বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পহেলা বৈশাখ তুমি কার?!

ফরিদা খানম ফাতিহা : বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখ। বছরের প্রথম দিন তথা নববর্ষকে বাঙালিরা বিশেষ উৎসবের সাথে পালন করে। শুধু বাংলাদেশে নয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরা এই উৎসবে অংশ নেয়। তাই এটিকে বলা হয় বাঙালিদের সার্বজনীন উৎসব। কারণ এইদিনে বিশ্বের সকল প্রান্তের সকল বাঙালিরা নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীতের সকল দুঃখ গ্লানি। কিন্তু এই ভুলে যাওয়ার সাথে সাথে বাঙালিদের ভুলিয়ে দেওয়া হয় এর পিছনের সত্যিকার ইতিহাসকে। প্রতিটি দিবসের পিছনের চেতনা নিয়ে নানারকম ঝাঁঝালো বক্তব্য আমরা মিডিয়াতে শুনি। কিন্তু কোন এক রহস্যময় কারণে এই দিবসে শুধু বাঙালি সাজার কথা শুনি, অসাম্প্রদায়িকতার চেতনার আহ্বান শুনি, কিন্তু এর কারণ আমরা কেউ জানতে চায়না। আমাদের বুদ্ধিজীবীরাও সে কথা কইতে নারাজ, পাছে সত্য না জেনে যায়!
বাঙলা সন এর প্রচলন করেন ‘স¤্রাট আকবর’ বাঙালি মুসলমানরা এটিকে খুব গর্বের সাথে বলেন। কিন্তু কোন আরবি বা ইংরেজি সনের সাথে মিলিয়ে নয় তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে ‘হিন্দু সৌর পঞ্জিকা’ অনুযায়ী এ বছর গণনা শুরু হয়। সৌর বছরের প্রথম দিন তথা গ্রেগরীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়– এবং ত্রিপুরায় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত। যদিও স¤্রাট আকবর প্রথমে ১৫৮৪ সালের ১০ই মার্চকে ফসল উত্তোলনের সময় হিসেবে ফসলি সন হিসেবে ঘোষণা দেন কিন্তু সেটিকে মেনে নেয়নি হিন্দু জমিদাররা। কারণ চৈত্র সংক্রান্তির সাথে তাদের খাজনা আদায়ের একটি ব্যাপার ছিল। কিন্তু বৈশাখ মাস চিরকালই বাঙালি গরিব কৃষকদের জন্য কষ্টের মাস ছিল। কারণ রোদের তাপে মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যেত। কৃষকের শূণ্য চোখ চেয়ে থাকতো আকাশপানে। গ্রামের বউ-ঝিদের বৃষ্টির গানে সে কষ্টের কথা ভেসে আসে “হালের গরু বাইন্দা, কৃষক মরে কাইন্দা, কৃষকের বউ বইসা রইছে ডাল খিচুড়ি রাইন্দা।” অন্যদিকে খাজনা দেয়ার চাপ, যেটি ছিল সূর্যাস্ত আইনের মতো। সেই আতংকের কথা আমরা এখনো শুনতে পায় ঘুম পাড়ানি গানের মাঝে- “ধান পুরালো, পান পুরালো, খাজনার উপায় কী? আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি।” তবুও এই পহেলা বৈশাখকে সার্বজনীন বলা হচ্ছে। অথচ এটি নির্যাতিত কৃষকের গুমরে পড়া চোখের জল, আর নির্বাক হাহুতাশের ইতিহাস।
আজকে ঘটা করে যে দিবস পালিত হচ্ছে অতীতে সেটি ছিলনা। ১৯১৭ সালে প্রথম পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর হোম কীর্ত্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩৮ সালেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে তৎকালীন হিন্দু জমিদারেরা এ দিবস পালন করেছিল, ১৯৬৭ সালের আগে এ দিবস পালনের ইতিহাস পাওয়া যায়না।
বর্তমানে পহেলা বৈশাখে যে উৎসব হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো- রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, ব্যবসায়ীদের হালখাতা, সকালে উঠে পান্তা-ইলিশ খাওয়া, লাল পেড়ে সাদা শাড়ী বা সাদা-লাল ধূতি পাঞ্জাবী পড়ে, পেঁচা-হনুমান,বাঘ সহ নানা প্রাণীর মচ্ছবে সেজে, সকালবেলা সূর্য উঠার সাথে শাঁখ বাজিয়ে, উলু ধ্বনি দিয়ে, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে বর্ষবরণ করা ইত্যাদি। যদিও ২০বছর আগেও এই আয়োজনগুলো মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল। এই উৎসবগুলোর আবিষ্কার সাম্প্রতিক সময়ের তবে এটা বলতেই হয় এর পিছনে রয়েছে এক স্বার্থবাদী সচেতন মহল।
পহেলা বৈশাখে পালিত হওয়া আয়োজনগুলোর ইতিহাস ও অবস্থান সার্বজনীন উৎসবের নামে শুধু একটা নির্দিষ্ট গুষ্ঠীকে উপস্থাপন করে যাচ্ছে। যেমন: হিন্দুরা সূর্য দেবতার আরাধনা করে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালায়, অশুভ শক্তিকে দূর করতে তারা পেঁচার প্রতিচ্ছবি ব্যবহার করে, লাল-সাদা রং তাদের নিজস্ব ধর্মীয় রং, প্রতিটি মেলা হতো কোন না কোন দেবতার স্মরণে কিন্তু এটিকে এখন বাংলাদেশের ৯০% মুসলমানদের সার্বজনীন উৎসব বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ এই আয়োজনের সাথে বাংলাদেশের মুসলমানদের কোন সম্পর্ক নেই। মঙ্গল শোভাযাত্রা কে ইউনেস্কো সম্প্রতি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। আমরাজানি যে মঙ্গল শোভাযাত্রা অতীত বাঙলার কোন বর্ষবরণের অংশ ছিলনা। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রথম এটি পালন করে। এখানে পেঁচা, হনুমান, বাঘ, হাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর যে ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি ব্যবহার করা হয় তা দেখে কখনো এটিকে সুস্থ সংস্কৃতি বলা যায়না। এবার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রা পালন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সংস্কৃতি হবে সুস্থ ও সুন্দর, মানুষ মন থেকে সেটি পালন করবে, যদি সেটি চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেটিকে উদ্দেশ্যমূলক বলা কী দোষের?
ইলিশের মৌসুম না হয়েও পান্তা-ইলিশ হয়ে গেছে এই দিনের এক বিশেষ আয়োজন। ইলিশের মৌসুমে এখন ইলিশ পাওয়া যায়না, কারণ অসাধু ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে বেশি দামে ইলিশ বিক্রির আশায় গুদামজাত করে রাখে। পহেলা বৈশাখে ইলিশ বিক্রি হয় স্বাভাবিক দামের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি দামে। গরিবরাতো দূরের কথা কোন মধ্যবিত্ত পরিবারের ইলিশ কেনার সামর্থ্য নেই। ঐদিনে নামে বেনামে খাবার দোকান তৈরি হয়, ইলিশ-পান্তা বিক্রি হয় চড়া দামে। যে ইলিশের সাথে ৮০% বাঙালির কোন সম্পর্ক নেই তা কি করে বাঙালি জাতির সার্বজনীন উৎসবের অংশ হতে পারে?! অথচ এই পান্তা ভাত কোন উৎসব হিসেবে নয়, এই পান্তা ভাতের সাথে মিশে আছে বাঙলার নিরীহ গরিব কৃষকের চোখের জল।
পহেলা বৈশাখে মেয়েদের লাল-সাদা শাড়ির পাশাপাশি ছেলেদের ধূতি পাঞ্জাবি পরতে দেখা যায়। মুসলিম বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে ধূতি পাঞ্জাবি পরাচ্ছেন। ধূতি, লাল-সাদা শাড়ি কাদের পোশাক এটি আমাদের কাছে একেবারে পরিস্কার। বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতেও এই দিন নিয়ে সাজ্ সাজ্ রব পড়ে যায়। কে কাকে ছাড়িয়ে কত সুন্দর অনুষ্ঠান প্রচার করবে, আরো কতটা ভোগবাদী-খাদক সমাজ তৈরি করা যায় এনিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেয়ার নামে ভিন্ন ধর্মের আদলে ৯০% মুসলিমের ঈমানের উপর মিথ্যে প্রলেপ দিতে বদ্ধপরিকর এই গণমাধ্যমগুলো। অধুনা-নকশায় থাকা নামী-দামী পোষাক, সাজসজ্জা আর খাবারের বিজ্ঞাপনে লাভবান হচ্ছে স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে বর্ষবরণের উৎসবে তরুণীদের শ্লীলতাহানি নিয়ে চলছে নোংরা রাজনৈতিক খেলা। কে তরুণীদের আক্রমণ করলো, কে বাঁচালো এ নিয়ে চলছে একদলের প্রতি অন্যদলের কাদা ছুড়াছুড়ি।
শান্তি প্রিয় বাঙালীদের সংস্কৃতি-সভ্যতা কী আদৌ এমন ছিল। নাকি এটি নতুন মোড়কে তৈরি হওয়া ভিন্ন কিছু?!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ