মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রোজা কী, কেন, কীভাবে?

মূল: মাওলানা মুজাম্মিল সিদ্দিকী 

অনুবাদ: মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

[লেখক একজন ইমাম এবং ইসলামিক সোসাইটি অব অরেঞ্জ কান্ট্রি, কেলিফোর্নিয়া, ইউএস’এর একজন ডিরেক্টর। এছাড়া তিনি ইসলামিক সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট।]

রোজা কী?

আল কোরআনের পরিভাষায় রোজাকে বলা হয়‘ সাওম’। আরবি ‘সাওম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘বিরত থাকা’। এ প্রসঙ্গে সূরা মরিয়মে উল্লেখিত হযরত ঈসা (আ.)’র মা  হযরত মরিয়মের একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা যায়: ‘আমি পরম করুণাময়ের জন্য রোজার মানত করেছি। এ কারণে আজ আমি কারও সাথে কথা বলব না।’ -সূরা মরিয়ম: আয়াত ২৬। এখানে মা মরিয়মের বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, যেহেতু তিনি রোজা রেখেছেন, সেহেতু তিনি কারো সাথেই কথা বলা থেকে বিরত থাকবেন। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ‘সাওম’ বলতে বুঝায়, ‘আল্লাহ’র সন্তুষ্টির আশায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার খাদ্য-পানীয় এবং যৌনতা থেকে বিরত থাকা।

রোজা কেন রাখব?

১.রোজার উদ্দেশ্য

পবিত্র কোরআন মজিদে রোজা বা সাওম সাধনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরাজ করা হল যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়ার গুণাবলী অর্জন করতে পারো।’ -(সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৩)।

তাক্বওয়া আল কোরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক পরিভাষা। এটি ইসলামী আধ্যাত্মবাদ এবং নৈতিকতার মূলকথা। এটি ঈমানদার বা বিশ্বাসীদের জীবনের একটি একটি গুণাবলী যার বলে তারা তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চিন্তা এবং কর্মে আল্লাহ’র অস্তিত্বকে অনুভব করে, তাঁকে স্মরণ করে, তাঁকে হাজির-নাজির জেনে এবং ভয় করে নিজেদের জীবন পরিচালনা করেন। যার মধ্যে তাক্বওয়ার গুণাবলী রয়েছে, তিনি সর্বাবস্থায় আল্লাহ’র জন্য নেক আমল করতে এবং গুনাহ বা নাফরমানি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে ভালোবাসেন। তাক্বওয়া হল এমন এক নৈতিক বোধ, যার ফলে ঈমানদারগণ নেক আমল করতে এবং আল্লাহ’কে ভয় করে চলতে ব্রতী হয়। তাক্বওয়া মানুষের মধ্যে ধৈর্য্য এবং দৃঢ়তা তৈরি করে। এটি মানুষের মধ্যে সহনশীলতা তৈরি করে এবং ধৈর্য্য ও সহনশীলতা মানুষকে উচ্চ নৈতিকতার স্তওে উন্নীত হতে সাহায্য করে।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, রোজা ঢাল স্বরূপ, যা মানুষকে গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে। শিস্যরা যখন জেসাসকে অনৈতিকতাবোধ থেকে বেঁচে থাকার উপায় জানতে চাইলেন, তখন তিনি তাদেরকে বললেন, প্রার্থনা এবং উপবাস ছাড়া তা সম্ভব নয়। -(ম্যাথিউ ১৭:২১)।

ইমাম গাজ্জালী (র.)’র মতে, রোজা মানুষের মধ্যে সামাদীয়াহ’র মত নৈতিক গুণ তৈরি করে, যা তাকে আকাক্সক্ষা থেকে মুক্তি দেয়। ইমাম ইবনে আল কাইয়ুম (র.) রোজাকে দেখেছেন আকাক্সক্ষার নিয়ন্ত্রক হিসেবে, যা ইন্দ্রিয়পরায়ণতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (র.) মনে করেন, রোজা মানুষের ভিতরকার কুপ্রবৃত্তি বা পশুশক্তিকে দুর্বল করে এবং সুপ্রবৃত্তি বা বিবেকবোধকে শক্তিশালী করে। মাওলানা মওদূদী (র.) পবিত্র রমজান মাসকে দেখেছেন ব্যক্তিগতভাবে একজন মুসলমানের জন্য এবং সমগ্রভাবে পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ধৈর্য্য এবং আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে।

রোজা রাখা ফরজ 

হিযরতের দ্বিতীয় বৎসরে রোজা ফরজ হয়। পবিত্র কুরআন মজিদের সূরা বাকারায় প্রতি বছর রমজান মাসে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রোজা রাখা ফরজ বা বাধ্যতামূলকের বিধান দিয়ে মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন বলেন: 

হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরাজ করা হল যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়ার গুণাবলী অর্জন করতে পারো।’ -(সূরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৩)। একই সূরার ১৮৫ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আরো বলেন: ‘রমজান সেই মাস, যে মাসে পবিত্র কোরআন নাযিল করা হয়েছে, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য জীবন-যাপনের বিধান এবং সুস্পষ্ট উপদেশাবলীতে পরিপূর্ণ যা সঠিক ও সত্যপথ প্রদর্শন করে এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে।’

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কয়েকটি বিবৃতির মাধ্যমে এ বিষয়টি আরো ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যা হাদীসের গ্রন্থগুলোতে বিধৃত করা হয়েছে।

ইমাম আল বুখারী (র.) এবং ইমাম আল মুসলিম উভয়ই তাঁদের গ্রন্থে ইবনে উমর (রা.)’র বরাত দিয়ে বলেছেন, রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর স্থাপিত: ১. আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল - এ কথার সাক্ষ দেয়া, ২. নামাজ, ৩. যাকাত, ৪. হারাম শরীফে হজ্জ আদায় এবং রমজান মাসে রোজা রাখা।

সমগ্র মুসলিম উম্মাহ এ বিষয়ে একমত যে, পবিত্র রমজান মাসে প্রত্যেক সক্ষম মুসলিম নর-নারীর উপর রোজা রাখা ফরজ।- বাতিঘর 24

চলবে-

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ