মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০
Online Edition

খুলনা মহানগরীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে অধিকাংশ নলকূপে পানি উঠছে না

নগরীর অধিকাংশ এলাকার মানুষ গভীর নলকূপ থেকে পানি না পেয়ে এখান থেকে এভাবে মাটির কলসিতে করে পানি কিনে নিয়ে যাচ্ছে

খুলনা অফিস : খুলনা মহানগরীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। গত আগস্ট মাসে যেখানে নগরীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ১৬ থেকে ১৯ ফুটের মধ্যে। ফেব্রুয়ারি মাসে তা নেমে ২০ থেকে ২৪ ফুটে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু এপ্রিলের শুরুতে বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর ২৬ থেকে ২৮ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে থাকা ওয়াসার উৎপাদক নলকূপ পরিদর্শন ও রেজিস্টার দেখে পরিসংখ্যানের সত্যতা পাওয়া গেছে। গত ৪ এপ্রিল দুই বেলা সাড়ে ১৩ ঘণ্টা পাম্প চালিয়ে পানি সরবরাহ দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার লিটার।
অথচ একমাস আগে একই সময় পাম্প চালিয়ে পানি উঠেছিল ২ লাখ ৩ হাজার লিটার। বৃষ্টির মওসুমে গত ৫ আগস্ট পানি উঠেছিল ৪ লাখ ৯২ হাজার লিটার।
খুলনা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, নগরীর ১৫ লাখ মানুষের প্রতিদিনের পানির চাহিদা ২৪ কোটি লিটার। চাহিদা বিপরীতে খুলনা ওয়াসা সরবরাহ করে মাত্র ১৩ কোটি ২০ লাখ লিটার। আবার নগরীতে খুলনা সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং রয়েছে সাড়ে ৬৫ হাজার। এসব গ্রাহকের মাত্র ১৮হাজার জনকে পানি দেয় ওয়াসা।
সূত্রটি জানায়, খুলনা মহানগরীর পানির চাহিদা শতভাগ উত্তোলন করা হয় ভূগর্ভ থেকে। এর মধ্যে ওয়াসা ৮৩টি উৎপাদক নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন ১৩ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করে। বাকিটুকু নগরবাসী হস্তচালিত নলকূপ এবং নলকূপে পাম্প লাগিয়ে নিজস্বভাবে উত্তোলন করে। সারা বছর ধরে পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করায় গ্রীষ্মের শুরুতে পানির স্তরে সমস্যা দেখা দেয়।
নগরীর শেখপাড়া পুরাতন মসজিদ সড়কের সামনের নলকূপটি আশপাশের ২০/২৫টি নিম্নবিত্ত পরিবারের একমাত্র খাবার পানির উৎস। গত দুই সপ্তাহ ধরে দিনের বেলায় নলকূপটিতে পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। গত বুধবার দুপুরে ওয়াসার প্রকৌশলীরা নলকূপ পরীক্ষা করে জানালেন সরঞ্জাম সব ঠিকই আছে, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দিনের বেলা পানি উঠছে না।
সঙ্গিতা সিনেমা হলের মোড় সংলগ্ন তিনটি নলকূপের ওপর নির্ভরশীল আশপাশের তিন শতাধিক ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা। দিনের বেলা একটি নলকূপ থেকেও পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। পানির কষ্ট কি-গত এক সপ্তাহ ধরে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন এই এলাকার মানুষ।
শুধু শেখপাড়া এলাকাই নয়, চৈত্রের শুরুতে নগরীর স্যার ইকবাল রোড, খানজাহান আলী রোড, মির্জাপুর, সিমেন্ট্রি রোডসহ অধিকাংশ এলাকাতেই তীব্র পানি সংকট দেখা দিয়েছে। হস্তচালিত নলকূপ কিংবা পাম্প বসানো নলকূপ- কোনোটিতেই দিনের বেলা পর্যাপ্ত পানি উঠছে না। পর্যাপ্ত পানি উঠছে না ওয়াসার উৎপাদক নলকূপেও। এ অবস্থায় পানি সমস্যা দূর করতে পর্যাপ্ত বৃষ্টিই একমাত্র ভরসা।
পাম্প অপারেটর মিজানুর রহমান জানান, প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা পাম্প চালিয়ে ৬ লাখ লিটার পানি ওঠার কথা। বর্ষা মওসুমে পানি স্বাভাবিকভাবে ওঠে। গরমে পানির স্তর নিচে নামায় গত কয়েকদিন ধরে পানি উঠছে কম।
ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম জানান, ২০১৪ সাল থেকে নিয়মিত পানির স্তর পরিমাপ শুরু করেছে খুলনা ওয়াসা। চলতি বছরের পরিমাপে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে নগরীর জেনারেল হাসপাতাল এলাকায় ২৯ ফুট, নিরালা শিশু পার্ক এলাকায় ২১ দশমিক ১০ ফুট, বাবু খান রোড এলাকায় ২৫ দশমিক ৫৮ ফুট, হাদিস পার্ক এলাকায় ২৮ ফুট, ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় ২৬ ফুট, তারের পুকুর এলাকায় ২৯ দশমিক ৯২ ফুট, বসুপাড়া কবরখানা, আরামবাগ খ্রিস্টান কলোনি, বানরগাতী প্রাইমারি স্কুল এলাকায় পানির স্তর ২৪ থেকে ২৬ ফুটের মধ্যে ছিল। এপ্রিলের পরিমাপ পরিসংখ্যান এখনও আসেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে এসব এলাকায় পানির স্তর আরও ২/৩ ফুট নিচে নেমেছে।
খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ডি কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করায় দিন দিন পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। গত ৫ বছরে পানির স্তর ৬ ইঞ্চি নিচে নেমেছে। তিনি জানান, সাধারণত পানির স্তর ২৬ ফুটের নিচে নেমে গেলে হস্তচালিত নলকূপ থেকে পানি ওঠে না। আর পানির স্তর যদি ৩০ ফুটের নিচে নেমে যায় তাহলে বাসা-বাড়িতে মোটর দিয়ে পানি ওঠানো যায় না। বর্তমানে নগরীর ৮০টি পয়েন্টে বর্তমানে পানির স্তর ২৪ থেকে ২৬ ফুটের মধ্যে রয়েছে।
খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল্লাহ বলেন, ভূগর্ভের স্তর স্বাভাবিক রাখতে ব্যক্তিগতভাবে নলকূপ বসানোয় নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া ওয়াসার পাম্প বেশি সময় চালিয়ে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, পানি সংকট মোকাবেলায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পানি সরবরাহ প্রকল্প’ নামে প্রকল্পের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মধুমতি নদী থেকে পানি এনে পরিশোধনের মাধ্যমে নগরীতে বিতরণ করা হবে। ২০১৮ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রতিদিন ১১ কোটি টাকা পানি পাবে মানুষ। এছাড়া নতুন করে ৪৫ হাজার বাড়িতে পানির সংযোগ দেওয়া হবে। তখন নগরীতে কোনো পানি সংকট থাকবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ