বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

উগ্রপন্থী দলের উত্থান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : [ছয়]
খারিজীদের সাথে সাহাবীগণের উপরোক্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পাই যে, তারা সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, কখনো কোনো মতবিরোধ, পাপ বা অপরাধের কারণে মুমিন ভাই তার ভ্রাতৃত্ব হারায় না। কাজেই যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলেছে তাকে মুমিন বলেই গণ্য করতে হবে। ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই কাফির।’ এই আয়াত ও অনুরূপ আয়াত ও হাদীসের আলোকে খারিজীরা মুসলিমকে কাফির বলতে থাকে, তখন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. তাদেরকে বলেন, এখানে কুফর বলতে তোমরা যা বুঝেছ তা নয়। এই পর্যায়ের কুফর ইসলাম থেকে খারিজ করে না। ‘আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তদনুসারে যারা বিধান দেয় না। তারাই কাফির’ এখানে নিচেও কুফরী আছে। বস্তুতঃ কুরআন কারীমের বিভিন্ন আয়াত ও রসূলুল্লাহ স.- এর সারাজীবনের শিক্ষার আলোকে তাঁরা এ মত প্রকাশ করেছন। কুরআনের কিছু আয়াত বা  কিছু হাদীসের আলোকে পাপীকে কাফির বলা হলে কুরআনের অন্যান্য অনেক আয়াত ও রসূলূল্লাহ স.- এর আজীবনের শিক্ষা এবং পাপী মুসলিমদের সাথে তাঁর সারাজীবনের আচরণ বাতিল করতে হয়। সাহাবীগণের আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে আমরা খারিজীদের এই ভয়ংকর মতবাদটি পর্যালোচনা করব।
ইসলাম মানুষকে পরিপূর্ণ সততা ও পাপমুক্ত জীবন যাপনে উৎসাহ দিয়েছে, কিন্তু মুসলিম বলে গণ্য হওয়ার জন্য পরিপূর্ণ পাপমুক্ত হওয়ার শর্তারোপ করেনি। আমরা দেখেছি যে, আল্লাহর বিধান অনুসারে ফয়সালা না করাকে কুরআনে কুফর বলা হয়েছ। এছাড়া কুআন ও হাদীসে অনেক পাপকে কুফল বলা হয়েছে। এগুলোর উপর নির্ভর করে খারিজীরা দাবি করে যে, আল্লাহর বিধান অমান্য করে যে কোনো পাপে লিপ্ত হওয়ার অর্থই হলো আল্লাহর বিধানের বাইরে ফয়সালা দেয়া। কাজেই সকল পাপীই কাফির।
তাদের এই মত কুরআন হাদীসের অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছুই নয়। কুরআন ও হাদীসে যেমন বিভিন্ন পাপকে ‘কুফর’ বলা হয়েছে, তেমনি কঠিন পাপে লিপ্ত ব্যক্তিকেও মুমিন বলা হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুসারে যারা ফয়সালা করে না তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে। আর আল্লাহর অন্যতম বিধান হলো, এক মুমিন অন্য মুমিনকে হত্যা করবে না, বা পরস্পর যুদ্ধ করবে না। মহান আল্লাহর বারংবার বলেছেন: আল্লাহ যে জীবনকে মহাসম্মানিত-নিষিদ্ধ করেছেন সেই জীবনকে তোমরা ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া হত্যা করবে না। রসূলূল্লাহ স. স্পষ্টতই মুমিনের সাথে যুদ্ধ করাকে কুফরী বলেছেন। তিনি বলেন, মুসলিমকে গালি দেয়া পাপ এবং তার সাথে যুদ্ধ করাকে কুফরী। অথচ আমরা দেখেছি যে, আল্লাহর এই বিধানের বিরুদ্ধে ফয়সালা দিয়ে মুমিনের সাথে যুদ্ধরত ব্যক্তি, হাদীসের ভাষায় স্পষ্ট কায়রীতে লিপ্ত, তাকে কুরআন কারীমে মুমিন বলে অভিহিত করা হয়েছে। উপরোল্লিখিত আয়াতে পরস্পর মুসলমানদেরকে মুমিন বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং পরের আয়াতে যুদ্ধরত মুমিনদেরকে অন্য মুমিনদের ভাই বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অগণিত হাদীসে পাপীকে মুমিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সকল আয়াত ও হাদীসের আলোকে রসূলুল্লাহ স.- এর সহচর্যে লালিত সাহাবীগণ বলতেন, কুরআন কারীমে ব্যবহৃত কুফর, নিফাক ও জুলুম দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো তা অবিশ্বাস, ঈমানের অনুপস্থিতি ও চূড়ান্ত অন্যায় অর্থে এবং কখনো তা আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা মুনাফিকের গুণ ও সাধারণ পাপ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যান্য মানুষের সমালোচনায় বাড়াবাড়ি বা উগ্রতা এবং সমাজের সকল মানুষকে পাপী, কাফির, ধ্বংস প্রাপ্ত ইত্যাদি বলা মূলত নিজের ধার্মিকতা ও জ্ঞানের অহংকার থেকেই উৎসাহিত। রসূলুল্লাহ স. এরূপ মানসকিতা পরিহার করতে কঠোর তাগীদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যখন কেউ বলবে যে লোকজন ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, সে ব্যক্তি নিজেকেই ধ্বংস করলো।
ঈমানের দাবিদারকে কাফির বলা সামাজিক অশান্তির প্রথম পদক্ষেপ। রসূলুল্লাহ স. এ বিষয়ে তাঁর উম্মাতকে সতর্ক করেছেন ও সতর্কতা অবলম্বন করতে শিক্ষা দিয়েছেন। রসূলূল্লাহ স. বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফির বলে, তবে এ কথা তাদের দু’জনের একজনের উপর বর্তাবে। যদি তার ভাই সত্যিই কাফির হয় তবে তো ঠিক অন্যথায় কাফির আখ্যায়িতকারীর উপর কুফর প্রযোজ্য হবে। ‘যদি কেউ তার ভাইকে বলে, হে কাফির, তবে তাদের দুজনের একজনের উপর এই কুফরের দায়ভার বর্তাবে। ‘যদি কেউ কোনো মানুষকে কুফরের সাথে সংশ্লিষ্ট করে আহবান করে অথবা তাকে বলে, হে আল্লাহর শত্রু, আর সে তা না হয়, তবে তা বক্তার উপরই বর্তাবে। ‘যে কোনো ব্যক্তি অপরকে কাফির বলে গণ্য করল তাদের দু জনের একজনের উপর বর্তাবে। যদি সে কাফির হয় তবে ঠিক অন্যথায় তাকে কাফির ঘোষণা করার কারণে কাফির ঘোষণাকারীই কাফির হয়ে যাবে। যদি কেউ কেনো মুমিনকে কুফরীতে অভিযুক্ত করে তবে তা তাকে হত্যা করার সমতুল্য অপরাধ।
কুরআন হাদীসের এ সকল নির্দেশনার আলোকে এবং কুরআন হাদীসের সকল বক্তব্যের সামগ্রিক ও সমন্বিত অর্থের উপর নির্ভর করে সাহাবীগণ এবং তাদের অনুসারী পরবর্তী সকল যুগে মুসলিম উম্মাহর মূলধারার মুসলিমগণ ঈমানের দাবিদার কাউকে কাফির বলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাদের মূলনীতি হলো, মুমিন নিজের ঈমানের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকবেন। এবং সকল কুফর, শিরক, পাপ, অন্যায়, অবাধ্যতা ও ইসলামী মূল্যবোধ বিরোধী চিন্তাচেতনা থেকে সতর্কতার সাথে আত্মরক্ষা করবেন। কিন্তু অন্যের ঈমানের দাবি গ্রহণ করার বিষয়ে তার বাহ্যিক আচরণের উপর নির্ভর করবেন। কোনো ঈমানের দাবিদারকেই কাফির না বলার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবেন।
ভুল করে কোনো মুুমিনকে কাফির মনে করার চেয়ে ভুল করে কোনো কাফির, মুশরিক বা মানুফিককে মুসলিম মনে করা নিরাপদ। প্রথম ক্ষেত্রে কঠিন পাপ ও নিজের ইমান নষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কোনোরূপ পাপ বা ক্ষতি হওয়ার আশংকা নেই।
এই নীতির ভিত্তিতে তাঁরা বিশ্বাস করেন, যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করছেন, তাকে কোনো পাপের কারণে কাফির বা ধর্মত্যাগী বলা যাবে না, তিনি তারপাপ থেকে তাওবা করুন অথবা নাই করুন, যতক্ষণ না তিনি সুষ্পষ্টভাবে ইসলামী বিশ্বাসের পরিপšী’ বিশ্বাস পোষণ করার ঘোষণা দিবেন। ইসলামী আইন লঙ্ঘনকারী বা আল্লাহর নির্দেশ অমান্যকারী মুসলিম পাপী বলে গণ্য হবেন। কখনোই তাকে পাপের কারণে ধর্মত্যাগী গণ্য করা যাবে না। তবে যদি তার এই পাপ বা অবাধ্যতাকে তিনি বৈধ মনে করেন বা ইসলামী বিধানকে বাজে, অচল বা অপালনযোগ্য বলে মত প্রকাশ করেন, বা ইসলামের কিছু অলংঘনীয় বিধান পরিত্যাগ করেও ভাল মুসলিম হওয়া যায় বলে দাবি করেন তবে তা কুফর বা ধর্মত্যাগ বলে গণ্য হবে।
ঈমানের দাবিদার জেনে শুনে কুফরী করবেন না বলেই ধরে নিতে হবে। কারো কথা বা কর্ম বাহ্যত কুফরী বলে মনে হলেও তার কোনো রুপ ইসলামী ব্যাখ্যা গ্রহণের অবকাশ থাকলে তদনুযায়ী তাকে মুমিন বলে মেনে নিতে হবে। সর্বোপরি ঈমানের দাবিদার কোনো ব্যক্তি যদি সুস্পষ্ট কোনো বা কোনো কুফরী কাজে লিপ্ত হয়, তবে তার কর্মকে কুফরী বলা হলেও ব্যক্তিগতভাবে তাকে কাফির বলার আগে এ বিষয়ে তার কোনো ওযর বা অজ্ঞতা আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। সেই ব্যক্তি অজ্ঞতা, ভয় বা অন্য কোনো ওযরের কথা উল্লেখ করলে তা গ্রহণ করা হবে। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা’আত বা মূলধারার মুসলিম উম্মাহর দৃষ্টিতে এ হলো ইসলামের অন্যতম মূলনীতি।
এই মূলনীতির প্রতি সাহাবীগণের বিশ্বাস এত দৃঢ় ছিল যে, তাঁরা কখনো খারিজীদেরকের কাফির বলেননি। খারিজীরা তাদেরকে কাফির বলেছে, নির্বিচারে মুসলিমদেরকে হত্যা করেছে, স্বয়ং রসূলূল্লাহ স. এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও এদেরকে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন, সাহাবীগণ তাদের বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, কিন্তু কখনো আলী রা. বা অন্য কোনো সাহবী তাদেরকে কাফির বলে ফাতওয়া দেননি। বরং তাঁরা এদের সাথে মুসলিম হিসেবেই মিশেছেন, কথাবার্তা বলেছেন, আলোচনা করেছেন, এমনকি এদের ইমামতিতে সালাত আদায় করেছেন। যুদ্ধের ময়দানে বা বিচারের রায় ব্যতীত কখনোর এদেরকে হত্যা করার অনুমতি দেননি।
আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, খারিজীদের কাফির কথনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। কুরআন হাদীস নির্দেশিত সুষ্পষ্ট পাপে লিপ্ত তাদের দলভুক্ত ব্যক্তিদেরকে তারা মুমিন বলে গ্রহণ করেছে। পক্ষান্তরে তারা রাজনৈতিক বিরোধীদেরকে কল্পিত পাপ বা আল্লাহর আইন অমান্য করার অপরাধে কাফির বলে গণ্য করেছে। আমরা দেখেছি যে, আলী রা. ও তাঁর অনুসারীদেরকে তারা কল্পিত পাপের অপরাধে কাফির বলেছে। এছাড়া উমর ইবনু আব্দুল আযীয র. ছাড়া অন্যান্য উমাইয়া শাসককে ও তারা কাফির বলে গণ্য করে। কারণ তারা শাসক নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণের পরামর্শ গ্রহণের আল্লাহর নির্দেশ পরিত্যাগ করে এর বিপরীতে বংশতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ