রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

যে ব্যবসায় লোকসান নেই

মনসুর আহমদ : ব্যবসায়ে লাভের যেমন সম্ভাবনা বিদ্যমান তেমনি রয়েছে লোকাসানের ঝুঁকি। পৃথিবীর কোন ব্যবসাই ঝুঁকি বিহীন নয়। কিন্তু মানুষের জন্য ব্যবসায়ে কোন ঝুঁকি নেই এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দিয়ে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন :
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
তুমি কি দেখনি আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা থেকে আমি বিভিন্ন বর্ণের ফল মূল বের করি। পর্বত সমূহের রয়েছে নানা রঙের গিরিপথ-সাদা, লাল, নিকষকালো। অনুরূপ ভাবে বিভিন্ন বর্ণের মানুষ, জন্তু, চতুষ্পদ প্রাণী রয়েছে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই তাকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল। যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামায কায়েম করে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে তারা এমন ব্যবসা করে যাতে কোন লোকসান হবে না।  পরিণামে তাদেরকে আল্লাহ তাদের সওয়াব পুরাপুরি দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশি দেবেন। তিনি নিশ্চয় ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। [ ফাতের- ২৭-৩০]
নামকরণ : সুরাটির নাম ‘ফাতির’। নামটি এর প্রথম আয়াত “আল হামদু লিল্লাহি ফাতিরিস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদি..” থেকে নেয়া হয়েছে। এ সুরাটির আর এক নাম ‘আল মালায়েকা’ - এ শব্দটিও প্রথম আয়াতে রয়েছে।
নাজিল কাল-রসুল [স.]- এর মক্কী জীবনের মাঝামাঝি সময় যখন রসুলের বিরোধিতা অত্যন্ত তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং কাফেরদের পক্ষ থেকে রসুলের দাওয়াতকে ব্যর্থ করে দেয়ার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছিল তখন এ সুরাটি নাজিল হয়। সুরাটির প্রথম দিকের আয়াতে এর ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। যেমন- এই লোকেরা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তবে এটা কোন নতুন ব্যাপার নয়। তোমাদের পূর্বেও অনেক রসুলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়েছে। আর সব ব্যাপারেই শেষ পর্যন্ত আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে।
ব্যাখ্যা : আলোচ্য অংশের প্রথম আয়াতে তৌহিদের দাওয়াত দেয়া হয়েছে। এই দৃশ্যমান অদৃশ্যমান মহা বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, এবং ক্ষমতা এখতিয়ারে তিনি ছাড়া তাঁর সমকক্ষ আর কেউ নেই- এ সত্য প্রকাশ পেয়েছে। এ আয়াতের পূর্বে মানুষ সৃষ্টির রহস্য, পানির সৃষ্টি কৌশল ও চন্দ্র সূর্যের চলার পথের নিয়মাবলী সব কিছুই একমাত্র আল্লাহর সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে; যেন মানুষ আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ রূপে স্বীকার করে নেয় ও তার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে। পৃথিবীর সৃষ্টি কৌশল ও সৃষ্টি বৈচিত্র্য উল্লেখ করে মানুষকে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে মানুষকে আবার একদিন জাগতে হবে আল্লাহর সামনে এবং সেদিন সেখানে মানুষের প্রতি যে দায়িত্ব ও কর্তব্য দেয়া হয়েছিল সে ব্যাপারে তাকে জওয়াবদিহি করতে হবে। মানুষ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ইলাহ মানছে তারা কোন কিছুরই মালিক নয়। এমনকি একটি তৃণ খÐেরও নয়। বলা হয়েছে- তাকে বাদ দিয়ে যাকে তোমরা ডাক তারা একটি তৃণ খÐেরও মালিক নয়।
পূর্বের রুকুতে এ সব কথা বলার পর আলোচ্য চতুর্থ রুকুতে আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ ও তা থেকে বিভিন্ন রঙের ও ধরনের ফল মূল, বিভিন্ন রঙের পাহাড় পর্বত ও প্রাকৃতিক সম্পদ সৃষ্টির উল্লেখ করে মানুষকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিতে চান যে, এক সুবিজ্ঞানী মহাপরাক্রান্তশালী সৃষ্টিকর্তা অসংখ্য যৌক্তিকতা ও কল্যাণ দৃষ্টি সহকারে এ সব পয়দা করেছেন। তিনি মানুষের বিবেককে শানিত ও জাগ্রত করার জন্য তাদের সামনে বৃষ্টি বর্ষণ ও তার কল্যাণময়তা উল্লেখ করেছেন। মানুষ যখন ক্ষেতে ফসল ফলাবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে, প্রাকৃতিক জগৎ যখন দু’ফোটা বারিপাতের আশায় সৃষ্টির অসীম সম্ভাবনার আনন্দ নিয়ে ব্যাকুল হয়ে ওঠে তখনই আল্লাহ তার সৃষ্টি কৌশলের মাধ্যমে রহমত রূপ পাঠান তাঁর বারিপূর্ণ মেঘমালা, বর্ষিত হয় প্রচুর বারি, মৃত ধরণী যেন ফিরে পায় নতুন জীবন। কোরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ এ রহস্য বার বার তুলে ধরেছেন। যেমন এরশাদ হচ্ছে,-“তিনি স্বীয় অনুগ্রহে বাতাসকে সুসংবাদ বহনকারী অগ্রদূত রূপে প্রেরণ করেন। যখন বায়ুরাশি সেই পানি ভারাক্রান্ত মেঘমালা বয়ে আনে, তখন আমরা তাকে কোন মৃত ভূখÐের দিকে পরিচালিত করি এবং সেখানে বৃষ্টি বর্ষণের সাহায্যে সকল সকল ধরনের ফসল উৎপাদন করি। লক্ষ্য কর, এ ভাবেই আমরা মৃতকে জীবিত করব- যাতে তোমরা চিন্তা কর।” [ আরাফ-৫৭]
একই জমিনে একই পানি বর্ষণের ফলে জন্ম নেয় রকম বেরকমের ফুল ফল। পাহাড়গুলি নানা রঙ ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে। আবার জন্তু জানোয়ার ও গৃহপালিত পশুগুলির নানা বর্ণ প্রকৃতি কোন অন্ধ প্রকৃতির নিয়ন্ত্রিত নয় বরং সব কিছুর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানময় কুশলতা ও বুদ্ধিমত্তা পূর্ণ মহাপরিকল্পনা গ্রহণকারী আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ। প্রকৃতির এই উন্মুক্ত কিতাব মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছে তার জীবনেও রয়েছে ঐ মহাপ্রজ্ঞাবান শক্তিমানের নিয়ন্ত্রণ। মানুষ দায়িত্বহীন কোন সৃষ্টি নয়। মানুষকে বিচিত্র প্রচুর প্রজ্ঞা ও শক্তি দিয়ে পয়দা করা হয়েছে, আর তাকে তার প্রভুর সামনে দাঁড়াতে হবে তার পার্থিব জীবনের সমস্ত কর্মের ফসল নিয়ে। 
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার সৃষ্টি বৈচিত্র্যের ধারা তুলে ধরে ঘোষণা দিচ্ছেন।‘প্রকৃত কথা হল, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল ইলম সম্পন্ন লোকেরাই তাঁকে ভয় করে।’
এই আয়াতটুকু আলোচ্য দরসের মূল বক্তব্য। তাই মানুষের মুক্তির জন্য যে আল্লাহ ভীতি বা তাকওয়ার প্রয়োজন তা কি ভাবে আমাদের মাঝে পয়দা হবে সে বিষয়ে ভালভাবে বুঝা দরকার।
আল্লাহ ভীতি কি ভাবে সৃষ্টি হবে এর ব্যাখ্যায় মওলানা মওদূদী [রহঃ] লিখেছেন - ‘আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে যে ব্যক্তি যতদূর অজ্ঞ হবে সে তার ব্যাপারে ততখানি নির্ভীক হবে। পক্ষান্তরে আল্লাহর কুদরত, ইলম, কর্মকুশলতা, তার প্রবল পরাক্রমশালী হওয়া ইত্যাদি ও অন্যান্য গুণ - সেফাত সম্পর্কে যে লোক যত অধিক পরিচিতি লাভ করবে তার নাফরমানীর ব্যাপারে সে তাকে ততদূর বেশি ভয় করবে। ’
 আল্লাহ এখানে যেমন প্রাকৃতিক জগতের সৃষ্টি বৈচিত্র্য উল্লেখ করত এ ব্যাপারে যারা গভীর মনোনিবেশ সহকারে তা লক্ষ্য করে থাকে তাঁদেরকে খোদা ভীরু হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন, তেমনি মহাবিশ্বের সৃষ্টি কৌশল সম্পর্কে যারা চিন্তা ভাবনা করে তাঁর কুদরত ক্ষমতা সম্পর্কে অভিহিত হয়ে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদেরকে তিনি জ্ঞানী হিসাবে পরিচিত প্রদান করায়ে ঘোষণা দেন -“নিশ্চয়ই আসমান জমীন সৃষ্টিতে এবং দিবস রজনীর আবর্তনে নিদর্শন রযেছে বোধ সম্পন্ন লোকদের জন্য।”
 আলোচ্য আয়াতখানিতে খোদা ভীতি অর্জনের জন্য যেমন সঠিক পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে তেমনি প্রকৃত ওলামাদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। ওলামা বলতে আমরা প্রচলিত ধারণায় কোরআন, হাদিস, ফিকাহের জ্ঞানের অধিকারীদেরকে মনে করে থাকি, কিন্তু এখানে ওলামা বলে যেমন তাদেরকেই বুঝান হয়নি, তেমনি শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, অংক, পদার্থ বিদ্যা ইত্যাদি সম্পর্কে যারা জ্ঞান রখেন কিšুÍ খোদার ক্ষমতা ও কুদরাত সম্পর্কে অজ্ঞ তাদেরকেও বুঝান হয়নি। বরং প্রকৃত জ্ঞানীতো তারাই যারা দাঁড়িয়ে, বসে, শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে ও চিন্তা গবেষণা করে আসমান জমিন সৃষ্টির বিষয়, আর [তারা বলে] পরওয়ারদেগারে আলম, এ সব কিছু তুমি অনর্থক পয়দা করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই। আমাদেরকে তুমি দোজখের শাস্তি থেকে বাঁচাও।’
হযরত মওলানা শফী [রহ.] ওলামাদের পরিচয় দিয়ে লিখেছেন, আয়াতে “মিন ইবাদিহীল উলামাউ.” বলে এমন লোক বুঝান হয়েছে যারা আল্লাহতায়ালার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে সম্যক অবগত এবং পৃথিবীর সৃষ্ট বস্তু সমগ্রী তার পরিবর্তন পরিবর্ধন ও আল্লাহর দয়া ও করুণা নিয়ে চিন্তা গবেষণা করেন। কেবল আরবী ভাষা, ব্যাকরণ, অলংকারাদী সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিকেই কোরআনের পরিভাষায় আলেম বলা হয় না,  যে পর্যন্ত সে আল্লাহর মারেফাত উপরোক্ত ভাবে অর্জন না করে।’
প্রকৃত আলেমের পরিচয় দিতে গিয়ে আহমদ ইবনে সালেহ মিসরী বলেন, অধিক রেওয়ায়েত ও অধিক জ্ঞান দ্বারা খোদা ভীতির পরিচয় পাওয়া যায় না বরং কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ দ্বারা এর পরিচয় পাওয়া যায়। এ সত্যই প্রকাশিত হয়েছে সুরাটির ২৯ নং আয়াতে- ইন্নাল্লাজিনা ইয়াতলুনা কিতাবাল্লাহি..
প্রকৃত আলেমদের অন্তরে যেমন পূর্ণ থাকে খোদাভীতি, তেমনি বাহ্যিক এবাদত, কোরআন তেলাওয়াত, নামায কায়েম ও আল্লাহর পথে ব্যয়ের সাথে থাকে তাঁরা সম্পৃক্ত।
আলেমদের প্রথম বৈশিষ্ট্য তাঁরা কোরআন তেলাওয়াত করে। ‘ইয়াতলুনা কিতাবাল্লাহি ’আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত সম্পর্কে আমাদের সমাজে ভুল বুঝাবুঝি আছে। আমাদের সমাজের ধারণা কোরআন দেখে বা মুখস্ত পড়াই তেলাওয়াত। তফসীরে তাবারীতে তেলাওয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যার পরে যে কথা বলা হয়েছে তা হল ‘এর সঠিক ব্যাখ্যা যথার্থ অনুসরণ করা।’ নিয়মিতভাবে সর্বদা কোরআন তেলাওয়াত ও তার অনুসরণ ই আলেমদের প্রথম বৈশিষ্ট্য।
 দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য “তারা নামায কায়েম করে।”
একামতে সালাত বা নামায কায়েম করার ব্যাখ্যায় তাফসীরে তাবারীতে বলা হয়েছে- এর অর্থ সালাতের যে সব হক আদায় করা তোমাদের উপরে ওয়াজিব সে সব হক পুরা করে সালাত আদায় করা। যেমন ইবনে মাসউদ [রা.] থেকে আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণিত আছে যে, সালাত কায়েম অর্থ রুকু সিজদা পূর্ণ ভাবে আদায় করা, ঠিক ঠিক ভাবে কিরয়াত পাঠ করা এবং খুশু ও বিনয়ের সাথে নামাযে রত থাকা।
 ইসলামী শরিয়তে নামায কায়েম সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। তাই যাদেরকে আল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রদান করেন তাঁদের প্রথম দায়িত্ব সমাজে নামায প্রতিষ্ঠার সর্বপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এরশাদ হচ্ছে—“ তাঁরা এমন লোক যাদেরকে আমি যদি জমিনে ক্ষমতা দান করি, তবে তাঁরা নামায কায়েম করবে, জাকাত দেবে, যাবতীয় ভাল কাজের হুকুম দেবে এবং যাবতীয় অন্যায় কাজের নিষেধ করবে। [ হজ্জ- ৪১]”
আল্লাহর এ ঘোষণা সুন্দর ভাবে বাস্তবায়ন করেছেন রসুল [স.]। ‘মহানবী [স.] যখন কাউকে কোনো শহরে জনপদের শাসনকর্তা করে পাঠাতেন, তাঁকে জামায়াতের সাথে নামায কায়েম করার হুকুম দিতেন। যেমন তিনি আত্তাব ইবনে উসায়দ [রা.] কে মক্কায় শাসন কর্তা করে পাঠিয়ে ছিলেন। ওসমান ইবনে আবিল আস [রা.] কে পাঠিয়েছিলেন তায়েফের শাসনকর্তা করে। হযরত আলী, হযরত মুয়ায [রা.] এবং হযরত আবু মুসা [রা.] কে ইয়ামেনের শাসন কতার্ করে পাঠিয়েছিলেন। আমর ইনে হাযাম [রা.] কে পাঠিয়েছিলেন নাজরানের শাসন কর্তা করে। তাঁরা রসুল [স.]-এর নায়েব বা প্রতিনিধি হিসাবে জামায়াতের নামাযে ইমামতি করতেন এবং শরয়ী শাসন ব্যবস্থা তথা হুদুদ ইত্যাদি কায়েম করতেন।  রসুলের এ কর্মপদ্ধতি থেকে এটা সুস্পষ্ট যে নামায কায়েম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ।  নামায কায়েম অর্থ শুধুমাত্র নামায আদায়, নামাযের ইমামতিই নয় বরং সমাজকে এমন করে গড়ে তোলা যেন সে সমাজ নামাযকে অতি গুরুত্ব সহকারে শ্রদ্ধাভরে আল্লাহর ইবাদত হিসাবে গ্রহণ করতে রাজি হয়। আলেমদের এ বৈশিষ্ট্য বনী উমাইয়্যা ও আব্বাসীয় শাসনামলে বর্তমান ছিল। কিন্তু মুসলমানদের খেলাফত হারাবার পর আজ আলেম সমাজের অনেকেই শুধু ইমামতি করা ও নামায আদায় করাকেই নামায কায়েম বলে যথেষ্ট বলে মনে করেন। আল্লামা ইকবাল নামায কায়েমের এ ভুল ধারণা দূর করার জন্য যে কথা বলেছেন তা মুসলমান সমাজের জন্য চিন্তার অবকাশ রাখে। তিনি লিখেছেন-
“ইমাম সাহেব মসজিদে পান
নামায পড়ার অনুমতি;
মুর্খরা ভাবে দীনের আযাদী
এতেই বাগ বাগ অতি।”
আলেমদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য তাঁরা প্রকাশ্য গোপনে ব্যয় করে। কোরআনের অনুসরণ, সমাজকে সালাতমুখী করার দায়িত্ব পালন সহ মুমিনের কাছে দাবি জানায় আল্লাহ্র পথে প্রকাশ্য ও গোপনে সম্পদরাজী দান করার। ঈমানের মৌলিক দাবি মানুষের কল্যাণ সাধন। তাই মানুষের কল্যাণে গোপনে অর্থ ব্যয় যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোরআন অনুসারী সালাতমুখীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর পথে ব্যয়। এই ব্যয়কে আলোচ্য আয়াতে লোকসান ও ক্ষতিবিহীন ব্যবসার সাথে তুলনা করে ঘোষণা করা হয়েছে - ঘোষণা দিয়ে।
কোরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহর পথে ব্যয়কে ব্যবসায়ের সাথে তুলনা করে ঘোষণা করা হয়েছে “হে মুমিনগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের কথা বলবো না যা তোমাদেরকে কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করবে? তা হলো আল্লাহ ও রসুলের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করবে।”
আমাদের আলোচ্য অংশে আল্লাহ তায়ালা তাঁর পথে দানের পরিণাম সম্পর্কে ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘ইয়াজিদা হুম মিন ফাদলিহী.. ’
পরিণামে তাদেরকে আল্লাহতায়ালা তাদের সওয়াব পুরাপুরি দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশি দেবেন।
আলোচ্য আয়াতাংশে প্রকৃত খোদা ভীরুদের প্রতি দায়িত্ব বর্তায় একটি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে তারা ঈমানদার মানুষ তৈরীর কর্মসূচিতে গ্রহণ করবে কোরআনের শিক্ষাকে ব্যাপকভাবে প্রচার প্রসারের কাজ, অশ্লীল ও পাপ পঙ্কিলতা মুক্ত সমাজের মূল নামায প্রতিষ্ঠা এবং দারিদ্র বিমোচনে ইসলামের অর্থনীতি এবং শত্রæর মোকাবেলায় উপযুক্ত প্রতিরোধ গড়ার জন্য আল্লাহর পথে ব্যয়।
শিক্ষা : কোরআনের এ কয়টি আয়াতের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমাদের মাঝে যে চেতনা ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত হওয়া প্রয়োজন তা হলো -
১] বর্তমান আলেম সমাজের দায়িত্ব মহাবিশ্বের রহস্য সন্ধানে নিজদেরকে নিয়োজিত করে পৃথিবীর জ্ঞানীদেরকে অনুসরণ করে আল্লাহর ক্ষমতা ও গুণ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। তাঁদের দায়িত্ব বর্তমান বিশ্বের সভ্যতা সংস্কৃতির মোকাবেলায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের যাবতীয় ব্যবস্থা ও কলাকৌশল অবলম্বন করা এবং এই জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আল্লাহকে ভয় করে মানুষের কল্যাণে নিয়েজিত করা। আল্লাহর ভয় অন্তরে না থাকলে এ সব জ্ঞান ও প্রযুক্তি মানব সভ্যতার জন্য ধ্বংস বয়ে আনবে।
২] সমাজে কোরআনের চর্চাকে বাড়িয়ে তোলা কোরআনের বিধান অনুযায়ী সমাজকে পরিচালিত করার দৃঢ় ইচ্ছা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা আলেম সমাজের প্রতি সময়ের চিরন্তন দাবী। কারণ জ্ঞান অনুযায়ী কর্ম সাধন এটাই ইনসাফের চাহিদা।
৩] কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাহাবাদেরকে অনুসরণ করে আল্লাহর পথে দানে নিজদেরকে যেমন এগিয়ে আসতে হবে, সমাজের মানুষকে ও এর প্রতি আগ্রহশীল করে গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের হৃদয়ে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে যে এ এমন এক ব্যবসা যাতে কখনই কোন লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
আমরা যদি এ কাজগুলি সম্পন্ন করি তা হলেই আল্লাহর ওয়াদা-‘তিনি নিজ অনুগ্রহে আরো বেশি দেবেন’ তা আমরা লাভ করতে সক্ষম হব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ