বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সকল অপসংস্কৃতিকে বর্জন করি ....

মোমতাহানা সুরভি : দেখতে দেখতে বাংলা সনের নতুন বছরের প্রথম মাস বৈশাখকে বরণ করা শেষ হয়ে গেল। ব্যাপক আড়ম্বরতার সাথে গত কয়েক বছর ধরে পহেলা বৈশাখ পালিত হচ্ছে দেশ জুড়ে। পান্তা ইলিশের প্রস্তুতি, লাল-সাদা পোশাক কেনা, বৈশাখী মেলার আয়োজন, নাটক, গান, কনসার্ট, টিভি চ্যানেলগুলোর ব্যাপক আয়োজন সবকিছু মিলিয়ে প্রতিটি মানুষকেই বৈশাখের আগমনে আন্দোলিত করার এক মহা ব্যস্ততা ছিল চারদিকে। এর প্রভাব থেকে দূরে থাকা সত্যিই কষ্টকর। বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি চর্চার কোন উদ্যোগ নিন্দনীয় নয়, কিন্তু পহেলা বৈশাখ উদযাপনের যাবতীয় সংস্কৃতি আমাদের দেশের মানুষের প্রকৃত আদর্শ, সংস্কৃতির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও কল্যাণকর এটা একটু বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন -
পহেলা বৈশাখ উদযাপন: আসলেই কি দেশীয় ঐতিহ্য : পহেলা বৈশাখের ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাই, খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মোঘল সম্রাট আকবর হিজরীর পাশাপাশি বাংলা সনের প্রবর্তন করেন এবং অগ্রহায়ণের পরিবর্তে বৈশাখ থেকে বর্ষ গণনা শুরু করেন, সেই সাথে ব্যবসা বাণিজ্যে বছরের শেষ দিন চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপনের রীতি এবং লাভ-লোকসানের হিসাব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা হালখাতা খোলার রীতি থেকেই পহেলা বৈশাখের উদযাপনের সূত্রপাত অর্থাৎ বাণিজ্যিক কারণ, খাজনা আদায়ের বিষয়টিকে উপজীব্য করে পহেলা বৈশাখের সূত্রপাত।
এখানে একটু খেয়াল করা প্রয়োজন, কৃষি প্রধান এই বাংলার চৈত্র বৈশাখ ছিল দুঃখের মাস, অভাবের মাস। কৃষকদের ঘরের খাবার ফুরিয়ে যেত এই মাসগুলোতে। অভাব পীড়িত কৃষকদের উপর জমিদারদের চলতো খাজনা আদায়ের জন্য নানানরকম অমানবিক অত্যাচার। এদেশের মুসলিম দরিদ্র কৃষক শ্রেণীর কাছে এই পহেলা বৈশাখের কোন বিশেষত্ব ছিলনা। অপরদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী পূজার আচার অনুষ্ঠানের কারণে তাদের মাঝেই এই উৎসব পালনের আড়ম্বরতা পরিলক্ষিত হতো। তিন দশক আগে পটুয়া কামরুল হাসান নিজে ঢোল বাজিয়ে গ্রামীণ মেলার আদলে প্রথম বাংলা একাডেমীর চত্বরে বৈশাখী মেলা শুরু করেন। সেই থেকে পহেলা বৈশাখের আনুষ্ঠানিক পদযাত্রা শুরু। আজকের দিনে পহেলা বৈশাখের যে আচার- অনুষ্ঠান আমরা দেখছি, তা কোন সুপ্রাচীন ঐতিহ্য নয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য, বাণিজ্যিক স্বার্থ, মুক্তমনা কিছু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের দেশীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি চর্চার তথাকথিত দিবসকেন্দ্রিক উদ্যোগ এসবই আজকের পহেলা বৈশাখের যাবতীয় আচার-অনুষ্ঠানের মূল ভিত্তি।
এবারে পহেলা বৈশাখের প্রচলিত কিছু সংস্কৃতির যথার্থতা নিরূপন করা যাক-
লাল-সাদা পোশাক : কোন রঙ্গে নিজেকে রাঙ্গাচ্ছি আমরা : পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম কালচার হচ্ছে নতুন পোশাক কেনা। ছোট-বড়, তরুণ-বৃদ্ধ সবার মাঝেই আজ নতুন পোশাক কেনার ধুম পড়ে যায় এখন পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে। ঈদের পর সম্ভবত এই উৎসবেই সবচেয়ে বেশি নতুন পোশাক নেয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয় এদেশে। আর এই পোশাকের রং অবশ্যই হতে হবে লাল-সাদা। একটু যদি বিষয়টি ভেবে দেখি লাল আর সাদা হচ্ছে সিঁদুর আর শাখার রং। হিন্দু সম্প্রদায়ের এই বিশেষ সংস্কৃতি আমাদের অজানা নয়। বৈশাখী পূজায় পোশাক হিসেবে তারা এই লাল-সাদা পোশাক পরিধান করে আসছে অনেকদিন ধরেই। পহেলা বৈশাখে হিন্দু-মুসলিম সবাই আমরা আজকাল এই রঙ্গের পোশাক পরিধানে অভ্যস্ত হচ্ছি। কিন্তু আমাদের ইসলামী সংস্কৃতি কি তা সমর্থন করে? একজন হিন্দু ব্যক্তির যেমন টুপি ও তসবিহ হাতে নেয়া শোভনীয় (বাস্তবে তা দেখাও যায় না) নয়, একই ভাবে লাল-সাদা হিন্দুয়ানী পোশাক পরে তথাকথিত উৎসবে সার্বজনীনতার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে নিজের আদর্শগত স্বতন্ত্রকে নষ্ট করা এক বিশাল সাংস্কৃতিক পথভ্রষ্টতা, অপসংস্কৃতিতে নিজেকে ডুবিয়ে দেয়ার নামান্তর। রাসূলুল্লাহ (সা) এর স্পষ্ট বাণী এখানে উল্লেখ্য, “তোমরা যে যেই জাতির অনুসরণ করবে সে যেন তাদেরই অন্তর্ভূত।” (আহমাদ)
যেখানে কোরআনে আল্লাহর রঙে রঙিন হতে বলা হয়েছে, সেখানে এ কোন রঙে রাঙাচ্ছি আমরা নিজেকে?
পান্তা-ইলিশ খাওয়া বনাম দেশীয় ঐতিহ্য রক্ষা : পহেলা বৈশাখের অন্যতম আচার পান্তা ভাত ও ইলিশ মাছ খাওয়া। বাসায় হোক বা বাহিরে হোক, বেশিরভাগ পরিবারে চলে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার সর্বোচ্চ আয়োজন। বাজারে হাজার হাজার টাকার মাছ কেনা-বেচা চলে, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চবিত্ত সবাই পকেটের সব টাকা উজার করে এই ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা চালান। ভাবতে কষ্ট লাগে বাংলাদেশের মতন দরিদ্র দেশে কত মানুষ না খেয়ে দিন কাটায়, অথচ এসব মানুষদের সহযোগীতায় একটি টাকা খরচ করতে আমরা আর্থিক দৈন্যতার কথা ভাবি। আর একদিনের এই ঐতিহ্য পালনের জন্য কত টাকা খরচ হচ্ছে কত অপচয় হচ্ছে তা একবারও ভেবে দেখিনা। যদি এ দেশের দরিদ্র মানুষের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই পান্তা-ইলিশ খাওয়া হয়, তাহলেও একটু ভেবে দেখা দরকার এই দেশের কতজন মানুষকে আমরা দেশ, দেশের মানুষকে ভালোবাসার জন্য চিন্তাশীল করতে পেরেছি, পহেলা বৈশাখের এই তথাকথিত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের মাধ্যমে?
মঙ্গল শোভাযাত্রা : এ কোন অমঙ্গলের পদধ্বনি? : সম্প্রতি ইউনেস্কো পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রধান সংস্কৃতি মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে। এই স্বীকৃতিতে বাংলাদেশের সুধী মহল বেশ আনন্দিত, গর্বিত। কিন্তু আমরা যদি একটু ভেবে দেখি, মঙ্গল শোভাযাত্রায় কী করা হয়? হনুমান, পেঁচাসহ রঙিন জীবজন্তুর মুখোশে মুখ ঢেকে, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে, ঢাক-ঢোল, শঙ্খ ধ্বনি ও কাঁসার ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে এই শোভাযাত্রায় লাল-সাদা পোশাকে নর-নারী অংশ নেয়। এই শোভাযাত্রা পুরোপুরি ভাবেই হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির অনুকরণ। ৯০ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশে এই শোভাযাত্রা কখনোই সার্বজনীনতার মর্যাদা পাওয়ার, দেশীয় ঐতিহ্যের মূল বাহক হতে পারে না। ইউনেস্কো থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার মানেই মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন ও অংশগ্রহণ মুসলিম প্রধান এ দেশের সংস্কতি এমন হতে পারে না। তারপর এ মর্যাদা প্রাপ্তির খুশিতে আত্মহারা হয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন ও শিক্ষার্থীদের এতে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আমরা ভেবে দেখছি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে হিন্দু-মুসলিম মিশ্র এ সংস্কৃতি কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে? অবিশুদ্ধ সংস্কতির দূষিত হাওয়ায় পবিত্রতা হারাবে আমাদের প্রকৃত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ।
পহেলা বৈশাখ, ছাত্রী লাঞ্ছনা ও অনৈতিকতার সয়লাব : পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রমনা বটমূল, টিএসসিসহ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বৈশাখী মেলা ও দিন ব্যাপি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে প্রতিবছর। আর প্রতিবছর আমরা পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ছাত্রি লাঞ্ছনা, তরুণীদের শ্লীলতাহানি, ইভটিজিংসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনার বাস্তবতা দেখতে পাই। বর্ষবরণ উৎসবের হর্ষে মেতে এদেশের তরুণ-তরুণীরা অনৈতিক সম্পর্কের আনন্দে মেতে উঠে, যা কখনই কাম্য হতে পারে না একটি নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ ব্যবস্থায়। উঠতি বয়সের সব তরুণীদের মূল কাজই থাকে এদিন সেজেগুঁজে নিজের ছেলে বন্ধু, মেয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো । আর এভাবেই যারা নারীকে শুধু ভোগ্যপণ্য মনে করে তারাও নিজেদের অন্যায় বাসনা চরিতার্থ করার সুযোগ পেয়ে যায়। পহেলা বৈশাখের সে জনপ্রিয় ব্যান্ড সংগীতের কথা মনে পড়ে যায়-
“মেলায় যাইরে, মেলায় যাইরে
বাসন্তি রং শাড়ি পরে ললনারা হেটে যায়,
ঐ বখাটেদের ছেলের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই।”
আমরা বাঁধনের কথা জানি, কিন্তু আরো কতো বাঁধন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে সম্ভ্রম হারাচ্ছে তা হয়ত খবরের পাতায় আসে না। সব দেখে, শুনে, বুঝেও পহেলা বৈশাখের এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অনৈতিক পরিবেশের সূত্রপাত বন্ধ করার উদ্যোগ যদি আমরা না নেই তাহলে অপসংস্কৃতির বাতাবরণে হারিয়ে যাবে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধগুলো, বিপথগামী হবে তরুণ প্রজন্ম, অস্থিতিশীল হবে সমাজ।
পহেলা বৈশাখ। নতুন একটি বছর, নতুন একটি দিন। যেকোন নতুন দিনে পুরাতন সব ভুলের গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে শুদ্ধ হয়ে নিজেকে নতুন দিনের সুন্দরের দিকে পরিচালিত করার স্বপ্ন থাকে সব মানুষের অন্তরে।
আসুন আমরাও সকল অপসংস্কৃতিকে বর্জন করি, শুদ্ধ হবার পথে প্রত্যয়ী হই.....

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ