শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

হার্টের রিং বাণিজ্য: কর্তৃপক্ষের তদারকি চাই

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মানুষের চিকিৎসা নিয়ে এক শ্রেণির চিকিৎসক ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহকারী বাণিজ্য করেন। রোগীদের সেবা নয়, বাণিজ্যই তাদের মুখ্য হয়ে পড়ে বলে একটি ঐতিহ্যবাহী দৈনিকে গত বৃহস্পতিবার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। হার্টের রিং যারা আমদানি করেন, তাদের লক্ষ্য কিছুটা হলেও বাণিজ্য থাকেই। যেহেতু চিকিৎসাসামগ্রী আমদানি করতে অর্থবিনিয়োগ করতে হয়, তাই সেখান থেকে কিছু মুনাফা করাটা অযৌক্তিক কেউ ভাবেনও না। তবে মরণাপন্নের সেবা উপেক্ষা করে বাণিজ্যই প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হওয়া শুধু অনাকাক্সিক্ষত নয়, অমানবিকও। দুর্ভাগ্যবশত হার্টের রিং আমদানিকারক ও সরবরাহকদের সঙ্গে এক শ্রেণির কসাই চিকিৎসকও জোট বেঁধে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে দৈনিকটির রিপোর্টে প্রকাশ। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় শ’খানেক রোগীর হার্টেঙ রিং বসানো হয়। উল্লেখ্য, হার্টের রোগীদের জীবন রক্ষার্থেই স্টান্টিং বা রিংস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে। সম্প্রতি রিংয়ের এমআরপি বা নির্ধারিত মূল্য ওষুধ প্রশাসন ঠিক করে দেয়। রিংয়ের গায়ে এমআরপি উল্লেখ করে দেবারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু এর প্রতিবাদে প্রায় ৫০টির মতো হার্টের রিং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ধর্মঘট ডেকে হাসপাতালে রিং সরবরাহ বন্ধ রাখে। ফলে হার্টের রোগীদের চিকিৎসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ডাক্তাররা জানান, গত মঙ্গলবার হাসপাতালের স্টক থেকে মাত্র ৫০ জন রোগীর রিং স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, চিকিৎসকদের যোগসাজশে নি¤œমানের রিং বসানো হয় রোগীদের হার্টে। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই ইনফেকশন দেখা দেয়। তাই আবারও অপারেশন করে রিং বসাতে হয়। এতেও সুফল না পেলে দেশের বাইরে রিং বসাতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে। বাইরের ডাক্তাররা জানান, নন মেডিকেটেড রিং বসানোর ফলেই বার বার ইনফেকশন দেখা দেয়। নন মেডিকেটেড রিংয়ের দাম কম। একশ্রেণির ডাক্তার ও সরবরাহকারীর গোপন যোগসাজশে  হার্টে নন মেডিকেটেড রিং বসিয়ে মেডিকেটেড রিংয়ের দাম নেয়া হয়। এই দুই নম্বরির বিষয়টি ডাক্তার ও সরবরাহকারী ছাড়া অন্যদের জানবার কথাও নয় খুব সহজে। আমাদের কী দুর্ভাগ্য যে, একশ্রেণির ডাক্তারও মরণাপন্ন রোগীদের হার্টে কমিশনের লোভে নন মেডিকেটেড রিং বসিয়ে তাদের জীবন আরও বিপন্ন করে তুলতে পারেন। অথচ এই ডাক্তাররা জনগণের করের টাকায় পরিচালিত মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করেন। তারা যে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন, সেখানেও জনগণের করের টাকায় খরচ হয়। অথচ তারা মরণাপন্ন রোগীর হার্টে নকল বা নি¤œমানের রিং বসিয়ে দেন এবং সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কমিশন গ্রহণ করেন। এই যদি হয় চিকিৎসকের মানসিকতা তাহলে আমাদের দুঃখের সঙ্গে লজ্জায় মাথানত করে দেয়া ছাড়া আর কী করবার থাকতে পারে। আমরা জানি না, মানুষের বিপন্নতাকে মূলধন করে ডাক্তার ও ব্যবসায়ীদের অর্থোপার্জনের হীন মানসিকতার অবসান কবে হবে!
শুধু হার্টের রোগীদের রিং স্থাপন নিয়েই এমন অনিয়ম চলছে না। চিকিৎসাক্ষেত্রের আরও অনেক অংশে এমন অনিয়ম আর অরাজকতা বিরাজ করছে। যে রোগের চিকিৎসা দেশের হাসপাতালে সম্ভব, তার জন্য যেতে হচ্ছে বিদেশ।
ব্যয় হচ্ছে রোগীদের কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা প্রাইভেট ক্লিনিক খুলে বসেছেন। ঠিকমতো তাদের হাসপতাালে পাওয়া যায় না। আর পাওয়া গেলেও বিভিন্নভাবে রোগীদের প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা করানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থা নিরসনে কর্তৃপক্ষের তদারকি জরুরি। অন্যথায় চিকিৎসাক্ষেত্রের অনিয়ম আর জিম্মিদশা থেকে রোগীদের নিষ্কৃতি দেয়া প্রায় অসম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ