শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধের দামামা

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : পরমাণু ইস্যুতে মার্কিন-উত্তর কোরীয় উত্তেজনা একেবারেই সর্বসাম্প্রতিক নয় বরং তা দীর্ঘদিনের। মার্কিনীরা অপরাপর রাষ্ট্রের উপর ছড়ি ঘোরাতে সক্ষম হলেও  উত্তর কোরীয়াকে কোন ভাবেই বাগে আনতে পারেনি। তাই প্রায়শই উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। আর এই উত্তেজনাটা সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ না নিলেও বাগাড়ম্বরটা একেবারে কম হয় না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেকোন মুহূর্তের দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা না হলেও বাকযুদ্ধের তো শেষ হয় না। তীর্যক কথাবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে উভয় দেশের  পারমাণবিক ইস্যু। যা মাঝে মধ্যে উপভোগ্যও হয়ে ওঠে বৈকি!
হালে সে অবস্থায় কিছুটা হলেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। পরমাণু ইস্যুতে এখন উভয় পক্ষই মুখোমুখি অবস্থানে বলে মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উভয় দেশের মধ্যে চলমান ঘটনা প্রবাহ সকল সময়ের চেয়ে খারাপ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। তাই সৃষ্ট পরিস্থিতিতে উভয় দেশের মধ্যে একটা সামরিক সংঘাতের কথা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল। পরিস্থিতির যত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে তাতে উভয় দেশের মধ্যে একটা সামরিক সংঘাত শুরু হওয়া খুবই স্বাভাবিক।
বিশেষ করে কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন রণতরী মোতায়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল হতে জটিলতর করে তুলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ব রাজনীতিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আর সে ধারাবাহিকতায় পুরো কোরীয় উপদ্বীপ এখন উত্তাল। উত্তর কোরীয়াও মার্কিন রণপ্রস্তুতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এক প্রতিক্রিয়ায় উত্তর কোরিয়া জানিয়েছে, যে কোনো ধরনের মার্কিন আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য তাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। ফলে উভয় দেশের মধ্যে ‘বিনাযুদ্ধে  নাহি দেব সুচাগ্র মেদিন’ ভাব সৃষ্টি  করেছে। যা পুরো বিশ্ব পরিস্থিতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচেছ।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ’র বরাত দিয়ে এ কথা জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রণতরী মোতায়েনের এ আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়ায় যে কোনো ধ্বংসাত্মক পরিণতির জন্য মার্কিন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোনো পর্যায়ের যুদ্ধের জন্য উত্তর কোরিয়া প্রস্তুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সামরিক অনুশীলনকে কোরিয়া উপদ্বীপে আগ্রাসন বলেই বিবেচনা করে উত্তর কোরিয়া। ফলে সার্বিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিই হচেছ মনে করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয় তা অবশ্য সময়ই বলে দেবে।
অপর খবরে ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ এর সাবেক প্রধান স্যার জন সাওয়ারস বলেছেন, অনভিজ্ঞতা এবং কার্যকর প্রেসিডেন্টসূলভ মনোভাব না থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বিপজ্জনক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। আর শেষ পর্যন্ত যদি পরিস্থিতি সেদিকেই মোড় নেয় তা উভয় পক্ষের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আর বাস্তবতাও সেদিকেই অগ্রসর হচেছ। তিনি বিবিসি রেডিও-ফোরকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ হলে তা সিরিয়ার চেয়েও বিশ্বের জন্য ভয়ানক হবে। সিরিয়ার বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো নিজেদের সামরিক এবং কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিতে চেয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে এই আশঙ্কা কেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে স্যার জন সাওয়ারস বলেন, তিনি এমন কোনো ব্যক্তি নন যার প্রতি আমি আস্থা রাখতে পারি।
এদিকে, উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উত্তেজনা বিরাজ করছে তখন কোরীয় উপসাগরে রণতরী মোতায়েন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর নির্দেশে পাঠানো কার্ল ভিনসন স্ট্রাইক গ্রুপ নামের ওই রণতরীতে রয়েছে একটি বিমানবাহী জাহাজসহ বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলেছেন, উত্তর কোরিয়ায় পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র এককভাবেই সিদ্ধান্ত নেবে। এর আগে মার্কিন প্যাসিফিক কমান্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রণতরীটি এখন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে কোরিয়া উপদ্বীপের দিকে যাচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্ণযুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে রণতরীটি কোরিয়ার দিকে যাচ্ছে। এক বিবৃতিতে প্যাসিফিক কমান্ড জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার ক্রমাগত দায়িত্বহীন পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো এবং ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়িয়ে চলার মাধ্যমে যে ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তা মোকাবিলার জন্যই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
অপরদিকে গত ৫ এপ্রিল জাপান সাগরে আবারো একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে উত্তর কোরিয়া। এর আগে ৬ মার্চ উত্তর কোরিয়ার চীন সীমান্তের নিকটবর্তী তংচ্যাং-রি অঞ্চল থেকে জাপান সাগরে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। তখন দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহ্যাপ জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সম্ভবত আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। পারমাণবিক ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম চালানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো এবং জাতিসংঘ বেশ কয়েকবার নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও ওই কার্যক্রম থেকে সরে আসেনি উত্তর কোরিয়া বরং দেশটি প্রতিরক্ষা বিভাগকে আরও অধিকতর কার্যকর ও সমৃদ্ধ করার জন্যই পরমাণু কর্মসূচী অব্যাহত রেখেছে এবং সেদেশের সেনাবাহিনীতে আরও সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত করা হচ্ছে। এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ^ সম্প্রদায়ে কোন উদ্বেগ-উৎকন্ঠাকেই তারা আমলে নিচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও উত্তর কোরীয় হুমকী মোকাবিলায় বেশ তৎপর। সম্প্রতি কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন রণতরী মোতায়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল হতে জটিলতর করে তুলেছে। যা উভয় দেশের মধ্যে সর্বাত্মক রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল।
এদিকে কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্তের কঠোর নিন্দা জানিয়ে গত ১১ এপ্রিল উত্তর কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছে, তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। মার্কিন যুদ্ধবহর কার্ল ভিনসন এ সপ্তাহান্তে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনে এ অঞ্চলে চলে আসে। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা কেসিএনএ জানায়, ‘এসব যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন এটাই প্রমাণ করে, উত্তর কোরিয়ায় আক্রমণ চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বেপরোয়া পদক্ষেপ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পর এনিয়ে এই প্রথমবারের মতো মুখ খুললো উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার সরকারি নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ডিপিআরকে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন ধরনের হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।’
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পিয়ংইয়ংয়ের লাগাম টেনে ধরতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তার উপদেষ্টাদের নির্দেশ দেন। সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ট্রাম্পের নতুন নির্দেশটিও ছিল উত্তর কোরিয়াকে হুঁশিয়ার করে দেয়া। বেইজিং তার প্রতিবেশী দেশ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হলে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে  ট্রাম্প এককভাবে পদক্ষেপ নেয়ারও ঘোষণা দেন।
মূলত যতদিন যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচেছ তাতে উভয় দেশের মধ্যে যুদ্ধের স¤া¢বনা বেশ উজ্জল হয়ে ওঠছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহলও বেশ উদ্বিগ্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বৃটেনের এক সাবেক গোয়েন্দা প্রধান। বিবিসি রেডিও-ফোরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ আশংকা প্রকাশ করেন। ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ এর সাবেক প্রধান স্যার জন সাওয়ারস বলেছেন, অনভিজ্ঞতা এবং কার্যকর প্রেসিডেন্টের মনোভাব না থাকার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তিনি বিবিসি রেডিও-ফোরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ হলে তা সিরিয়ার চেয়েও বিশ্বের জন্য ভয়ানক হবে। সিরিয়ার বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো নিজেদের সামরিক এবং কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিতে চেয়েছেন। মূলত উভয় দেশের মধ্যে অনাস্থা ও শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগীতার কারণে কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে।
এমন আশঙ্কায় পিয়ংইয়ংয়ের নিকট প্রতিবেশী চীন কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসেছে। সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহবান জানিয়েছেন। পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচী নিয় উদ্বেগ ক্রমেই বাড়তে থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে টেলিফোন করে তিনি এ আহবান জানান। গত ১২ এপ্রিল চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার কেন্দ্র সিসিটিভি’র খবরে বলা হয়, শি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে টেলিফোন করে বলেন, চীন উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার শান্তিপূর্ণ সমাধান দেখতে চায়।
পরিস্থিতির যত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোরীয় উপদ্বীপ নিয়ে যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রদর্শন করছেন তাতে উভয়  দেশের মধ্যে একটা সর্বাত্মক যুদ্ধ অনিবার্য হয়েই উঠেছে বলেই মনে হচ্ছে। একদিকে যেমন পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের কথা বলা হচ্ছে, অপরদিকে পারমাণু অস্ত্র সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমও ক্রমেই সমৃদ্ধ হচ্ছে। আর এই প্রতিযোগিতাটা বাড়ছে বৈ কমছে না। তাই বিশ্বপরিস্থিতি ক্রমেই অশান্ত হয়ে ওঠছে। সঙ্গত কারণেই কোরীয় উপদ্বীপ এখন বেশ অশান্ত  কিন্তু পরমাণু ইস্যুতে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধে তা শুধু দু’দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেও রূপ নিতে পারে। তাই বিশ্বের তাবৎ শান্তিপ্রিয় মানুষ কোরীয় উপদ্বীপের যুদ্ধের দামামাকে স্বাভাবিক মনে করছেন না বরং সভ্য ধ্বংসের পূর্বাভাস হিসাবেই দেখছেন। যা কারো কাম্য নয়।   smmjoy@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ