মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিদের বরখাস্ত নীতি বন্ধ হউক

গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ : দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার যে সরকারি নীতি গত কয়েক বছর ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে গণতান্ত্রিক মূল্যেবোধের প্রেক্ষাপেট তার যৌক্তিকতা নিয়ে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বলা বাহুল্য নির্বাচিত প্রনিধিদের বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রীদের টার্গেট করায় এই উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিদের নানা অজুহাতে সরকার বরখাস্ত করে সরকারি দলের পরাজিত প্রার্থীদের তাদের স্থলাভিষিক্ত করছেন। আবার, বরখাস্তকৃত জনপ্রতিনিধিরা আদালতে গিয়ে বরখাস্ত আদেশ চ্যালেঞ্জ করার পর আদালত কর্তৃক ঐ আদেশ খারিজ করে দেয়া হচ্ছে এবং তারা পুনর্বহাল হচ্ছেন। কিন্তু আদালতের আদেশ সত্ত্বেও সরকার তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে দিচ্ছেন না। অথবা দায়িত্ব গ্রহণ করলেও কিছুদিন পর ভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তাদেরকে পুনরায় বরখাস্ত করা হচ্ছে, গ্রেফতারও করা হচ্ছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, বিরোধী দলের কোন প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করুক সরকার তা চান না। এটা সরকারের গণতন্ত্রের প্রতি উষ্মারই একটি বহিঃপ্রকাশ বলে ধারণা করা যায়। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং তাতে বিএনপিপন্থী একজন প্রার্থীর মেয়র হিসেবে নিরঙ্কুশ ভোটে জয় ও মেয়রের চেয়ারে বসার অল্প কয়েকদিনের মাথায় তাকে বরখাস্ত করার ঘটনায় দেশের গণতন্ত্রমনা প্রতিটি মানুষই স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। সরকার যদি জনগণের রায়কে শ্রদ্ধা করতেই না পারেন, তাদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একমাত্র বিরোধীদলীয় হওয়ার কারণে কাজ করতে দিতে না চান তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচনের আয়োজন করার প্রয়োজনই বা কী? একজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিভিন্ন মানদ-ের ভিত্তিতে এই মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হয় এবং বাছাইতে টিকে যাবার পর তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে কীভাবে বহিষ্কৃত হন? বলা হচ্ছে যে, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেয়া যায় যে, তিনি দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন তাহলে প্রশ্ন উঠে মনোনয়নপত্র বাছাইকালে এটা কেন দেখা হলো না? একজন প্রার্থী নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকে এবং এই কারণগুলোর কোন একটিও যদি তার বেলায় প্রযোজ্য হয় তাহলে তিনি নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে পারেন না এবং তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাখ্যান করা হয়। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়রের বেলায় এর কোন একটি কারণও প্রযোজ্য নয়। আর যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে, প্রতিদ্বন্দ্বী ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্টতার জন্য তাকে বহিষ্কার করা জনপ্রনিধিত্ব আইনের শুধু লঙ্ঘন নয় বরং গণতন্ত্রের প্রতি পদাঘাতও।
২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকার এই কাজটি করেছেন। ঐ মেয়াদের পরিসংখ্যান আমি দিলাম না। ঐ মেয়াদে ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত বিরোধীদলীয় একাধিক প্রতিনিধিকে প্রকাশ্যে রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করেছে (সানাউল্লা বাবু) এবং ভিন্নমত পোষণ করায় মন্ত্রীর রোষানলে পড়া দলীয় প্রতিনিধিকেও গুলী করে হত্যা করা হয়েছে নরসিংদীর লোকমান এর কোন বিচার হয়নি। গত তিন বছরের পরিসংখ্যান যাচাই করলে দেখা যায় যে, এই সময়ে ৩৭১ জন গণপ্রতিনিধি বরখাস্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ৩৫ জন পৌর মেয়র, ৫৬ জন পৌর কাউন্সিলর ৪৯ জন উপজেলা চেয়ারম্যান ৬৬ জন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, ৯১ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং ৭৪ জন ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার। উল্লেখ্য যে, সরকার স্থানীয় সরকারের যে আইনটি ব্যবহার করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করছেন সে আইনটি দেশের উচ্চ আদালত ইতোমধ্যে বাতিল করে দিয়েছেন। এই আইনটি হচ্ছে ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন আইন)। এ আইনের ১২ (১) ধারা বলে স্থানীয় সরকর মন্ত্রণালয় বরখাস্ত আদেশ প্রদান করতেন। হাইকোর্টে আইনটি চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং তা আদালতের রায়ে বাতিল বলে গণ্য হয়। সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের আপিল না মঞ্জুর করে সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। বলা বাহুল্য, হাইকোর্টের রায়ে সরকারকে এ সংক্রান্ত বিধি-বিধান সংশোধন করার জন্যও বলা হয় এবং সরকার নির্দেশ অনুযায়ী বিধি-বিধান সংশোধন না করে বাতিলকৃত আইনের ধরা বলে বরখাস্ত আদেশ অব্যাহত রেখেছেন এবং দেশের উচ্চ আদালতের রায় অমান্য করে আদালত অবমাননা করছেন বলে পর্যবেক্ষক মহল ধারণা করছেন। এতে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে যারা বরখাস্ত হচ্ছেন তাদের প্রায় শতকরা ১০০ ভাগই জামায়াত ও বিএনপি’র রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট। এদের মধ্যে এমন বেশকিছু প্রতিনিধি আছেন যাদেরকে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলারক্ষী বাহিনীর সদস্যরা অপহরণ করে নিয়ে গেছেন এবং মাসের পর মাস অজ্ঞাতস্থানে অমানুষিক নির্যাতন করে পরে গ্রেফতার দেখিয়েছেন (যেমন : রংপুরের মিঠাপুকুরের একজন প্রতিনিধিসহ আরও অনেকে)।
পক্ষান্তরে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের সরকারি দল থেকে নির্বাচিত বা জবরদস্তি নির্বাচিত ঘোষিত প্রতিনিধিদের যে চরিত্র ফুটে উঠছে তাতে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছেন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জবরদখল, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, রেষওয়াত, অনৈতিক কাজ, চাঁদাবাজি হেন কোন অপরাধ নেই যাতে তারা জড়িয়ে পড়ছে না। খোদ রাজধানীতে প্রশাসনের চোখের সামনে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (দক্ষিণ) আরামবাগে ক্ষমতাসীন দলের একজন কাউন্সিলর ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা একটি জাতীয় দৈনিকের একটি নয়তলা ভবন ও দুইটি চারতলা ভবন অস্ত্র ও বাহুবলে জবরদখল করে আছেন। বাড়িগুলো তাদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশনের দ্বারস্থ হয়েও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। থানা সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে জিডি নেয়নি। পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ও কমিশনার কোন প্রকার সহযোগিতা করেননি। সিটি করপোরেশনের মেয়র কোন প্রকার সহযোগিতা করতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন। রাজধানীর পত্র-পত্রিকায় এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু কোন প্রতিকার হয়নি। নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা যদি বিরোধীদলের হয় তাহলে তারা অপরাধ করুক বা না করুক সরকার তাদের শাস্তি দিচ্ছে। এমনকি আইন ভঙ্গ করেও। কিন্তু নিজ দলের হলে জবরদখল, গুম-খুন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি যে অপরাধেই তারা অভিযুক্ত হোক না কেন তাদের কোন শাস্তি নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ দেশব্যাপী নৈরাজ্যের সৃষ্টি করছে এবং শাসন ব্যবস্থাকে হাসির খোরাকে পরিণত করছে।
সাম্প্রতিককালে সরকারি দল বিভিন্ন স্থানে জনসভায়, সংবাদ সম্মেলনে ও বুদ্ধিজীবী সমাবেশে নিজ দলের জন্য ভোট চেয়ে যে আবহ সৃষ্টি করছেন তাতে মনে হচ্ছে যে, সামনে একটি নির্বাচনী খেলা জমিয়ে তুলতে তারা চেষ্টা করছেন। তবে এই টুর্নামেন্টের খেলোয়াড় কারা হবে তাও তারা নির্ধারণ করে দিবেন বলে মনে হয়। তারা একদিকে ঘোষিত ও অঘোষিতভাবে নানা নামে চিরুনি অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের প্রতিশ্রুতিশীল নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে কারারুদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত, প্রতিনিধিদের গ্রেফতার, গুম ও বরখাস্তের মাধ্যমে তাদের তৎপরতাকে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করছেন। এই অপচেষ্টা নির্বাচনে বিরোধীদলের অংশগ্রহণকে অসম্ভব করে তুলবে এবং সরকারি দল ও তার জোট ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের ন্যায় আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পাবে। গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং দেশের কল্যাণের জন্য এই অপচেষ্টা বন্ধ হওয়া উচিত। বিরোধী দলের কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বানোয়াট অভিযোগে মামলা দিয়ে, কোর্টকে প্রভাবিত করে শাস্তি দিয়ে তাদের নির্বাচনের অযোগ্য করে তোলার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জেলা-উপজেলার প্রতিশ্রুতিশীল নেতাদের স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠানসমূহের বৈধ নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করে এবং বিনা অপরাধে তাদের জেলে পুরে সরকার একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। পরিস্থিতিকে বিরোধী দলের জন্য এভাবে শ্বাসরুদ্ধকর করে তুললে তাদের পক্ষ থেকে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লোক পাওয়া যাবে না। তখন সরকারি দল খালি মাঠে গোল দিতে পারবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ