কথা, সেখানে তা হয় না। তাই এই পার্লামেন্ট কোনও পার্লামেন্ট নয়, অর্থাৎ গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই বর্তমান পার্লামেন্টে। বিএনপির মহাসচিব বলেন, এই দেশে এখন পুরোপুরি একনায়কতন্ত্র এবং ফ্যাসিবাদ চলছে। এবং সেজন্য স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বেশি সখ্যতা। যাকে এদেশের মানুষ ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল তাকে (এরশাদ) এখন বিশেষ দূত বানিয়েছেন সরকারপ্রধান। এবং এরশাদের দলের তিনজনকে মন্ত্রীও বানানো হয়েছে। মামলা মোকাদ্দমা এই সরকারের হাতিয়ার- এমন মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে বলেই এখন রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে পারছেন না। পুলিশ দিয়ে আর বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের মামলা মোকাদ্দমা দিয়ে রাজনীতিকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এদের (আওয়ামী লীগ) প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশে আর নেই।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ পুরোপরি গণতন্ত্র বিহীন। কোথাও কারও কোনও অধিকার নেই। দেশবাসীর বাকস্বাধীনতা ও ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। সেজন্য আজ বিএনপির দায়িত্ব হচ্ছে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের দেওয়া গণতন্ত্রকে আবারও পুনরুদ্ধার করা। জনগণকে অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

নির্বাচন প্রসঙ্গে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, আমরা (বিএনপি) নির্বাচন চাই। অবশ্যই নির্বাচন চাই, কারণ বিএনপি বারবার নির্বাচিত হয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। সেজন্য আমরা জনগণের ভোটের মধ্যে দিয়ে সরকারে যেতে চাই। কিন্তু কোন নির্বাচন? যে নির্বাচনে আপনারা (আওয়ামী লীগ সরকার) একাই খেলবেন, একাই রেফারি হয়ে মাঠ দখল করে রাখবেন, সেই নির্বাচন তো হবে না। সেই নির্বাচনে তো বিএনপি যাবে না। নির্বাচন এমন হবে- যে নির্বাচনে খালেদা জিয়াসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলসমূহ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে। অন্যথায় এদেশে মানুষ অন্য কোনও নির্বাচন মেনে নেবে না।

বিএনপি এবং গোটা বাংলাদেশ কঠিন সময় অতিক্রম করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এত খারাপ সময় বাংলাদেশে আর আসেনি। এত খারাপ সরকার ইতোপূর্বে এদেশের মানুষ দেখেনি। এরা খুন, গুম, হত্যা করতে দ্বিধা করে না। এরা মায়ের সামনে সন্তান এবং সন্তানের সামনে পিতাকে হত্যা করতে এতটুকু দ্বিধা করছে না।

জঙ্গিবাদ প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, যাদেরকে জঙ্গি অপবাদ দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে তাদের একজনকেও জীবিত অবস্থায় আনা হচ্ছে না, তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। আগেই তাদের হত্যা করা হচ্ছে। হত্যার রাজনীতি শুরু করেছে সরকার। এই হত্যার রাজনীতির শেষ কোথায়, এ রাজনীতি দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে বা যাচ্ছে তা আমরা জানি না। আমরা আগেই বলেছিলাম (জঙ্গি) আগুন নিয়ে খেলবেন না, এই আগুনে সমগ্র দেশ ও জাতি পুড়ে যাবে।’

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, এই সরকার দেশকে ধ্বংস করে ফেলেছে। অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ রসাতলে নিয়ে গেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা একেবারে শেষ হয়ে গেছে। এখন আবার আইন করছে এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, খসড়া অনুমোদন হয়েছে যে, এখন ব্যাংকের পরিচালকরা যাদের তিন মেয়াদ হয়েছে তারা চার মেয়াদে থাকতে পারবেন এবং শুধু তাই নয় এই আইন পাস হলে একই পরিবারের চারজন একই সঙ্গে পরিচালক হতে পারবেন। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো দখল করে নিতে চাচ্ছে সরকার। পরিবারের লোকজন এখন দেশের ব্যাংকগুলো পরিচালনায় থাকবেন। অর্থনীতিকে লুট করে ছেড়ে দেবেন।

হাওরাঞ্চলের দুর্গত চিত্র তুলে ধরে সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, ‘যখন হাওরের মানুষ না খেয়ে আছে তখন আপনারা (সরকার) ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বিভিন্ন মন্ত্রী-সচিবরা বিদেশে ঘুরতে যাচ্ছেন। সেখানে বলছেন- এত উন্নয়ন নাকি দেশে আর হয়নি।

দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে মির্জা ফখরুল বলেন,‘ঢাকা মহানগরকে দু’ভাগ করা হয়েছে। কারণ একক কমিটি দিয়ে সংগঠনের কার্যসম্পাদন মুশকিল হয়ে যায়। আশা করি নতুন এই ঢাকা মহানগর কমিটি নবীন এবং প্রবীণের সমন্বয়ে একটি কার্যকর দলে পরিণত হবে। ঢাকা মহানগর বিএনপির দিকে গোটা বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে। যারা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন। কারণ এই দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব এখন বিএনপির ওপর পড়েছে। ১৬ কোটি মানুষকে মুক্তি দিতে তাই আসুন আমরা সবাই ছোটখাটো বিভেদগুলো ভুলে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ঐক্যের আহ্বানে শরিক হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাই। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে পাড়ায় পাড়ায় যেতে হবে। এবং দলের সর্বস্তরের বন্দি নেতাকর্মীদের মুক্ত করতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার শপথ গ্রহণ করতে হবে।

এদিকে গতকাল এক বিৃবতিতে সিলেট জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলমকে ১ নং আসামী করে জেলা যুবদল নেতা ইমরান, ছাত্রদল নেতা জায়েদ, নামর আলী ও খোকনসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের এবং দক্ষিণ সুরমা থানা যুবদল সদস্য আব্দুল কাদির জুবেল ও এমদাদুল হক রবিনকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি অবিলম্বে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে তাদের নি:শর্ত মুক্তির জোর দাবি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ