বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কপোতাক্ষের তীরে প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠেছে ‘মিনি সুন্দরবন’

খুলনা অফিস : খুলনার কয়রা উপজেলার সর্ব পশ্চিমে কপোতাক্ষের তীরে প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠেছে ‘মিনি সুন্দরবন’। এক শ্রেণির সুবিধাবাদি মহল এ সব গাছ কেটে লবণ চাষ ও ফুটবল খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নিলেও এলাকাবাসীর হস্তক্ষেপে সে অপচেষ্টা রোধ করা হয়েছে। গোবরা গ্রামের পাশে কপোতাক্ষের তীরে দীর্ঘ আঠার বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা হয়েছে ছোটখাট একটা সুন্দরবন। গ্রামবাসীদের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৃতির দান দু’এর সমন্বয় বনটি। সুন্দরবন থেকে চারা তুলে দফায় দফায় রোপণের পর বনটি আজ কয়রার অন্যতম অবকাশ যাপনের স্থানে পরিনত হয়েছে। বন তৈরি আর এর সংরক্ষনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে কয়রার মানব কল্যাণ ইউনিট নামক একটি সেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন। কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. বদিউজ্জামান ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামসের আলী এ বনায়নে পাখির অভয়ারন্য তৈরির লক্ষ্যে গাছে মাটির খোপও বেঁধে দিয়েছেন।
মানব কল্যাণ ইউনিট সভাপতি আল আমিন ফরহাদ বলেন, আমরা বন্যপাখির আবাসস্থল তৈরিতে সহোযোগিতার জন্য এ বনে মাটির খোঁপ দেয়ার উদ্যোগ নেই। ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এ কাজে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।
স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একশ্রেণির অসাধু লোক সেখানে বন কেটে লবণের মাঠ বানানোর উদ্যোগ নেয়। এছাড়াও বনের ভেতর গাছ কেটে ফুটবল খেলার মাঠ তৈরিরও উদ্যোগ নেয় অপর একটি মহল। তবে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেটি বন্ধ হয়। এখন খেলা আর অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রকে ছাড়িয়ে সব শ্রেণির মানুষের বিনোদনের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে ওই এলাকাটি।
এলাকাবাসী জানায়, গোধুলীর আলো যখন সুন্দরী, কেওড়া ও বাইন গাছগুলোর মাথার ওপর আছড়ে পড়ে তখন আবীর আর সবুজের মাখামাখিতে মুগ্ধ হতে হয়। ভর দুপুরে বলাকা, ঘুঘুসহ নাম না জানা অসংখ্য পাখপাখালীর বিশ্রাম নিকেতন। সবুজের নিত্য শ্বাস-প্রশ্বাস, পাখির কিচিরমিচির, দখিণা বাতাসে কেওড়া-বাইন-সুন্দরী পত্রপল্লীরের নয়নাভিরাম নৃত্য হৃদয়ে দোল দিয়ে যায়। সর্বদাই দুর্যোগ প্রবন এলাকা হিসেবে পরিচিত কয়রা উপজেলাকে রক্ষা করে চলেছে এ সব গাছ-গাছালি। মাত্র দেড় যুগের মধ্যেই প্রায় তিন মাইল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে এটি। তাই স্থানীয় মানুষ এটাকে নাম দিয়েছে ‘মিনি সুন্দরবন’।
গোবরার মিনি সুন্দরবন ধ্বংসের উদ্যোগ এর পূর্বেও কয়েক বার নেয়া হয়েছে। প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অপরূপ ম্যানগ্রোভ বনের একেবারে শৈশব কালেই একবার গলাটিপে হত্যার ব্যর্থ প্রয়াস চালায় বিসিক। ২০০০ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে এখানে গাছ কেটে লবণের মাঠ বানাবার উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয় লোকজন, কয়রার সুশীল সমাজ, প্রশাসন সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় লবণের মাঠ বানাবার সেই তোড়জোড় ভন্ডুল হয় শেষমেশ। সে সময় এই বন রক্ষায় এগিয়ে আসেন কয়রা মানবাধিকার জোটের সভাপতি প্রভাষক আ ব ম আব্দুল মালেক, থানা নির্বাহী কর্মকর্তা শামিমুল হক সিদ্দিকিসহ অনেকে। কয়রা মানবাধিকার জোট গোবরার বন রক্ষায় সাংবাদিক সম্মেলনও করে কয়রা প্রেসক্লাবে। সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও নদী ভাঙন থেকে কিভাবে এই ছোট্ট বনটি পুরো সদর ইউনিয়নকে সুরক্ষা দিচ্ছে তার চিত্রও তুলে ধরা হয় সাংবাদিক সম্মেলনে।
এরপর দুই বছর আগে গোবরা গ্রামের ‘বন্ধন তরুণ সংঘ’ ফুটবল খেলার মাঠের জন্য পুনরায় বন সাফাইয়ের চেষ্টা চালায়। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের হস্তক্ষেপে সে প্রচেষ্টা রোধ করা হয়। এ হস্তক্ষেপ না হলে হয়তো-অদ্ভুত হইচই, গোল আর চার-ছক্কার চিৎকারে চাপা পড়ে যেত সকাল-সন্ধ্যা পাখির নিত্য কলতান।
কয়রা মানবাধিকার জোটের সভাপতি প্রভাষক আ ব ম আব্দুল মালেক বলেন, বনটি ধ্বংস করতে প্রভাবশালী মহল একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে স্থানীয় জনগণের প্রচেষ্টা রোধ করা হয়েছে।
এ বনের গুরুত্ব তুলে ধরে কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বদিউজ্জামান বলেন, এ বনটি প্রকৃতির দান। এখানকার এ অংশটি ভাঙন কবলিত এলাকা। গাছ-গাছালি গড়ে ওঠায় আগের মত আর ভাঙন নেই। এখানে যাতে আরও গাছ গাছালি গড়ে ওঠে সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ