মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দীর্ঘদিন থেকেই পরিবহন সেক্টরে অরাজকতা চলছে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : দীর্ঘদিন থেকেই দেশের পরিবহন সেক্টরে অরাজকতা চলছে। সরকারি দলের এক মন্ত্রীর প্রত্যক্ষ ইন্ধনেই এমনটি হচ্ছে। যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়ার ক্ষেত্রেও চলছে নানা অজুহাত। একবার সিটিং বন্ধ হয়। আবার তা স্থগিত করা হয়। সর্বশেষ বুধবার আবারো এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তিনমাসের সময় নেয়া হয়েছে। এজন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে সরকারের এমন ধোঁয়াশা অবস্থানের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকটি যানবাহনে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অথবা জোর করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে পরিবহনের লোকজন। সর্বনি¤œ ভাড়া মিনিবাসের ৫.০০ ও বড়বাসের ৭.০০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও তা অনেক রুটেই মানা হয় না। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আদায় করা হয় অনেক বাস ও মিনিবাসে। কোনও কোনও বাসে ৫.০০ থেকে ৭.০০ টাকার নির্ধারিত ভাড়ার স্থলে যাত্রীদের কাছ থেকে জোর করে ২০.০০ থেকে ৩০.০০ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। বলা হয় ‘সিটিং সার্ভিস’, ‘নন স্টপ সার্ভিস’ ইত্যাদি। রসিক যাত্রীরা ‘সিটিং সার্ভিস’কে বলেন ‘চিটিং সার্ভিস’। পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আচরণ ও কর্মকান্ড দেখে রসিক অথচ অসহায় যাত্রীরা ‘উপযুক্ত’ নামই দিয়েছেন বলে মনে হয় অনেকের কাছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেক কমে গেছে। অর্থাৎ তিনভাগের একভাগে নেমে এসেছে। তার মানে যে তেলের দাম ছিল ৯০.০০ টাকা তার দাম এখন মাত্র ৩০.০০ টাকা। কোথাও কোথাও আরও কম। কিন্তু আমাদের দেশে একবার কোনও কিছুর দাম বাড়লে তা আর কখনও কমে না।
বাসভাড়া ও জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। সরকার দফায় দফায় তেলের দাম বাড়িয়ে আর কমায়নি। এবার কয়েকদিন আগে অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা করে কমালেও ডিজেল ও কেরোসিনের দাম কমানো হয়েছে মাত্র ৩.০০ টাকা। অর্থাৎ বড় লোকদের ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহৃত জ্বালানির দাম কমেছে বেশি। আর গণপরিবহন তথা গরিব লোকের যানবাহনের তেলের দাম কমেছে নামমাত্র।
এটাকে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর নামে প্রহসন ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? এক রিপোর্টে জানা গেছে, দূরপাল্লার যানবাহনে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া কমবে মাত্র ৩ পয়সা। ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো মহানগরীতে চলাচলকারী যানবাহনের ভাড়া কমবে না এক পয়সাও বলে জানা গেছে। কী অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। অবশ্য কয়েক বছর আগে হঠাৎ করে পরিবহন মালিকদের খুশি করতে গিয়ে মিনিবাস ও বড় বাসের ভাড়া ২.০০/৩.০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫.০০ থেকে ৭.০০ টাকা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে একজন মন্ত্রী নিজে পরিবহন মালিক বলে এমনটি করা হয়েছে। যাত্রীসাধারণের অসুবিধার কথা ভাবা হয়নি। প্রতি কিলোমিটারে যানবাহনের ভাড়া ৩ পয়সা হিসাবে কমানো হলেও ঢাকা-বান্দরবানের ভাড়া কমবে ১৪.০০ টাকা। ঢাকা-রাজশাহী রুটে কমবে ৭.০০ টাকা। ঢাকা-দিনাজপুর-পঞ্চগড়রুটে ৬.০০ থেকে ৭.০০ টাকা। কিন্তু এভাড়া কমানোর বিষয়টি কবে নাগাদ কার্যকর হবে তা নিশ্চিত করা হয়নি। সাধারণ মানুষকে শোষণের পক্ষে ক্ষমতাধররা সবাই। কখনও কখনও নির্বাচনের আগে-ভাগে সাধারণ মানুষের স্বার্থের পক্ষে কথা বলা হলেও নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেলে তা আর কারুর মনে থাকে না। আর এখন তো নির্বাচনের দরকারই নেই। বিনাভোটে অর্ধেকেরও বেশি এমপি আর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে যান। এই নেতারা জনগণের স্বার্থের কথা ভাববেন কোন দুঃখে? আসলে জনগণের আশা-আকক্সক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতায় হয়তো কিছুদিন থাকা যেতে পারে। কিন্তু তা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। কোন কালবৈশাখী এসে হঠাৎ করে সবকিছু তছনছ করে ফেলে তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। গণতন্ত্রের পোশাকে স্বৈরাচার যতই শক্তি দেখাক, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। হতে পারে না।
সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ভাড়ার ব্যাপারে নজরদারির কথা বলা হলেও মূলত সেটি আইওয়াশ ছাড়া অরা আর কিছুই নয়। গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নামে যাত্রী হয়রানি থেকে নিস্তার নেই কারোরই। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেছে বাড়িয়ে দেয়া হয় পরিবহন ভাড়া। কিন্তু দাম কমলে ভাড়া কমাতে চলে গড়িমসি। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ৬৮ টাকা থেকে কমিয়ে ৬৫ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। কিন্তু ভাড়া কমেনি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সর্বশেষ ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দূরপাল্লার রুটে ভাড়া বাড়ানো হয়। সেই সময় কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ১ টাকা ৪৫ পয়সা। কিলোমিটারে ৩ পয়সা কমানোর হিসাবে ভাড়া ধরলে ঢাকা-চট্টগ্রামে মাত্র ৭ টাকা কমে। ঢাকা-সিলেট রুটে ৭ টাকা, ঢাকা-রাজশাহী রুটে ৬ টাকা, ঢাকা-রংপুর রুটে ১২ টাকা।
ঢাকা-কক্সবাজার ও ঢাকা-বান্দরবান রুটে সর্বোচ্চ ১৪ টাকা ভাড়া কমবে। ঢাকা-ঠাকুরগাঁও রুটে ভাড়া কমবে ১৩ টাকা। বিআরটিএর তথ্যমতে, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে দুই দফায় ডিজেলের দাম ১১ টাকা কমানো হয়। সেই সময় পরিবহনের ভাড়া ১১ পয়সা কমানো হয়। এরপর থেকেই জ্বালানির মূল্য ১ টাকা হ্রাস পেলে প্রতিকিলোমিটারে যাত্রী ভাড়া ১ পয়সা কমানোর প্রক্রিয়া চালু হয়। যদিও তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে তা মানা হয় না। সেক্ষেত্রে পরিচালনার ব্যয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাড়া বাড়ে। এতে ২০১১ ও ২০১৩ সালে দুই দফায় ডিজেলের মূল্য ১৫ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় দূরপাল্লার ভাড়া বৃদ্ধি করে ২৫ পয়সা।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ডিজেলের দাম কমার পর ভাড়ার হার কমানো হলেও কৌশলে বাস-মিনিবাসের ভাড়ার সঙ্গে ফেরি পারাপার ও টোলের হার যোগ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০১১ সালের মে মাসে ডিজেলের দাম ৪৪ টাকা থেকে লিটারে ২ টাকা বাড়িয়ে ৪৬ টাকা করা হয়। ওই বছরের ১৮ মে বাস ভাড়া কিলোমিটারে একলাফে ৯৪ পয়সা থেকে ১ টাকা ১৫ পয়সা করা হয়। মিনিবাসে ভাড়ার হার ৯৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ১ টাকা ১৫ পয়সা। একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর ডিজেলের দাম লিটারে ৪৬ টাকা থেকে ৫১ টাকা করা হয়। একই দিনে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া ১ টাকা ১৫ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা করা হয়। ডিজেলের দর আবার লিটারে ১০ টাকা বাড়িয়ে ৬১ টাকা করা হলে ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি বাস-মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১৫ পয়সা বাড়ানো হয়। সেই সময় ভাড়ার হার ছিল ১ টাকা ৩৫ পয়সা।
এদিকে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বাস থাকবে কিনা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ৮ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগামী ৩ মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের পর সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গত ৩ মে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিআরটিএ’র পরিচালক শেখ মাহবুব-ই-রব্বানী। তিনি বলেন, রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বাস চলাচলের অনুমোদন নেই। কিন্তু নগরে এখন প্রায় সব বাসই সিটিং সার্ভিস। আমরা তা বন্ধে অভিযানে নামার পর বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মালিক-শ্রমিক বাস বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ১৫ দিন পর সিটিং সার্ভিসের বাস চলাচল নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা ছিল। বিআরটিএ’র এই কর্মকর্তা বলেন, কিন্তু বাস মালিক-শ্রমিক এবং বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছি।  মাহবুব ই রব্বানী ওই কমিটির প্রধান তিনি নিজে এই তথ্য জানিয়ে বলেন, রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বাস থাকবে কিনা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। আগামী ৩ মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত বিষয়ে কমিটি প্রতিবেদন জমা দিবে।  প্রসঙ্গত, এর আগে গত ১৫ এপ্রিলের পর থেকে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের বাস চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে বিআরটিএ। এরপর ১৬ এপ্রিল থেকে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হলেও বাস-মালিক শ্রমিকরা সড়কে বাস চলাচল কমিয়ে দেয়।
এতে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।  এই প্রেক্ষাপটে ওই দিন তেঁজগাওয়ে পরিবহনে অনিয়ম ঠেকাতে বিআরটিএ অভিযান পরিচলনা করে। ওই অভিযান পরিদর্শনে এসে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, পরিবহন খাতে শৃংখলা ফিরিয়ে আনা হবে, যাত্রী হয়রানি বন্ধ করা হবে।  কিন্তু তৃতীয় দিনের মাথায়ও সড়কে যখন গাড়ি স্বল্পতা দেখা দেয়- তখন মন্ত্রী বলেন, বাস মালিকরা প্রভাবশালী-তারা অনেক ক্ষমতাবান। এরপর পরদিন ১৯ এপ্রিল রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বাস চলাচল বিষয়ে ১৫ দিন পর বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জানানোর কথা বলা হয়। বিআরটিএ’র এ ঘোষণায় অনানুষ্ঠানিকভাবে ফের রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের বাস চলাচল শুরু হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ