বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কেশবপুরে ব্লাস্ট রোগে বোরো ধানের ক্ষতির আশঙ্কা

কেশবপুর (যশোর): পৌর এলাকার মূলগ্রামের অধিকাংশ জমির ধান ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ছবিটি ইয়াকুব আলী সরদারের ক্ষেত থেকে তোলা

কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতা: দূর থেকে দেখলে মনে হয় ধান পেকে গেছে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যায় পরিপক্কতা আসার আগেই ধানের শীষ চিটা হয়ে শুকিয়ে সোনালী রঙ ধারণ করেছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে কেশবপুর পৌর এলাকার মূলগ্রামের অধিকাংশ জমির ধানসহ উপজেলার বিভিন্ন মাঠের শতশত বিঘা জমির ধান ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে এভাবে শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। এর ফলে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কৃষি অফিসের দাবি অধিক মাত্রায় নাইট্রোজেন সার ব্যবহার ও হঠাৎ করে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের দাবি, তারা সময়মত কৃষি অফিসের পরামর্শ পাননি বলেই এ রোগ দমনে ব্যর্থ হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি বছর এ উপজেলায় বোরো আবাদের জন্য ১৫ হাজার ৯‘শ ১৪ হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ধানের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১৫ হাজার ৯‘শ ৩০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। সময় মত বীজ, সার কৃষকের হাতের নাগালে থাকায় এবার বোরোর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। যা থেকে ৭৯ হাজার ৬‘শ ৫০ মেট্রিকটন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। যার বর্তমান বাজার মূল্য ১৮৩ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ ক্ষেতের ধান গাছে শীষ বেরিয়েছে। কিন্তু চৈত্র মাসের শুরু থেকে উপজেলায় সপ্তাহব্যাপী দিনে গরম ও রাতে শীত অনুভূত হয়। এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে উপজেলার বিভিন্ন মাঠের ধান ক্ষেতে হঠাৎ করে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। যার কারণে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে, গত সোমবার কেশবপুর পৌর এলাকার মূলগ্রাম মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কৃষক ইয়াকুব আলী সরদারের ৪ বিঘা জমির ধান ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে শীষ শুকিয়ে মারা গেছে। শুধু ইয়াকুব আলী সরদারই নয় ওই মাঠের নিমাই মেম্বার, মফিজউদ্দীন, হাসান আলী, আকবার আলীসহ অধিকাংশ কৃষকের ধান এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এ সময় কৃষক ইয়াকুব আলী সরদার সাংবাদিকদের জানান, এ রোগ মোকাবিলায় তিনি কৃষি অফিসের আগাম কোনো পরামর্শ পাননি এবং তার ব¬কে কোন উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা দেখভাল করেন তাও তিনি জানেন না। সমস্ত জমির ধানের শীষ শুকিয়ে গেলে তিনি কৃষি অফিসে গিয়ে পরামর্শ নিয়ে নাটিভো নামের ছত্রাকনাশক স্প্রে করেছেন। কৃষক মফিজ জানান, তিনি পরের জমি বর্গা নিয়ে ১ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এ রোগে তার সমস্ত ক্ষেতের ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তিনি ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করবেন কিভাবে তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন। এছাড়া কেশবপুর পৌর এলাকা ও মধ্যকুল ব্লকেসহ সুফলাকাটি ও গৌরীঘোনা ইউনিয়নের অধিকাংশ জমি ও ঘেরের জমির ধানে এ রোগ দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, তাদের এ রোগ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। বিভিন্ন ডিলারের পরামর্শে তার কীটনাশক ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কোনো ফল পাননি। অবশেষে জানতে পারেন এটি ছত্রাকজনিত ব্লাস্ট রোগ। মধ্যকুল গ্রামের কৃষক শাহীনুর রহমান জানান, ব্লাস্ট রোগের প্রদুর্ভাবের কারণে নাটিভোর ব্যাপক চাহিদা থাকায় ডিলাররা সংকট দেখিয়ে কৃষকদের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করছেন।  
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহাদেব চন্দ্র সানা জানান, এ রোগের লক্ষণ হলো ধান গাছের প্রথম পত্রফলকে অতি ছোট ডিম্বাকৃতির দাগ পড়া, শীষ বের হওয়ার সময় শীষের গোড়াই কালো দাগ পড়া। এ রোগে আক্রান্ত ধানের শীষ খাদ্য গ্রহণ ক্ষমতা হারিয়ে শীষ সাদা হয়ে মরে যায়। সময়মত ছত্রাকনাশক স্প্রে করে এ রোগ সহজেই দমন করা যায়।
এ রোগের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে গত এক সপ্তাহ আগে থেকে ১০ জনকে নিয়ে ৪টি গ্রুপ করা হয়েছে। ২৬ জন উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তা ও ২১ জন কৃষি ডিপ্লোমা পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীসহ মোট ৪০ জনকে নিয়ে উপজেলার ১৪৪টি গ্রামে কৃষক ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। অধিক মাত্রায় নাইট্রোজেন সার ব্যবহার, বাতাসের আর্দ্রতা এ রোগের প্রকোপ বাড়ায়। আক্রান্ত জমিতে ছত্রাকনাশক নাটিভো, ট্রুপার, ফিলিয়া, ব্লাস্টিন, টাটাভো ভালোভাবে স্প্রে করে গাছ ভিজিয়ে দিয়ে এ রোগ দমন করা যায়। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে টিম গঠন করে কৃষক সচেতনতাকরণ, পরামর্শ প্রদান ও লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে এ রোগের প্রদুর্ভাব বেশী দেখা যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ