বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ইন্টারনেটের বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং ....

সাইয়েদা সুরাইয়া : ২০০৬ বা ০৭ রমযান মাস, মিরপুর ন্যাম গার্ডেনে একটি ইফতার পার্টিতে আমি ও আমার মেঝ ভাবি এসেছি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী সচিবের বাসায় ইফতার পার্টি। বোন জান্নাতুস শালিমা শিউলী আমাকে দায়িত্ব দিলেন, আমি যেন এখানে লায়লাতুল কদরের ওপরে দারস পেশ করি। তিনি নিজে ইফতার পার্টি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। এখানে প্রধান দায়িত্বশীলা বোনের আলোচনার বিষয় ছিল, “মহাগ্রন্থ আল-কুরআন কেন নাযিল হয়েছিল?” আমার আলোচনার পরে জয়েন্ট সেক্রেটারির ওয়াইফ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসরকে একটি হাদীসের ওপর আলোচনা করতে দেয়া হলো।
আলোচনার বিষয় ছিল- ইসলামে নারীর মর্যাদা। বুখারী শরীফ থেকে এ সম্পর্কিত একটি হাদীস বাছাই করে ম্যাডাম আলোচনা শুরু করলেন। হঠাৎ উৎকর্ণ হলাম। তিনি বলছেন- “একবার হজ্জের সময় একজন মেজর নাকি এই তথ্য তাকে দিয়েছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর স্ত্রী হাজেরা (রাঃ)-এর গায়ের রঙ কালো থাকায় কা’বা ঘরের গিলাফের রঙ কালো হয়েছে আবার কা’বা ঘরের ভেতরে হাজেরা (রাঃ) কবরও রয়েছে।”*১
পরে বললেন, “দেখেন! ইসলাম নারীকে কতখানি মর্যাদা দিয়েছে- হযরত হাজেরা (রাঃ)-এর সম্মানে কা’বা ঘরের গিলাফের রঙ কালো করা হয়েছে*২ আবার কা’বাঘরেই তাকে কবর দেয়া হয়েছে।” আমি উপস্থিত সবার প্রতি তাকাচ্ছি, কেউ কিছু বলছে না, সবাই নীরব। আমি ভাবলাম উনি যেই হোন না কেন এখানে আমার চুপ থাকা চলবে না। ঈমানের দাবি এখানে অপ্রিয় সত্যকে তুলে ধরা। আমি বললাম, আপা এখানে আমার আপত্তি আছে, আমি কথা বলবো, আমাকে সুযোগ দিন। উনি বললেন, “ঠিক আছে আপা বলুন” আমি আগে চিন্তা করে নিয়েছি, এ মুহূর্তে দু’টি বিষয় নিয়ে কথা বলা যাবে না। একটি বিষয়কে টার্গেট করে কথা বলতে হবে। আর সেটা হচ্ছে কা’বাঘরে হাজেরা (রাঃ)-এর কবর প্রসঙ্গ।
বললাম, আপা ইসলাম বিশ্বের বুকে এসেছে মূর্তিপূজা উচ্ছেদ করে, এক আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করে তাঁরই ইবাদাত করার জন্য। আপনি কি মনে করেন সারা বিশ্বের শত কোটি মুসলমান, যে কা’বাঘরকে কিবলা করে নামায পড়ে তারা একটি কবরকে কিবলা বানিয়ে তার সামনেই সিজদায় অবনত হয়? এই যে প্রতিদিন কা’বাঘরকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ মুসলমান তাওয়াফ করছে, তারা সবাই কি একটি কবরকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করে থাকে?
উনি একজন ভালো মনের মহিলা ছিলেন। তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে শান্তভাবে বললেন, “আপা এ তথ্য তো ইন্টারনেট থেকে এসেছে?” আমি বললাম, ইন্টারনেট ভুল তথ্য দিয়েছে। তবে হ্যাঁ এটা বলতে পারেন, হযরত হাজেরা (রাঃ)-এর সম্মানে আল্লাহ্ তা’য়ালা সাফা মারওয়ায় সায়ী করা চিরকালের জন্য মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব করে দিয়েছেন। এখানে আমারও একটি ভুল ছিল। আপা প্রশ্ন করেছিলেন, “তাহলে আপা হাজেরা (রাঃ) কবর কোথায়?” তড়িঘড়ি উত্তর দিলাম সিরিয়ায়। পরে নিজেই নিজেকে অনেক বকেছি। আসলে হাজেরা (রাঃ) কবর তো মক্কায়ই হওয়ার কথা। সেইদিন ছাড়া ঐ ম্যাডামের সাথে আমার আর কখনো দেখা হয়নি। যাইহোক, একপর্যায়ে আপা উপস্থিত মহিলাদের উদ্দেশে বললেন, “বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে রইলো। আপা বলছেন হাজেরা (রাঃ)-এর কবর কা’বাঘরে নেই, তবে আল্লাহ্ তা’য়ালা যে হাজেরা (রাঃ) সম্মানে সাফা মারওয়ায় সায়ী করা ওয়াজিব করেছেন এটা ঠিক।” ইফতার পার্টি শেষে সবাই চলে যাচ্ছেন। ম্যাডাম উঠে এসে দু’হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, প্রশ্ন করলেন, “আপনার বাসা কোথায়?” আমি তখন নরসিংদীতে থাকি, উত্তর দিলাম আমি মিরপুর ১৩ নং ২২ টেকি ভাইয়ের বাসা থেকে এখানে এসেছি। ভাবীকে দেখালাম। লিফটে একসাথেই নামছি, ওখানেও একই প্রশ্ন করলেন, “আপনার নিজের বাসা কোথায়?” বিব্রতকর অবস্থা। আমি তো তখন ঢাকায় থাকি না। উনি ঢাকায় আমার বাসা কোথায় তা জানতে চাচ্ছেন। চমৎকার মহিলা সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেয়ার মানসিকতা তার আছে। অনেক গলাবাজদের মতো প্রতিষ্ঠিত সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার মতো মহিলা তিনি নন। যদিও বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে রইল, বলেছেন। তারপরও আমার বিশ্বাস উনি সত্য জানার জন্য অবশ্যই এই বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। ইহুদীবাদীরা ইসলাম ধর্মের মূল বুনিয়াদের বুকে ছুরি চালাতে ইন্টারনেটে এমনি ধরনের বাজে তথ্য দিচ্ছে, যাতে সহজ-সরল মুসলমান বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। আমাদের মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে, যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তারা যেন এসব অপপ্রচার রোধ করার জন্য পদক্ষেপ নেন।
ইদানীং ফেসবুকে একটি তথ্য হিন্দুরা দিয়েছে যে, এক মুসলিম মেয়ে নাকি তার মাযহাব বদল করে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছে!!! যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তা হবে একটি বিরল ঘটনা! স্বেচ্ছায় কোনো মুসলিম পুরুষ বা নারী ইসলাম থেকে বের হয়ে হিন্দু-খৃস্টান বা অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করেছে এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। এ বিষয়টি কতখানি সত্যি তা আমরা জানি না। ফেসবুকে লেখাটি আমি নিজে পড়েনি- শুনেছি। এতে অনেক মুসলিম সন্তান ক্ষিপ্ত হয়ে নাকি বাজে মন্তব্য ও গালিগালাজ করছে। আমরা তাদের বলবো নিজেদের ব্যর্থতার দায়ভার নিজেদের স্কন্ধে নিয়ে ঈমানিক চেতনায় বলীয়ান হয়ে ওদের মোকাবিলা করুন শালীন ভাষায়। যুক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে ইসলামের সত্যিকারের রূপ তাদের সামনে তুলে ধরুন।
আদর্শিক বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হবে জেনে বুঝে ঠান্ডা মাথায়। উত্তেজিত হয়ে গালিগালাজ করে নয়। ইসলামকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে, নিজস্ব সততা আর ন্যায় নিষ্ঠার মাধ্যমে। ইসলাম থেকে যারা মানবম-লীকে দূরে রাখতে চায়, তারাই কটূ বাক্য ব্যবহার করে অপরের ধর্ম ও উপাস্য নিয়ে কটাক্ষ করে থাকে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম এসেছে বিশ্বের বুকে মানবজাতিকে একই সমতলে একতাবদ্ধ করে এক আল্লাহ্কে উপাস্য মেনে নিয়ে; তারই ইবাদত করার জন্য, যেখানে থাকবে না জাতপাত আর সাদা-কলোর ব্যবধান। এ পথে চলতে হলে মুসলমানদের অবশ্যই বিশ্বনবী (সাঃ)-এর দেখানো ও শেখানো পথে চলতে হবে। ইসলাম একমাত্র মুসলমানদেরই পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এখানে রয়েছে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “আমাকে পাঠানো হয়েছে শিক্ষক হিসেবে” কাজেই তাঁর দেখানো ও শেখানো পথেই, মানুষ পাবে দুনিয়ায় শান্তি আর আখিরাতে মুক্তি। তিনি মানুষের সাথে মিশেছেন, তাদের একজন হয়েই শান্তির বাণী প্রচার করেছেন।
একবার একজন অমুসলিম লোক রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সামনে এসে ভয়ে কাঁপতে থাকলে, রাসূল (সাঃ) তাঁর হাত ধরে বললেন, “ভয় পেও না আমি তোমাদের মতোই মানুষ। আমি তো এমন এক নারীর সন্তান যে, শুকনো রুটি ও শুকনো গোস্ত খেতেন।”
ইহুদী-খ্রিস্টান অথবা হিন্দু যারাই ইসলামকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে বাজে তথ্য সরবরাহ করে তাদের এ তথ্যের বিরুদ্ধে যুক্তি বুদ্ধি এবং নিজস্ব প্রজ্ঞাকে কাজে লাগাতে হবে; ওদের এই অসৎ মনোবৃত্তিকে সৎচিন্তা চেতনায় ফিরিয়ে আনার শুভ মনোবৃত্তি নিয়ে।
*১. হাজেরা (রাঃ) গায়ের রং কালো ছিল না, থাকলে সবার আগে বাইবেলই তা বলতো। এ তথ্য ইন্টারনেটে যারা দিয়েছেন তারা এটা কোথা থেকে পেয়েছেন তা আমাদের জানা নেই।
*২. কা’বাঘরে প্রথম গিলাফ পরিয়েছেন ইয়ামানের রাজা হাসান ইবনে তুব্বান। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্মের তিন চার পুরুষ আগে স্বপ্নে দেখে কাবাঘরে মোটা কাপড় দিয়ে গিলাফ পরিয়েছিলেন। পরে আবারও স্বপ্নে দেখেন আরো ভালো কাপড় দিয়ে যেন কা’বাঘরে গিলাফ পরানো হয়। তিনি তা করেন। কা’বাঘরে কালো কাপড়ের গিলাফ পরানো হয় তুরস্কের উসমানীয় খলিফাদের আমলে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ