মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

জঙ্গিবাদ বৈশ্বিক সমস্যা ॥ ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে-প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার : জঙ্গিবাদকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,  জঙ্গিবাদ আজ কোন নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়। আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। তা না হলে আবার অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব নতুন এক উপদ্রবের মুখোমুখি হয়েছে। সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। মানুষের শান্তি বিনষ্ট করছে। জঙ্গিবাদ আজ কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। তা না হলে আমরা আবার অন্ধকার যুগে ফিরে যাবো।

গতকাল শনিবার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত ১৩৬তম আইপিইউ সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এসোসিয়েশনের সভাপতি এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে আইপিইউ সভাপতি সাবের হোসের চৌধুরী, আইপিইউ মহাসচিব মার্টিন চুংগংও বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের সহকারি আ-ার সেক্রেটারি জেনারেল মিরেস্লাভ ইয়ানকা জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গ্যুতারেজের বাণী পড়ে শোনান। 

ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের জনপ্রতিনিধিরা এই সম্মেলন থেকে গৃহীত পরিকল্পনা নিজ নিজ দেশে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে বিশ্বকে শান্তি, উন্নতি ও প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমাদের মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য পূরণে আপনারা যে পরিশ্রম করছেন, তা সফল হবে। আপনাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।

বাংলাদেশে আইপিইউ’র ১৩৬তম সম্মেলন আয়োজনের ঘটনাকে দেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সংসদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৮৬ সালে আমি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আইপিইউ সম্মেলনে অংশ নিয়েছি। এই সম্মেলনকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। কারণ গণতন্ত্র কেবল কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি মাধ্যম। আইপিইউ সম্মেলন গণতন্ত্রের এই উদ্দেশ্য পূরণে ভূমিকা রাখে।

বৈশ্বিক জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এই মহৎ সমাবেশের সামনে বিষয়টি আরেকবার উত্থাপন করছি এ কারণে যে, এই পরিবর্তনের ফলে আমরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে পরিত্রাণের জন্য যে সহায়তার প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন ফোরামে দেয়া হয়েছে, সেগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছি।

বক্তব্যের শুরুতেই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া অতিথিদের উষ্ণ অভিনন্দন ও স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত। আমরা গণতন্ত্রকে শুধু একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখি না বরং গণতন্ত্রকে মানুষের সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাহন হিসেবে গণ্য করি। 

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার আদায় ও স্বাধীনতা অর্জনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন এবং দেশগড়ার পথে তার পরবর্তী লড়াই ও নির্মম হত্যাকা-ের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশ সামরিক শাসকের অধীনে চলে যায়। আমি দেশে ফিরে শুরু করি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। জনগণের অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্যই সবসময় চেষ্টা করি। কিন্তু এই পথ মসৃণ ছিল না। আমাকে কারাবরণ করতে হয়েছে, মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে, এমনকি প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে আমাকে। ওই হামলায় আমাদের সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীই প্রাণ হারিয়েছেন। তবুুও গণতন্ত্র সুরক্ষিত রাখার সংগ্রাম থেকে পিছিয়ে আসিনি।

আইপিইউ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। তবে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষুধা ও অপুষ্টি। বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোতে শিশুরা পুষ্টির অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। কিন্তু অন্যদিকে বিশ্বে একদল মানুষ প্রাচুর্যের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দরকার একটু সহযোগিতা। পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে সবাই এগিয়ে এলে বিশ্বকে এক মুহূর্তে ক্ষুধামুক্ত করা সম্ভব। বাংলাদেশে একটি দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, ন্যায়-ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য তার সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ, মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিক মিশনের সদস্যবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং অংশ গ্রহণকারি দেশসমূহের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও সংসদ সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আইপিইউ ওয়েব টেলিভিশন উদ্বোধন করেন এবং দিবসটি স্মরণে ডাক টিকেট ও খাম অবমুক্ত করেন।

এবারের সম্মেলনের থিম বা মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘সমাজের বৈষম্য নিরসনের মাধ্যমে সবার মর্যাদা ও মঙ্গল সাধন।’ শিশুর অধিকার বিষয়ে কাজ করে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কৈলাশ সারথী সম্মেলনে এ বিষয়ে আজ রোববার একটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। 

১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক এই ফোরামে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো বিশ্বের আইন প্রণেতাদের দীর্ঘদিনের পুরানো এই সংগঠনের সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ হয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বের ১৩১ টি দেশের ৬৫০ জন সংসদ সদস্য, ৫৩ জন স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং ২০৯ জন নারী পার্লামেন্টারিয়ানসহ মোট ১ হাজার ৩৪৮ জন প্রতিনিধি এই বৃহৎ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। তারা বৈষম্য নিরসন, নারীর ক্ষমতায়নে সংসদের ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করবেন। 

সম্মেলনের অন্যান্য কর্মসূচি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের ৫টি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে। আইপিইউ’র একজন মুখপাত্র দিনের কর্মসূচি শেষে মিডিয়া সেন্টরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন। সম্মেলনে যোগ দিতে আসা অতিথিরা নগরীর ১৫টি হোটেলে থাকছেন। 

সম্মেলন শেষ হবে ৫ এপ্রিল। আইপিইউ প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী শুক্রবার জানিয়েছেন, সম্মেলন উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই সম্মেলন বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরতে বাংলাদেশের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ আজ বৈশ্বিক সমস্যা। শুধু সাময়িকভাবে জঙ্গিবাদকে মোকাবিলা করা ঠিক হবে না। আসন্ন আইপিইউ সম্মেলনে এ দিকে দৃষ্টি দিতে চাই।

১৮৮৯ সালে আইপিইউ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম সদর দপ্তর ছিল সুইজারল্যান্ডে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ