বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাউল কবি তোফাজ্জল হোসেন বয়াতি

-ড. আশরাফ পিন্টু
নদীর তীরে বটতলায় কিংবা গ্রাম-গঞ্জের হাট বাজারে এখন আর বাউলদের আসর জমে না। গ্রাম-গঞ্জের পথে-ঘাটেও দেখা যায় না একতারা হাতে বাউলদের আধ্যাত্মিক সুরের মুর্ছনা। শহরের কোনো অনুষ্ঠানেও শোনা যায় না বাউলসঙ্গীত। শাহরিক সভ্যতা গ্রাম বাংলার এসব মেঠো সুর কেড়ে নিয়েছে। আমাদের স্বকীয় সত্তা লোক-সংস্কৃতি যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে কালের অতল গহ্বরে। এরই মাঝে দু’-একজন বাউল শিল্পী নিভু নিভু প্রদীপের মতো আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন আমাদের লোকসংগীতে; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন তোফাজ্জল হোসেন বয়াতি।
তোফাজ্জল হোসেন বয়াতি ১৯২৭ সালে পাবনা জেলার চক-ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কিয়াম উদ্দিন বিশ্বাস। ১৯৫৫ সালে তিনি জীবিকার অন্বেষণে পাবনা শহরে আসেন এবং একটি প্রেসে কম্পোজিটরের কাজ নেন। পরবর্তীতে পাবনার চক-পৈলানপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি পাঁচ মেয়ে এক ছেলের জনক।
তোফাজ্জল হোসেন বয়াতি গান করেন এবং লিখেন। তার গীত গানের সংখ্যা তিন শতাধিক হলেও স্বরচিত গানের সংখ্যা এক শ’য়ের বেশি নয়। তিনি দেশাত্মবোধক, ধর্মীয় ভাবসঙ্গীত, আঞ্চলিক প্রভৃতি বিষয়কে কেন্দ্র করে গান রচনা করেছেন। ‘বাউল সুরের সাধনাতেই দয়ালের দর্শন পাওয়া সম্ভব। পাপী আত্মার পাপ বিমোচন তথা দয়াল-মুর্শিদের যোগ সান্নিধ্য লাভের একমাত্র উপায়ই হচ্ছে একতারার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা; একতারার ভেতরে ডুব দেওয়া। দয়ালের সাধন বিনে মুক্তি নেই।’ এমন বাউলতত্ত্বের কথাই তার কিছু গানে প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন-

মন তুই ফাঁঁকি দিয়া
থাকবি কত দিন
ভবের মায়ায় ডুবে রইলি
রঙ্গ-রসে কাল কাটালি,

ও তুই খালি হাতে ক্যামনে যাবি

বিচারের ঐ কঠিন দিনে।

আধ্যাত্মিকতা ধর্মতত্ত্বের বাইরে নয়। তোফাজ্জলের গানে ধর্মবোধও প্রকাশ পেয়েছে নিগূঢ়ভাবে। তার বেশ কিছু গানে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, নামাজ, রোজা, পরকালের পুলসিরাত পার হবার প্রসঙ্গ এসেছে। পুলসিরাত নিয়ে তার একটি গান::

চুলের চাইতে চিকন সে যে
হিরার চাইতে ধার,
পুলসিরাতের কঠিন সাঁকো
কেমনে হবো পার
আমি যে গোনাহগার দয়াল
কেমনে হবো পার।

শুধু ধর্ম-দর্শন নয়, সুগভীর দেশপ্রেমও তার গানের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। নিজদেশ, নিজ বাসভূম পাবনা, দেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তিনি গান লিখেছেন। এসব গানে তার দেশের প্রতি মায়া-মমতা তথা দেশপ্রেমই প্রস্ফুটিত হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে ১৯৯৭ সালে বিজয় দিবসের এক অনুষ্ঠানে তিনি স্বরচিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি গান গেয়ে অনেকের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছিলেন। তার গান শুনে মুক্তিযুদ্ধে সন্তানহারা এক মা কান্নায় ভেঙে পড়েন । গানটির কিয়দংশ নিচে উদ্ধৃতি দিচ্ছি-

কেন্দ না কেন্দ না মাগো কেন্দে কি হবে
তোমার ছেলে ঘুমিয়ে আছে
সোনার বাংলার মাটিতে স্বাধীন বাংলার মাটিতে।
মা জননী কেন্দে কেন্দে পাগল হয়ে বলে
আসবে এখন তোমার ছেলে এই না পথ দিয়ে
আজও পথের দিকে চেয়ে থাকে ঘরের দরজা খুলে।...

পাবনার আঞ্চলিক ভাষায় রচিত তার একটি গানে ব্যঙ্গ-রসাত্মক কথায় ফুটে উঠেছে শশুরবাড়িতে জামাইয়ের আদর-আপ্যায়নের চিত্র। শশুরবাড়িতে জামাইয়ের ঘন ঘন যাতায়াতই যে এমন দুর্দশার কারণ তা বলাই বাহুল্য-

লক্ষ্মীমন্ত জামোই শশুরবাড়ি যায়
ছয় ছয় ঘণ্টা দাঁড়া থাহে অধুয়া পায়
শশুরবাড়ি আয়ছে জামোই
গোস্ত-রুটি খাইতে
জামোইর কপালে জুটে গেল
ভত্তা শাক ভাতে।
জামোই বসো হে উচেল ডুয়ার পার।।

তোফাজ্জল হোসেন যদিও স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে গান লেখেন ও গেয়ে থাকেন তবুও তিনি বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে তালিম নিয়েছেন।এসব ওস্তাদের মধ্যে লালন সঙ্গীতসাধক দেলোয়ার হোসেন, সাধু হারানন্দ, পাগলা গঙ্গা দাশ, ধলু শাহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। বয়েত গ্রহণ আর পরমাত্মার নিগূঢ় তত্ত্বের সন্ধানে তোফাজ্জলের ওপর এসব গুরুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ সাধনা তাকে আরো উৎসাহ যুগিয়েছেন গীতিকার মোহাম্মদ আব্দুল করিম, ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন, নায়েব রইচ উদ্দিন প্রমুখ।

বাংলার অবারিত রূপসৌন্দর্যে পাগল হয়ে অসংখ্য কবি, বাউল আর বয়াতির জন্ম হয়েছে এই বাংলাদেশে। যারা গানে গানে তুলে ধরেছেন বাংলার মানুষের দুঃখ দুর্দশা, প্রেম-ভালোবাসা; আবার সেই সাথে অন্বেষণ করেছেন আত্মা-পরমাত্মার নিগূঢ় তত্ত্ব। যুগ বদলালেও মেঠোসুরের মূলসুরটি হারিয়ে যায় নি এখনও। বাউল তোফাজ্জল হোসেনের গানেও আমরা এ দিকটি লক্ষ্য করি। তিনি অনেক আধুনিক বিষয় নিয়ে গান রচনা করেছেন। যেমন, যৌতুক ও নারী নির্যাতন, এইডস, মাদকদ্রব্য, স্যানিটেশন, নির্বাচনের গান ইত্যাদি। এসব গানে তিনি বাউল আঙ্গিকে সুর দিয়েছেন। যৌতুকপ্রথা ও নারী নির্যাতন নিয়ে তার এমনি একটি জারীগান

 বিয়ের সময় হোন্ডা নিলে আরো নিলে টাকা
তার পরেও এখন চাচ্ছ সুন্দর একটি বাসা।
এই কথা বলিয়া বৌকে পাঠাও বাপের বাড়ি
এইগুলি না পাইলে তুমি বৌকে দিবে ছাড়ি।।

তোফাজ্জল হোসেন বয়াতি একজন একনিষ্ঠ বাউল সঙ্গীতসাধক। তিনি মুখে মুখে গান রচনা করেন এবং গেয়ে বেড়ান বিভিন্ন জায়গায়। জীবন-জীবিকার জন্য তাকে পথে-প্রান্তরেও ঘুরতে দেখা যায়। বর্তমানে তিনি বয়সের ভারে নুব্জ তবুও তার মুখের গান থেমে নেই। শহর কিংবা গ্রামে সব জায়গাতেই রয়েছে তার সরব উপস্থিতি। এখন পর্যন্ত তিনি দেশ ও জাতির কাছে তেমন মূল্যায়ন পান নি; তবে এ ব্যাপারে তার দুঃখ নেই। মূলত তিনি গান রচনা করেন ও গেয়ে থাকেন হৃদয়ের আত্মতৃপ্তিতে; আর এর মূল্যায়ন একদিন হবেই এমনটিই আশা তার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ