রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিরামপুরে বোরো ধান ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত ॥ ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বিরামপুর : কৃষক সংক্রামিত জমির ধান কাটছে। ছবিটি পলাশবাড়ি মাঠ থেকে তোলা -সংগ্রাম

বিরামপুর(দিনাজপুর) সংবাদদাতা: পাকা ধানে গোলা ভরা স্বপ্নে কৃষক যখন বিভোর ঠিক তখনই সারা দেশের ন্যায় বিরামপুর উপজেলায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ব্লাস্ট রোগের সংক্রমন। ছত্রাক জাতীয় এ রোগের আক্রমনে ধানের শীষ সাদা ও পাতা ধসুর বর্ণ ধারণ করছে। এ রোগে চিটায় পরিণত হচ্ছে ধান। শেষ সময়ে ধানে ব্লাস্ট রোগ সংক্রমন দেখা দেওয়ায় দিশেহারা কৃষক। যখন শীষে সংক্রমন হয় তখন ছত্রাক নাশক দিয়ে কোন উপকার হচ্ছে না।
শষ্য ভান্ডার দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় বোরো উৎপাদনে ফলন বিপর্ষয়ের আশঙ্কা করছেন কৃষককুল। চারা রোপনের পর বিদ্যুৎ, ডিজেল, সার ও কীটনাশক  সরবরাহ ভালো থাকায় এবং ফসলের বাহারী অবস্থা দেখে কৃষকদের মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠেছিল। সম্প্রতি ধানের শীষ বের হওয়ার আগ মুহূর্তে শিলা বৃষ্টিতে ধানের থোড় চরম ক্ষতি সাধন হয়। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠার চিন্তভাবনার মধ্যে আবার হঠাৎ নেক ব্লাষ্ট নামক ছত্রাক আক্রান্তে ধান গাছের ক্ষতি সাধনে কৃষকদের মাঝে হা হা কার অবস্থা বিরাজ করছে। ফলে  কাঙ্খিত ফলন অর্জন না হওয়ার আশঙ্কায় কৃষকেরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কারণ, এ অঞ্চলের কৃষকদের সারা বছরের হিসোব নিকাশ মিলাতে হয় বোরো ধান ঘরে উঠার পর। কৃষকদের বৌ-বেটীদের কাপড়- চোপড় ক্রয়, ছেলে- মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, বিয়ে শাদী এবং সারা বছরের খাপ- খোরাক সহ আসন্ন আমন ধান আবাদের খরচও মিলাতে হয় বোরো আবাদের উপর। রোগাক্রান্ত জমির ধানের উৎপাদনের বিপর্ষয়ের আশঙ্খার কৃষকেরা দুঃখ চিন্তায় নিঝুম রাত কাটাছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে গিয়ে দূর থেকে দেখে মনে হয় ক্ষেতের সব ধান পাকা কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যায় সব ধান চিঠা। গাছগুলো তাজা কিন্তু ধানের শীষের গোড়ায় পচন ধরে ধান চিঠা হয়ে গেছে। এক জায়গায় এ রোগ দেখা দিলে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জমিতে। কৃষক সামছুল জানান, সে ৪ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছে। তার মধ্যে ৩ বিঘা জমিতে নেক ব্লাষ্ট রোগে আক্রান্তে ধানে চিঠা ধরেছে তাতে ৫ মন ধানও অর্জন করা সম্ভব হবে না। পৌর শহরের সফল চাষি আসাদুজ্জামান জানান, এ অঞ্চলে মিনিকেট ধান কোন এলাকায় ৭০ ভাগ আবার কোন কোন এলাকায় ৪০ ভাগ ২৫ ভাগ আবাদ হয়েছে। আর মিনিকেট ধানেই নেক ব্লাষ্ট রোগ মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। সকালে যে জমির শীষ ভালো বিকালে সে জমির ধানের শীষ সাদা। এছাড়া বি,আর-২৮ জাতের ধানে এ রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। আর মাত্র কয়েকদিন পরেই বি,আর,২৮ ধান কাটা মাড়াই শুরু হবে। পাকা ধানে এ রোগে আক্রান্তে ধান চিটা হওয়ায় কৃষক হতাশাগ্রস্ত। রুপরামপুরের মনিরুজ্জামান জানান, সে ১২ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছে। তার ৩ বিঘা জমিতে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে শীষ সাদা হয়ে ধান চিঠাই পরিণত হওয়ায় ১৫ মন ধান অর্জন করা সম্ভব হবে না। যেখানে গত বছর ৩ বিঘাতে ৬০ মন ধান অর্জন করেছিল। একই কথা জানিয়েছেন বিভিন্ন গ্রামের আরো কয়েকজন কৃষক। ক্ষেতের পর ক্ষেত সাদা হয়ে গেছে। বর্গা চাষিদের  মাথায় হাত পড়েছে। ধার দেনা করে বোরো আবাদ করে  মহাজনদের দিয়ে তাদের ঘরে আর ধান উঠবে না। ধার-দেনা শোধ করবে কি করে ।
বিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিক্সন চন্দ্র পাল জানান, চলতি বোরো মওসুমে উপজেলায়  ১২ হাজার ৬শত ৭৬ হেক্টোর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অর্জিত হয়েছে ১৬ হাজার ৪ শত হেক্টোর। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৭ হাজার ৮ শত ৪০ মেঃ টন। কৃষকের নেক ব্লাষ্ট রোগে সংক্রামিত জমি থেকে ধানের ফলন কম হলেও প্রভাব পড়বে না আমাদের ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় কারণ, আবাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অজিত হয়েছে ৩ হাজার ৭ শত ২৪ হেক্টোর জমি। 
এদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে কৃষকের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিক্সন চন্দ্র পাল জানান, আমরা বন্ধের দিনেও বিভিন্ন জায়গায় কৃষক কৃষাণীদের সঙ্গে দলীয় আলোচনা উঠান বৈঠক করছি। তিনি আরও জানান, নেক ব্লাষ্ট রোগ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, দিনের বেলা গরম, রাতে বৈরী আবহাওয়ায় দ্রুত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে সঠিক সময়ে যদি সঠিক বালাই নাশক  স্প্রে করা যায় তবে এ রোগ অনেকাটাই নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। আমাদের কৃষি বিভাগের সকল উপসহকারীগণ কৃষকের পাশে থেকে লিফলেট, প্রেসক্রিপশনসহ সব রকমের পরামর্শ দিচ্ছে। যাতে নতুন করে কোন ধান ক্ষেত আর এ রোগে আক্রান্ত না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ