রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

অভিবাদন কী, কেন ও কীভাবে : পরিপ্রেক্ষিত ইসলাম

মুহাম্মদ মুতাছিম বিল্লাহ মাক্কী : সুন্দর এ পৃথিবীতে কত বিধান, কত আদর্শ, কত মতামত, কত নীতি, কত নিয়ম; যা মানুষের কল্যাণার্থে আবিস্কৃত হয়, আবার সময়ের বিবর্তনে সমাজ থেকে হারিয়েও যায়। কোন কোন বিধান যুগের সাথে অসংগতিপূর্ণ বলে পরিত্যাজ্য হয়। কোন কোন আদর্শ অপূর্ণাঙ্গ বলে পরিবর্তিত হয়। কোন কোন নিয়ম অগ্রহণযোগ্য বলে পরিত্যক্ত হয়। কোন কোন মতামত অসম্পূর্ণ বলে অগ্রাহ্য হয়। কিন্তু এ পৃথিবীর মহান সৃষ্টিকর্তা রাজাধিরাজ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে মনোনীত একমাত্র জীবন বিধান ইসলামের মহান আদর্শ, নিয়মনীতি সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট, সর্বশ্রেষ্ঠ ও শাশ্বত চিরন্তন। যা কখনো হারিয়ে যাবার নয়। সর্বযুগের সকল সমস্যার সমাধানে সক্ষম। স্বয়ংসম্পূর্ণ; কোন সংযোজন, বিয়োজন, সম্প্রসারণ, সংকোচন, পরিবর্তন, পরিমার্জন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। সার্বজনীন; ফলে ওল্ড ভার্সন যেমন নেই, আপডেট ভার্সনও নেই। এটাই ইসলামের মহান অলৌকিকতা ও শাশ্বত-চিরন্তন মহাসত্যের পরিচায়ক। ইসলামের বিধানে এক সুপ্ত সৌন্দর্র্য বিরাজমান, দূরদর্শী চোখ ও সুন্দর মন ছাড়া সেই ¯িœগ্ধতা অবগাহন করা যায় না। ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানই কল্যাণ মিশ্রিত, সাম্য সম্বলিত। এক অপূর্ব সৌন্দর্য্যরে মহিমায় উদ্ভাসিত ও সম্প্রীতির আবহে উদ্বেলিত। সুন্দরের ধর্ম ইসলামের প্রতিটি বিধানই সৌন্দর্য্যরে পরিচায়ক। আবহমানকাল থেকে দুনিয়ার সব জাতির মধ্যে একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ হলে শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রথা চালু রয়েছে। ইসলামে এক মুসলিম অপর মুসলিমের সাথে দেখা হলে সম্ভাষণ জানানোর যে রীতি প্রচলিত আছে তা ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য্যরে প্রতীক। শুভেচ্ছা বিনিময়ের ক্ষেত্রে ইসলাম যে ভাষায় অভিবাদন জানানোর শিক্ষা দিয়ে থাকে তা সর্বোকৃষ্ট ও সর্বোত্তম রীতি।
অভিবাদন বা সম্ভাষণ এর পরিচয় : অভিবাদন বা সম্ভাষণ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো- সম্মান প্রদর্শন, বন্দনা, সালাম, অভ্যর্থনা, অভিনন্দন ইত্যাদি। আরবিতে এর প্রতিশব্দ (তাহিয়্যাহ)। আভিধানিক অর্থ হলো- জীবনের জন্য দো’আ করা। ইংরেজিতে- Greeting, Salition, Salute, Cheer, Welcome. ইসলামী পরিভাষায়- পারস্পরিক সাক্ষাতের সময় একে অন্যের জন্য কল্যাণ কামনার্থে “আসসালামু আলাইকুম” বলাকে অভিবাদন বলা হয়।
অভিবাদনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : অভিবাদনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর সূচনা হয় আমাদের আদি পিতা আদম (আ.) এর সৃষ্টির পর থেকেই। তবে এ অভিবাদন ছিল “ইসলামী অভিবাদন” অর্থাৎ “সালাম”। আদম (আ.) সৃষ্টির পর মহান রাব্বুল আলামীন তাকে ইসলামী অভিবাদন শিক্ষা দেন। এ প্রসংগে হাদিসে এসেছে- “আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.) কে স্বীয় আকৃতিতে সৃষ্টি করলেন। তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত। তাঁকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বললেন, যাও! ঐ দলটিকে সালাম দাও। তারা ফেরেশতাদের উপবিষ্ট একটি দল। তারা তোমার অভিবাদনের যে উত্তর দেন, তা তুমি মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো। কেননা তা তোমার ও তোমার বংশধরদের জন্য অভিবাদন হবে। তখন আদম (আ.) গেলেন এবং বললেন- ‘আসসালামু আলাইকুম(আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)। ফেরেশতারা জবাবে বললেন- ‘আসসালামু আলাইকাস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’( আপনার উপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক)’। রাসূল (সা) বলেন- ফেরেশতাগণ অভিবাদনের জবাবে ‘ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বৃদ্ধি করেছিলেন।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং-৬২২৭, সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-২৮৪১)
যুগে যুগে সকল নবী রাসূল ইসলামী অভিবাদন হিসেবে সালামকে ব্যবহার করেছেন। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আইয়ামে জাহেলিয়ায় লোকেরা এ অভিবাদনকে পরিবর্তন করে বিভিন্ন বাক্যে যেমন: “আনয়ামা আল্লাহ বিকা আইনান” “আনয়ামা সবাহান” প্রভুতির মাধ্যমে অভিবাদন জ্ঞাপন করতো। মহানবী (সা) এগুলো বলাকে নিষেধ করলেন এবং সালামের প্রচলনের ব্যাপারে তাগিদ দিলেন।  এ প্রসংগে ইমরান ইবনে হুসাইন বলেন:“ আমরা জাহেলী যুগে অভিবাদন হিসেবে “আনয়ামা আল্লাহ বিকা আইনান” “আনয়ামা সবাহান” বলতাম। এরপর যখন ইসলাম আগমন করলো, তখন আমাদেরকে এরূপ বলা নিষেধ করা হলো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৫২২৭)
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টিতে ইসলামী অভিবাদনের এ সংস্কৃতি ‘সালামে’র প্রথম প্রচলন আদম (আ) থেকে শুরু হয়ে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা) এর মাধ্যমে অদ্যাবধি প্রচলিত রয়েছে।
অভিবাদনের শব্দাবলী
অভিবাদনের শব্দাবলীকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। যথা:
১. অভিবাদনের সাধারণ শব্দাবলী
২. অভিবাদনের ইসলামী শব্দাবলী
অভিবাদনের সাধারণ শব্দাবলী : সাধারণ অভিবাদনের ক্ষেত্রে শুভ সকাল/ Good Morning, শুভ সন্ধ্যা/ Good Evening, আল্লাহ তোমার চক্ষুকে শীতল করুন, Good Night, Hello, Hi, ঐর  প্রভৃতি শব্দ সমূহ ব্যবহার হয়ে থাকে।
অভিবাদনের ইসলামী শব্দাবলী : অভিবাদনের ইসলামী শব্দাবলী আমরা নি¤েœাক্ত হাদিস থেকে পেতে পারি:- ইমরান ইবনে হোসাইন থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি নবী (সা) এর নিকট আসলো এবং বললো- ‘আসসালামু আলাইকুম’। তিনি তার সালামের জবাব দিলেন। অতঃপর লোকটি বসলো। তখন নবী (সা) বললেন-(এ  লোকটির জন্য) দশটি সওয়াব। অতঃপর আরেক ব্যক্তি আসলো এবং বললো- ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’। তিনি তার সালামের জবাব দিলেন অতঃপর লোকটি বসলো। তখন রাসূল (সা) বললেন- বিশটি সওয়াব। এরপর আরেক ব্যক্তি আসলো এবং বললো - ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু’।  তিনি তার সালামের জবাব দিলেন । তখন রাসূল (সা) বললেন- ত্রিশটি সওয়াব। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৫১৯৫, দারেমী, হাদিস নং-২৫২৬)
উক্ত হাদিস দ্বারা বুঝা গেল অভিবাদনের ইসলামী শব্দাবলী হলো “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু” তবে সংক্ষিপ্তাকারে আমাদের মাঝে “আসসালামু আলাইকুম” সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। ইসলামী অভিবাদনের জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে “ওয়ালাইকুম আসসালাম”  বলতে হয়। তবে উত্তম হলো সালাম প্রদানকারী যে বাক্যের মাধ্যমে সালাম দিবে সালামের জবাবদানকারী তার থেকে অধিক শব্দের মাধ্যমে জবাব দিবে। এ প্রসংগে মহান রাব্বুল আলামীন বলেন- “আর যখন তোমাদেরকে অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন প্রদান করো অথবা অনুরূপ ফিরিয়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্ববিষয়ে হিসাবগ্রহণকারী।”(সূরা নিসা, আয়াত নং-৮৬)
ইসলামী অভিবাদনের বিধান : ইসলামী অভিবাদন ‘সালাম’ ইসলামের অন্যতম শি’য়ার। সকল ওলামায়ে কিরামের ঐক্যমতে, এক মুমিন অপর মুমিনকে সালাম দেয়া সুন্নাত এবং এর জবাব দেয়া ওয়াজিব। যখন সালাম দ্বারা এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করা হয়। আর যদি সালামের দ্বারা কোন দল বা সমষ্টিকে উদ্দেশ্য করা হয় তাহলে তার জবাব দেয়া ওয়াজিবে কেফায়াহ। তবে যদি সকলেই উত্তর দেয় তা হলে অতি উত্তম।  তরে কারো কারো মতে, সালাম দেয়ার মত এর জবাব দেয়াও সুন্নাত। সালাম দেয়া সুন্নাত এ বিষয়টি রাসূল (সা) এর অগণিত হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত। আর এর জবাব দেয়া সূরা নিসার উল্লেখিত ৮৬ নং আয়াত দ্বারা ওয়াজিব হিসেবে প্রমাণিত। ইবনে কাসীর (রহ) বলেন: কোন মুসলিম সালাম দিলে উত্তর দেবে তার চেয়ে উত্তমভাবে অথবা তার মত করে। বাড়িয়ে বলা মোস্তাহাব, আর তার মতে উত্তর দেয়া ফরয।
ইসলামী অভিবাদনের ব্যবহার : ইসলামী অভিবাদন ‘সালাম’ বহু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এর ব্যবহার রীতি সংক্ষিপ্তাকারে উপস্থাপিত হলো-
১. কথা শুরু করার পূর্বে : মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশমূলক কথা-বার্তা শুরু করার পূর্বে সালাম দেয়া অপরিহার্য। মহানবী (সা) বলেছেন- “কথা বলার পূর্বে সালাম।” (জামে তিরমিযি, হাদিস নং-২৬৯৯, ইমাম তিরমিযি বলেছেন, এ হাদিসটি মুনকার হাদিস ) অপর হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সেই সর্বোত্তম ব্যক্তি যে প্রথমে সালাম দেয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৫১৯৭) বর্তমান যুগে যোগাযোগের সর্বাধিক ব্যবহৃত মাধ্যমে মোবাইলে আমরা কথা বলার সময় প্রথমে ‘হ্যালো’ বলে থাকি। যা ইসলামী সংস্কৃতির সঠিক অনুসরণ নয়। মোবাইলসহ সকল স্তরে কথা শুরু করার পূর্বে আমাদেরকে ইসলামী অভিবাদন ‘সালাম’ এর ব্যাপক প্রচলন করা উচিত।
২. সাক্ষাতের সময় : এক মুমিনের সাথে অপর মুমিনের সাক্ষাত হলে ইসলামী অভিবাদন ‘সালাম’ দিতে হয়। সালাম দেয়াকে রাসূল (সা) এক মুমিনের জন্য অন্য মুমিনের কর্তব্য বা হক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে এক মুমিনের জন্য অন্য মুমিনের প্রতি ছয়টি কর্তব্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- যখন তার সাথে সাক্ষাত হবে, তখন তাকে সালাম দিবে। (জামে তিরমিযি, হাদিস নং-২৭৩৭)
৩. অন্যের বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনার সময় : কারো বাড়ীতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনার জন্য সালাম প্রদান করার ব্যাপারে কুরআনে এসেছে- “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের বাড়ী ব্যতিত অন্য কারো বাড়ীতে অনুমতি ও সালাম প্রদান ব্যতীত প্রবেশ করবে না।”(সূরা নূর, আয়াত নং-২৭)  পরপর তিনবার সালাম প্রদানের পর অনুমতি না পেলে ফিরে যাওয়াই ইসলামী শিষ্টাচার।
৪. আগমন ও প্রস্থানের সময় : আগমন ও প্রস্থানের সময় ইসলামী অভিবাদন ‘সালাম’ দিতে হবে। আবু হুরায়রা ও যায়েদ ইবনে সাবিত (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা) বলেছেন-“যখন তোমাদের কেউ কোন সমাবেশে পৌঁছে, তখন সে যেন সালাম দেয়। যদি তথায় তার বসার প্রয়োজন হয়, তবে যেন বসে পড়ে। অতঃপর যখন সে প্রস্থানের জন্য দাঁড়ায়, তখন যেন সালাম করে। কেননা, প্রথম সালাম দ্বিতীয় সালামের চেয়ে অধিক হকদার নয়।” (জামে তিরমিযি, হাদিস নং-২৭০৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৫২০৮)
৫. নিজের বাড়িতে প্রবেশকালে : নিজের বাড়ীতে প্রবেশকালে পরিবারের সদস্যদের প্রতি ইসলামী অভিবাদন ‘সালাম’ প্রদান করা সুন্নাত। পবিত্র কুরআনে এসেছে: “যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন স্বরূপ সালাম পেশ করবে।”(সূরা নূর, আয়াত নং-৬১) আনাস (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল(সা) বলেছেন- “হে বৎস! যখন তোমার বাড়ীতে প্রবেশ করবে, তখন সালাম দিবে। কেননা, তোমার সালাম তোমার ও তোমার পরিবারের লোকদের জন্য বরকতের কারণ হবে।” (জামে তিরমিযি, হাদিস নং- ২৬৯৮)
ইশারা-ইঙ্গিতে ইসলামী অভিবাদন : হাতের তালু, আঙ্গুল বা মাথার ইশারা-ইঙ্গিতে ইসলামী অভিবাদন বা সালাম প্রদান করা বা জবাব দেয়া মাকরূহ। কেননা ইশারা-ইঙ্গিতে অভিবাদন জানানো ইয়াহুদী-নাসারাদের সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত রাসূল (সা) বলেছেন- “যে ব্যক্তি অমুসলিমদের সাথে সাদৃশ্য রাখে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।  তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদের সাথে সাদৃশ্য রাখবে না। কেননা, ইয়াহুদীরা আঙ্গুলের ইশারায় এবং নাসারাগণ হাতের তালুর ইশারায় সালাম প্রদান করে থাকে।”(জামে তিরমিযি, হাদিস নং- ২৬৯৫) সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য মুখে উচ্চারণ না করে শুধু হাতের তালু, আঙ্গুলের ইশারায় সালাম প্রদান হাদিসের ভাষ্যমতে নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ প্রয়োজনে যেমন- সালামদাতা বা জবাবদাতা কথা বলতে অপারগ হলে, বধির হলে, দ্রæতগামী বাহনে আরোহন করলে, দূরে অবস্থান করলে যেখানে সালামের আওয়াজ শুনতে পারবেনা এমন আশংকাকালীন সময়ে মুখে উচ্চারণের পাশাপাশি ইশারার মাধ্যমে অভিবাদন দেয়া জায়েজ আছে।
ইসলামী অভিবাদনের নিষিদ্ধ সময় : বিভিন্ন সময় ইসলামী অভিবাদন প্রদান করা উচিত নয়, যা মাকরূহ। যথা- প্রাকৃতিক কাজ সারার সময়, ঘুমন্ত অবস্থায়, নামাযরত অবস্থায়, গোসল খানায় গোসলরত অবস্থায়, খাবার গ্রহণের সময়, কুরআন তেলাওয়াতকালীন, খুতবা চলাকালীন, ইহরাম অবস্থায় তালবীয়া পাঠকালে, স্ত্রী সহবাসকালীন সময়।
ইসলামী অভিবাদনের পদ্ধতি : মহানবী (সা) এর হাদিস দ্বারা আমরা ইসলামী অভিবাদন ‘সালাম’ প্রদানের সুন্নাতসম্মত পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হতে পারি। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন- “আরোহী ব্যক্তি পথচারী ব্যক্তিকে, পথচারী ব্যক্তি উপবিষ্ট ব্যক্তিকে, কম সংখ্যক ব্যক্তি বেশীসংখ্যক ব্যক্তিকে সালাম দেবে।”(সহীহ বুখারী, হাদিস নং-৬২৩২/৬২৩৩, সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ২১৬০)
“ছোট বড়কে, পথচারী উপবিষ্ট ব্যক্তিকে এবং অল্প সংখ্যক অধিক সংখ্যক ব্যক্তিকে সালাম প্রদান করবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং-৬২৩১/৬২৩৪)
উক্ত হাদিস দুটির আলোকে আমরা বলতে পারি-
১. আরোহী ব্যক্তি পথচারী ব্যক্তিকে সালাম দেবে;
২. পথচারী ব্যক্তি উপবিষ্ট ব্যক্তিকে সালাম  দেবে;
৩. অল্প সংখ্যক ব্যক্তি বেশী সংখ্যক ব্যক্তিকে সালাম দেবে;
৪. ছোট বড়কে সালাম দেবে।
উপর্যুক্ত নিয়মের আলোকেই ইসলামী অভিবাদন জানানো বা সালাম দেয়া সুন্নাত। তবে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে এর ব্যতিক্রম করা দোষের কিছু নয়।  রাসূল (সা) শিক্ষাদানের লক্ষ্যে অপ্রাপ্ত নাবালকদেরকে সালাম দিতেন।
অমুসলিমদেরকে অভিবাদন ও জবাব : অমুসলিমদেরকে ইসলামী অভিবাদন ‘সালাম’ দেয়া বৈধ নয়। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন- “তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে সালাম দিওনা। আর তাদের কারো সাথে রাস্তায় সাক্ষাৎ হলে তাদেরকে সংকীর্ণ পথে যেতে বাধ্য করবে।”(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ২১৬৭) আর যদি  কোন মুসলিমকে অমুসলিম সালাম দেয় তাহলে তার জবাব আনাস (রা) বর্ণিত হাদিসের আলোকে দিবে- “রাসূল (সা) এর সাহাবীগণ রাসূল (সা) কে বললেন- আহলে কিতাবীগণ আমাদেরকে সালাম দেয় তাদের উত্তর কীভাবে দেব? রাসূল (সা) বললেন- তোমরা বলবে- ‘ওয়া আলাইকুম’। এর চেয়ে বেশী বলবে না।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ২১৬৩)
অনুপস্থিত ব্যক্তির অভিবাদন ও জবাবের পদ্ধতি : অনুপস্থিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ইসলামী অভিবাদন সালাম ও জবাবের পদ্ধতি সম্পর্কে আয়েশা (রা) এর বর্ণিত হাদিসে এসেছে- “নবী (সা) আয়েশা (রা) কে বললেন- হে আয়েশা! জিবরীল (আ) তোমাকে সালাম দিয়েছেন। আয়েশা উত্তরে বললেন- “ওয়াআলাইহি ওয়া-সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ”। (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ২৪৪৭) অপর হাদিসে এসেছে: “এক ব্যক্তি নবী (সা) এর নিকট এসে বলল: আমার পিতা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন, তিনি জবাবে বললেন- ‘আলাইকা ওয়া আলা আবীকাস সালাম’’।( মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং- ২৩৪৯২, সুনানে আবু দাউদ- ৫২৩১)
অন্যান্য অভিবাদন বনাম ইসলামী অভিবাদন : আধুনিক সমাজে আমরা নানা ধরণের অভিবাদন প্রচলিত দেখতে পাই। বহুল প্রচলিত হলো ইংরেজিতে- Good Morning, যার অর্থ হলো- শুভ সকাল। আমরা ধরে নেই সকালে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে/ টর্নেডো হচ্ছে, রাস্তাঘাটে বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ার কারণে মানুষের চলাফেরায় চরম ব্যাঘাত ঘটছে/ বাড়ী ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এমতাবস্থায় একজনের সাথে আরেক জনের সাক্ষাত হলে বলা হলো- Good Morning/ শুভ সকাল। টর্নেডো হচ্ছে/ বাড়ী ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে/ মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে/ মানুষের চলাফেরায় চরম ব্যাঘাত ঘটছে আর একে অপরকে বলছে শুভ সকাল। এখানে শুভ বলার অর্থ কী? বাস্তবতার সাথে শুভ বলার কোন মিল থাকলো কি? আবার ধরা যাক স্কুলের শিক্ষক সকালে স্কুলে আসার পূর্বে তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়েছে। হয়তো স্কুলে আসতে আসতে স্ত্রীকে অভিশাপ দিচ্ছে আর চিন্তা করছেন স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য জীবন স্থায়ী করবে না। কিন্তু তিনি স্কুলে ক্লাসে ঢুকার সাথে সাথেই শিক্ষার্থীরা সবাই মিলে বলে উঠলো Good Morning Sir/ শুভ সকাল স্যার। স্যারের সকালটি সত্যিই শুভ ছিল কী?
আমাদের তরুণ সমাজের মাঝে আরেক ধরণের অভিবাদন প্রচলিত আছে। দুই বন্ধু যখন সাক্ষাৎ হয়, তখন তারা একে অপরকে বলে “Hi”। এদেরকে জিজ্ঞাসা করলে “Hi” শব্দের অর্থ কী? তারা কেউ বলতে পারবে না। স্থানীয় হিন্দি ভাষায় এই “হাই” শব্দের অর্থ হলো আফসোস করা। ইংরেজি “High” অর্থ উপরের অবস্থান। এছাড়া এই “হাই” এর আরেক অর্থ মাদকে আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া। তাহলে এই “Hi” বলার মাধ্যমে অভিবাদন জানানো কতটা  যৌক্তিক? এ প্রশ্ন সচেতন পাঠক মহলের বিবেকের কাছে।
অভিবাদনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অভিবাদন হলো ইসলামী রীতিতে অভিবাদন, “আসসালামু আলাইকুম”।  হতে পারে সেদিন সকালে টর্নেডো হচ্ছে, মুষলধারে চরম বৃষ্টি হচ্ছে, ঘর-বাড়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বন্যায় অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে, স্ত্রীর/ সহপাঠির সাথে ঝগড়া হয়েছে। সকল অবস্থায় “আসসালামু আলাইকুম” অর্থাৎ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক”। এটাই একমাত্র সঠিক ও যথার্থ অভিবাদন পদ্ধতি বা রীতি।
উপসংহার : দুনিয়ার সব জাতি/ গোষ্ঠীর মধ্যে পরস্পরের শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রথা চালু আছে। ইসলামে পারস্পরিক অভিবাদন বা শুভেচ্ছা বিনিময়ের কল্যাণময় যে বিধান চলমান রয়েছে তা হলো “আসসালামু আলাইকুম”। যার মাঝে নিহিত রয়েছে নিরাপত্তার সুমহান ঘোষণা, কল্যাণ কামনার সমধুর বার্তা, সম্প্রীতি ও ভালবাসার অনন্য নিদর্শন, শান্তি ও শৃংখলার অনুপম দৃষ্টান্ত, ভক্তি ও শ্রদ্ধার সরব সম্ভাষণ, আদর ও ¯েœহের শীতল অভিবাদন, মঙ্গল কামনার অকপট শুভেচ্ছা। “সালাম” মহান আল্লাহ তায়ালার সুন্দর নাম সমূহের অন্যতম একটি নাম। “সালাম” আরবি শব্দ। অর্থ শান্তি, আরাম, নিরাপত্তা, আনন্দ। ইসলাম, মুসলিম ও সালাম এ তিনটি শব্দের উৎপত্তি এক ও অভিন্ন। আমাদের সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুযায়ী আজকাল কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে হ্যায়-হ্যালো দিয়ে অভিবাদন জানায়। আমাদের উচিত পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সালাম দিয়ে কথা শুরু করা। শুধু সাক্ষাতেই নয়, ফোন, মোবাইল, ফেসবুক, ই-মেইলসহ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কথা বলা বা পত্রালাপ করার সময় সালাম দিয়ে কথা শুরু করা মুসলিম হিসেবে নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। হ্যায়-হ্যালো ইত্যাদি পশ্চিমা সংস্কৃতি বর্জন করা উচিত। কেননা সালামের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, হৃদ্যতা, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সাম্য, মৈত্রী, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা সৃষ্টি হয় এবং অন্তর থেকে বিদুরিত হয় অহংকার, কৃপনতা, লৌকিকতা, প্রদর্শনেচ্ছার মতো মানবিক দূর্বলতা।
লেখক : অধ্যক্ষ, নিবরাস ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ