মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে চলনবিলে ইরি-বোরো চাষীরা বিপাকে

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা: খাদ্যশস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিলে  চৈত্রের শুরু থেকেই ভরা ইরি-বোরো মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষকেরা  সেচ কাজ নিয়ে বিপাকে পড়ে গেছেন। এদিকে প্রতি বছর পানির স্তর নিচে  নেমে যাওয়ার ফলে  কৃষকেরা তাদের গভীর ও অ-গভীর নলকুপের আশানুরূপ পানি পেতে গর্ত করে সেচযন্ত্র (শ্যালো মেশিন) নিচে নামাতে হচ্ছে। কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে , চলনবিলের ইরি-বোরো চাষীদের কাছে নতুন বিড়ম্বনা পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া। বিল পাড়ের সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া ও নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলী মাঠে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। যা সেচের ওপর নির্ভরশীল। আর  ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের গভীরতা চলনবিলের একেক জায়গায় একেক রকম। দক্ষিণ-পশ্চিমে চলনবিলে পানির স্তর ক্রমশঃ নিচে নেমে যাচ্ছে। আবার উত্তর ও পূর্ব বিলের ফসলী মাঠে পানির স্তর নিচে নামার পরিমাণ দক্ষিণ-পশ্চিমের চেয়ে কম।
মূলতঃ আশির দশকে চলনবিলে ব্যাপকভাবে বোরো আবাদ শুরু হয়। গত ৩০ বছরে চলনবিলের প্রধান খাদ্যশস্য আবাদ বোরো ধান চাষে এ অঞ্চলের কৃষক হাজার হাজার অগভীর ও গভীর  সেচযন্ত্র দিয়ে পানি উত্তোলন করে বোরো আবাদ করে আসছেন। এ ছাড়া গম, রসুন, সরিষা, তরমুজ, খিরা, শশাসহ নানা রবিশস্য আবাদে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে নব্বই দশকের পর চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে পানির স্তর ক্রমশঃ নিচে নামতে শুরু করে। লালুয়ামাঝিড়া গ্রামের প্রবীণ কৃষক আমজাদ হোসেন খন্দকার (৯০) জানান, নতুন নতুন সেচযন্ত্র বসাতে গিয়ে ১০ বছর আগে যে পরিমাণ গভীরতায় পানি মিলত এখন তা মিলছে না। ফলে কোথাও ১২০ ফুট আবারও কোথাও ১০০-১১০ ফুট পর্যন্ত মাটির গভীরে পাইপ বসিয়ে পানি তুলতে হচ্ছে। যা ২০-২৫ বছর আগে ৬৫-৮০ ফুটের বেশী ছিল না।
মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক জিল্লুর রহমান জানান, এ বছর তিনি সেচযন্ত্র বসাতে গিয়ে গত বছরের চেয়ে ১৫ ফুট বেশী গভীরতায় পানির পাইপ স্থাপন করেছেন। তারপরও চলনবিলের কৃষক ২০ বছর আগে সেচ যন্ত্রে যে পরিমান পানি পেয়েছেন বর্তমানে তা ৩৫-৪০ শতাংশে কম পাচ্ছেন বলে জানান রঘুনীলি গ্রামের কৃষক মোজ্জাম্মেল হক (৫০)। চলনবিলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় লাখ লাখ ইরি-বোরো চাষী কৃষক বিপাকে পড়ে গেছেন। একাধিক কৃষক জানান, আগের তুলনায়  সেচযন্ত্রে পানি কম ওঠায় তাদের জ্বালানী খরচ বেড়েছে। পূর্বে প্রতি মৌসুমে ১ বিঘা জমিতে ১৬-১৯ লিটার জ্বালানী তেল লাগলেও বর্তমান সময়ে তা ২৫-৩০ লিটারে গড়িয়েছে। এ ছাড়া পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় জমিতে সেচ দিতে গিয়ে আগের তুলনায় সময়ও বেশী লাগছে।
পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মাহমুদুল হক জানান, চলনবিল অঞ্চলে ভু-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। বর্ষা মৌসুমে পানির স্তর আবারও বৃদ্ধি পেয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখো গেছে, ভরা বোরো মৌসুমে ভু-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষক ৭-১০ ফুট কোন কোন ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশী গর্ত করে সেচযন্ত্র (শ্যালো মেশিন)নিচে বসিয়ে পানি তোলার চেষ্টা করছেন।
চলনবিলের প্রবীণ কৃষকেরা জানান, চলনবিলে বিভিন্ন ফসলের আবাদে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পানির স্তর ক্রমে ক্রমে নিচে নেমে যাচ্ছে। তারা আরও জানান, চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ১৬টি নদী মৃতপ্রায়। অসময়ে শুকিয়ে যাচ্ছে খাল-বিল। ফলে পানির স্তর সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। আর ধাপে ধাপে পানির স্তর নিচে নামায় সচেতন কৃষক শংকিতও বটে।
চলনবিলের ভু-গর্ভস্থ পানির স্তর সমস্যা ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) রায়গঞ্জ  জোনের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলাল উদ্দিন জানান, চলনবিলের কিছু কিছু এলাকায় গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। যেমন ডিসেম্বর মাসে চলনবিলের কিছু এলাকায় পানির স্তর ছিল ২৪-২৫ ফুট নিচে। বর্তমানে  তা ২৬-২৭ ফুট নিচে নেমে গেছে। আগামী মাসে আরো পানির স্তর নিচে নামবে। তবে, এপ্রিলে বৃষ্টি হলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ