শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নওমুসলিমদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : নওমুসলিম কী, কে বা কারা? বিষয়টি অনেকেই বোঝেন না। ‘নও’ শব্দের বাংলা হচ্ছে নতুন। ‘মুসলিম’-এর অর্থ মুসলমান। এর অর্থ অবশ্য সবাই বোঝেন। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বোঝাবার দরকার নেই। সমস্যা হয় মুসলিমের আগে ‘নও’ বিশেষণ নিয়ে। অনেকেই প্রশ্ন করেন ‘নওমুসলিম’ আবার কীরকম। মুসলিমই যদি হবে তবে নও বা নতুন কেন? হ্যাঁ, প্রশ্নতো বটেই। আমি নিজেও জীবনে অসংখ্যবার এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। এখনও অনেকে প্রশ্ন করেন আমাকে। তবে আমি বিরক্ত হই না। প্রায়শ হাসিমুখেই এমন প্রশ্নের জবাব দেই। তবে সবাই জানবার আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করেন এমন নয়। কেউ কেউ উদ্দেশ্যমূলক বা বাঁকা চোখেও প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে মারেন।

নওমুসলিম কী বা কাকে বলে? সে কথাই আগে বলি। যারা মহান ইসলামের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যসমূহে আকৃষ্ট হয়ে বাপ-দাদার বংশানুক্রমিক বিশ্বাসবোধ বা ধর্ম পরিত্যাগ করে পবিত্র কালেমা পড়ে নিজেদের বদলে ফেলেন তারাই নওমুসলিম। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে অর্থাৎ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর যুগে এমন ঘটনা ঘটতো। যারা পিতৃপুরুষের আদর্শ ছেড়ে নবী মুহাম্মদ (স)-এর প্রচারিত দীন বা জীবনাদর্শে বিশ্বাস স্থাপন করতেন, তাদের নওমুসলিম বলা হতো। রসুলুল্লাহ (স) নওমুসলিমদের খুব সমাদর করতেন। যারা ইসলাম কবুল করতেন তারা মনেপ্রাণে মুসলিম হয়ে যেতেন। দীনের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। তবে ব্যতিক্রম যে একদমই ছিল না, তা নয়। কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুসলিম সেজে গোয়েন্দাগিরি করতেন। মুসলমানদের মধ্যে থেকে গোপন তথ্য কাফেরদের কাছে পাচার করে দিয়ে রসুলুল্লাহ (স)-এর ক্ষতি করতে চাইতেন। তবে আল্লাহর রসুল (স)ও সতর্ক থাকতেন।

রসুলুল্লাহ (স)-এর যুগে ইসলামের মহিমায় আকৃষ্ট হয়ে যেমন মানুষ কালেমার পতাকাতলে সমবেত হতেন, তেমনি তা এখনও অব্যাহত আছে। প্রতিদিন হাজার হাজার অমুসলিম ইসলামগ্রহণ করছেন। ইসলামগ্রহণের ঘটনা গরিব দেশগুলোর চাইতে উন্নত দেশগুলোতে ঘটছে বেশি। তারা সরাসরি কুরআন অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমেও ইসলামের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হতে পারছেন। এই প্রবণতা ইউরোপ-আমেরিকাতেই বেশি দেখা যাচ্ছে। সেসব দেশে মসজিদ বাড়ছে। মুসল্লি বাড়ছে। এর প্রবল ঢেউ দেখে ইউরোপ-আমেরিকার খৃস্টীয় নেতারা প্রায় হতবিহ্বল। কী করে ইসলামগ্রহণ ঠেকানো যায় তার সব চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আর ইউরো বিনিয়োগ করা হচ্ছে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রোপাগা-ার জন্য।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নওমুসলিমদের কেউ কেউ জঙ্গিবাদ তথা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠছে। এরই মধ্যে কয়েকজন নওমুসলিম দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিতৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকবার ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। কয়েকজন নিহতও হয়েছেন। এতে দেশের হাজার হাজার নওমুসলিমের বিরুদ্ধে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠবার আশঙ্কা রয়েছে। এনিয়ে অনেকের মধ্যে কানাঘুষো চলছে। কোনও কোনও নওমুসলিম আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে আছেন বলে ধারনা করা হচ্ছে। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকাতেও জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন কয়েকজন নওমুসলিম। বিষয়টি দুশ্চিন্তার নিশ্চয়ই। সত্যি বলতে কী এনিয়ে আমিও খানিকটা উৎকণ্ঠার মধ্যে আছি। এর কারণ হচ্ছে: দেশের কয়েক হাজার নওমুসলিমকে নিয়ে আমি কিছুটা কাজ করেছি এ উপমহাদেশের প্রখ্যাত নওমুসলিম মরহুম আবুল হোসেন ভট্টাচার্য সাহেব বেঁচে থাকতেই। উল্লেখ্য, আবুল হোসেন ভট্টাচার্যসহ কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ইসলাম প্রচার সমিতির সহায়তায় আমিসহ আবদুর রহমান ব্যানার্জি, শহীদুল ইসলাম ভট্টাচার্য, আবদুর রহমান ভৌমিক, মুহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর মতো আরও কয়েকজন নওমুসলিম আমরা ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চতর শিক্ষালাভের সুযোগ পাই। এই সমিতির সহায়তা না পেলে আমাদের অনেকের উচ্চশিক্ষার সুযোগই হয়তো হতো না বলে আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি। এই সমিতি এখনও টিমটিম করে টিকে আছে মাত্র। ভট্টাচার্য সাহেব বেঁচে থাকতে সমিতি যেভাবে তৎপর ছিল তা এখন নেই। আমি এর সঙ্গে নামেমাত্র সংশ্লিষ্ট থাকলেও কামে নেই বলা চলে।

দেশের নওমুসলিমরা কে কোথায় তারও কোনও খোঁজখবর কেউ নিতে পারেন না। তবে যেসব নওমুসলিমের বিরুদ্ধে জঙ্গিতৎপরতার অভিযোগ উঠছে তারা একদম নতুন। তাদের কোনওরকম পরিচয় আমরা জানি না। সমিতিতেও কোনও দিন তারা এসেছেন বলে জানা নেই। তবু তারা নওমুসলিম বলে আমি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ একজন নওমুসলিম নষ্ট হয়ে যাবেন বা কোনও অপকর্মে জড়িয়ে পড়বেন তা আমি চাই না। তবে আমি কাউকে কাউকে দেখেছি শুধুমাত্র নাম পাল্টে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুসলিম সেজে ঘুরে বেড়াতে। এরা অনেকেই সাহায্যের জন্য হাতপাতেন। সহযোগিতা প্রার্থনা করেন। সুযোগ বুঝে আবার অমুসলিমসমাজে ফিরেও যান। অপরদিকে কোনও কোনও বংশপরম্পরায় মুসলমানও নওমুসলিম সাজেন সমাজের কাছ থেকে সাহায্য-সহানুভূতির প্রত্যাশায়। এই উভয়প্রকার আদমই আসলে প্রতারক। এদের জন্য প্রকৃত নওমুসলিমদের বদনাম হয়।

প্রকৃতপক্ষে যারা সত্যানুসন্ধানী, অনুভূতিশীল এবং অনেকটা আবেগপ্রবণও তারাই কেবল পারিবারিক মায়ামমতার বন্ধন ছিন্ন করে পবিত্র কালেমার পতাকাতলে সমবেত হতে সক্ষম। জন্মসূত্রের বিশ্বাসবোধ অতিক্রম করে সম্পূর্ণ নতুন জীবনবোধকে বরণ করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এমন সিদ্ধান্ত নেয়া আসলে অনেক অনেক কঠিন।

নওমুসলিমরা মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, এমনকি কখনও সখনও স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে ফেলে বিশ্বাস পরিবর্তনের কঠিনতর কাজ সম্পন্ন করে ফেলেন। এ যে কতো বড় ত্যাগ তা ভুক্তভোগী ব্যতীত অন্যের পক্ষে বোঝা মুশকিল বৈকি!

যারা ব্যাপক পড়াশোনা ও গবেষণা করে ইসলামগ্রহণ করেন তাদের তেমন সমস্যা হয় না। আর হলেও সহজে তারা মানিয়ে নিতে পারেন। সমস্যায় পড়তে হয় তাদের, যারা ইসলামের দু-একটা বৈশিষ্ট্য দেখে মুগ্ধ হয়ে হুট করে কালেমা পাঠ করে আদালত বা নোটারি পাবলিকের কাছে হলফনামা দাখিল করে মুসলমান হন তাদের অনেক সময়ই সমস্যায় পড়তে হয়। কখনও সখনও তারা না ঘরকা, না ঘাটকা পরিস্থিতিতে পড়েন। এদের নিয়ে অনেকে ব্যবসাও শুরু করেন। সুযোগ বুঝে জঙ্গিরাও আজকাল এদের টার্গেট করে। অর্থ দিয়ে দলে টানে। ছন্নছাড়া নওমুসলিমদের জঙ্গিরমণীর সঙ্গে বিয়ে দিয়েও বাগে আনা হচ্ছে বলে ধারনা করা হয়। বিপত্তি ঘটছে এখানেই। আমার উদ্বেগের কারণ নিশ্চয় কিছুটা হলেও বোঝাতে পেরেছি বলে মনে করছি।

নওমুসলিমরা বেশির ভাগ হন আবেগপ্রবণ। শহিদ হলেই বিনাহিসাবে সোজা জান্নাত, ওখানে অফুরন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অপেক্ষা করছে। এমন ভুল ব্যাখ্যা দিয়েও তাদের জঙ্গিবাদের বীরসেপাই বানানো হয় বলে প্রকাশ। একইভাবে মুসলিমসমাজের একশ্রেণির আবেগপ্রবণ তরুণও জঙ্গিবাদে শামিল হচ্ছেন।

এসব ছাড়াও বিশ্বের পরাশক্তিগুলো ইসলামকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতিপক্ষ এবং মুসলমানদের সন্ত্রাসী বলে প্রতিপন্ন করতেই জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে তা তাদেরই ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। যাকে সহজ ভাষায় ‘উদোর পি-ি বুদোর ঘাড়ে চাপানো’ ব্যতীত আর কী বলা যেতে পারে?

একটা বিষয় সবার মনে রাখা খুব জরুরি যে, ইসলাম জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস সমর্থন করে না। এখন বিভিন্ন সংগঠন চমৎকার সব নাম দিয়ে বিভিন্ন দেশে যে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে তার নাম জিহাদ নয়। জিহাদের উদ্দেশ্য রক্তপাত নয়। এর অর্থ মূলত শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপসহীন থেকে মারণাস্ত্র ব্যবহার না করে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করাও আল্লাহর পথে জিহাদ। কোনও অমুসলিম ইসলামের সঠিক দাওয়াত পেয়ে কালেমার পতাকাতলে সমবেত হলে জঙ্গিবাদ তথা কোনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়ানো দূরে থাক, এসব বেআইনি তৎপরতার ধারেকাছেও যেতে পারেন না। এরপরও কেউ যদি অপরাধ করেন, তাহলে প্রচলিত আইনে তাদের অবশ্যই সাজা হতে পারে। এতে কারুর কোনও আপত্তি থাকবার কথা নয়। আইনের চোখে ন্যায়বিচারের স্বার্থে মুসলিম, অমুসলিম, নওমুসলিম সবাই সমান। অপরাধ করলে সবাই অপরাধী। এছাড়া নওমুসলিমরা কোনও আলাদা প্রজাতি নন যে, তাদের পৃথক আইডেন্টিটি প্রকাশ জরুরি। তারা এ সমাজেরই মানুষ এবং এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদের যেমন সামাজিক দায়-দায়িত্ব রয়েছে, তাদেরও তাই। তবে কেউ যদি ইসলামগ্রহণের ফলে নিঃসম্বল, নিরাশ্রয় ও নিরাত্মীয় হয়ে পড়েন তাহলে তাকে সর্বাত্মক সহায়তা করা সক্ষম মুসলিমদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। একথা সমাজের স্বচ্ছল মুসলমানদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ