বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

স্বর্ণলতা

আহসান হাবিব বুলবুল : চলন বিলের পাড়ে ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা রোদ ঝলমলে একটি গ্রাম সোনাপুর। অনেক রাতে ডাহুকের ডাক, ভোরে বিলের পাড়ে বড় বড় ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ এ গ্রামের মানুষগুলোকে যেন প্রতিনিয়তই সংগ্রামী করে তোলে।
স্বামী হারানোর পর শক্ত এক বালুচরে আটকে যায় জমিলা বিবির জীবনতরী। নদীর পানি কেটে জীবনের সে চর মাড়াতে হয় তাকে।
স্বামী নজিবর রহমান যাবার আগে বলে গিয়েছিল আর যদি ফিরে না আসি মেয়েটাকে সোনার মত করে মানুষ করো। স্বামীর সেই স্বপ্ন বুকে আগলে ধরে জমিলা বিবি সংসারের হাল ধরেছে। জীবনের হাল আর নৌকার হাল আজ তাই একই সূতায় বাঁধা পড়েছে। স্বামীর রেখে যাওয়া ছোট্ট একটু বসত ভিটা আর একটা ডিঙ্গি নৌকা তাদের এখন একমাত্র সম্বল। চলন বিলে নৌকা বেয়ে শাপলা-শালুক তুলে, ঝিনুক কুড়ায়ে অথবা কাউকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে যে আয় হয় তাই দিয়ে তাদের সংসার চলে।
খরস্রোতা চলনবিল আজ মৃত প্রায়। শুষ্ক মৌসুমে বিলের বিস্তীর্ণ বুক জুড়ে ধান চাষ হয়। সবুজের সমারোহ ভরে যায় দিগন্ত জোড়া মাঠ। ধান কাটার মৌসুম এলে ধান কুড়ানোর ধুম পড়ে। তখন ভালই চলে তাদের।
জমিলা বিবি মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। স্বর্ণলতা। মায়ে ডাকে লতাবানু। লতাবানু পঞ্চম শ্রেণীতে উঠেছে। মেয়েকে নিয়ে মায়ের অনেক ভাবনা। মেয়ে বড় হচ্ছে। আর ক’দিনই বা কাছে ধরে রাখতে পারবে। পরের ঘরে বউ হয়ে যাবে। স্বামীর স্বপ্ন কি সফল হবে। এসব ভাবনা জমিলা বিবিকে আচ্ছন্ন করে।
জানোস মা, চলন বিলে নাকি সোনা পাওয়া যায়।
ঠিকোই কইসোছ মা। চলন বিলের ধান, চলন বিলের মাছ ফলফলাদি সবই তো সোনা। কিন্তু সেই সব কি আর আমাগো কিসমতে আছে?
ক্যান নাই মা! আমরা গরিব সেই লাইগ্যা। দেইখো একদিন আমরা ঝিনুক কুড়ায়্যা ঠিকোই মুক্তা পামু। সেদিন আমাগো অ-নে-ক ট্যাহা হইব। আর কোন দুঃখ থাকব না।
 লতাবানুর কথা শুনে জামিলা বিবি মেয়ের দিকে ছলছল চোখে তাকায়। ভাবে মানুষটা যদি বেঁচে থাকত, আমার স্বর্ণলতার কোন দুঃখ থাকত না। লতার মত তরতর করে বেড়ে ওঠা মেয়েটা আমার আজ এতিম।
কি ভাবছোস মা?
তোর কথা ভাবি। এ্যাই তুই আজ ডাঙ্গর হইছোস। তোর বাপে যদি আজ বাইচা থাকত তোরে কততো আদর যতনি করত।
জমিলা বিবি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকে।
বাজানের কথা মনে করায়্যা দিয়া তোমাকে কষ্ট দিলাম।
কষ্ট নারে মা, তোর বাপে তো আমাগো সবার গর্ব। তোর বাপে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিছে। ক’দিন পর স্বাধীনতার দিন আসব, কতো মানষে তারে স্মরণ করব।
আইচ্ছা মা বাজানে কেমুন আছিল।
 তোর বাপে খুব ভালা মানুষ আছিল রে। দ্যাখতো তোর লাহান সুন্দর আছিল। তুই তহন কোলে। ছয় মাস। দ্যাশের লাইগা সেই যে যুদ্ধে গেল আর ফিরল না। জমিলা বিবি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, জানোস বানু, তোর বাপে সখ কইরা তোর নাম রাখছিল স্বর্ণলতা। আমাগো গ্রামের নামটা তোর নামের নাহাল। সোনাপুর।
লতাবানু নদীর মতই দুরন্ত। কৈশোর তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। মাঠে ঘাটে দৌড় ঝাঁপ পেড়ে, বন্ধুদের সাথে গোল্লাছুট ছিঃ-বুড়ি খেলে সময় কাটে। সোনাপুরের ঝোঁপ-ঝাড় স্বর্ণলতায় ঘেরা। দূর থেকে মনে হয় সোনালী আলো ঝলমল করছে। লতাবানু কখনো এই আলোয় চোখ ম্যালে। তখন তার মনটা বিষাদে ভরে যায়। আববু কেমন ছিল। আববুর কোন স্মৃতি তার মনে পড়ে না। স্বর্ণলতার মায়ায় পড়েই হয়ত আববু তার নাম রেখেছিল স্বর্ণলতা।
লতাবানু এখন অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। মায়ের কষ্টের কথা বোঝে। পড়াশোনার ফাঁকে তাই লতাবানু মায়ের সাথে ঝিনুক কুড়াতে যায় বিলে। ভালই আয় হয়। চুনের আড়তেও ঝিনুক বিক্রি হয়। কিন্তু আগের মত আর বিলে ঝিনুক পাওয়া যায় না। আজকাল অনেকেই এ কাজে নেমেছে।
লতাবানু ঝিনুক পেলেই ভেঙে দেখে ভিতরে মুক্তা আছে কি না। কোনদিন দু’একটাও পেয়েও যায়। সেদিন তার আনন্দের সীমা থাকে না। সঙ্গীদের কাছে বাহবা নেয়। লতাবানু মুক্তা পেলেই সযতনে রেখে দেয়। ভাবে অনেকগুলো মুক্তা জড়ো হলে ও রেশমি সুতায় মালা গাঁথবে।
সেদিন আকাশে ছিল না চাঁদ। ওঠেনি তারারা। লতাবানু একটার পর একটা মুক্তা দিয়ে মালা গেঁথেই চলেছে। মুক্তার আলোয় ঝিলমিল করছে ওর দু’চোখ। কার আববু আসবে। ও আববুর হাতে তুলে দিবে মুক্তার মালা। অপেক্ষার রাত আর পোহাতে চায় না। শেষে ভোর হল। মুয়াজ্জিনের আজান ভেসে আসছে দূর থেকে।
রক্তিম আভায় রঞ্জিত হল পূর্বাকাশ। নীল আকাশে লাল সূর্যটা ওর মালার মতোই দেখাচ্ছে। লতাবানু এগিয়ে চলেছে।
সামনে মিছিল আসছে লাখো মানুষের মিছিল। সবার মুখে নতুন দিনের আবাহন। হাতে সবুজে মোড়ানো লাল সূর্য। হ্যাঁ ওই মিছিলেই আববু আছে। লতাবানু ছুটছে। একদম মিছিলের কাছে এসে পড়েছে লতাবানু। একঝাঁক শ্বেত কপোত মিছিলের ওপর উড়ছে। কিন্তু না, ওর আববু আসেনি। লতাবানু বাজান বলে চিৎকার করে ওঠে। জমিলা বিবি পাশ ফেরে মেয়েকে কোলের ভিতর টেনে নেয়। ততক্ষণে সূর্যের মিষ্টি আলো জানালার শিক গলিয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করছে। আলো ছায়ায় লতাবানুর মুখখানি স্বর্ণলতার মতোই ঝলমল করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ