বুধবার ২৫ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

শিক্ষার্থীরা শিক্ষক ও প্রকাশকের কাছে জিম্মি

মুরাদনগর (কুমিল্লা) থেকে আবু ইউসুফ : কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার প্রায় ৪৫১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক লক্ষ শিক্ষার্থী গাইড বই প্রকাশকের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বছরের শুরুতে এ সব বই কিনতে দোকানগুলোতে বাধ্য হয়ে ভিড় করছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এমনকি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রকাশনার গাইড ও ব্যাকরণ বই বুক লিস্ট প্রদানের মাধ্যমে  কেনার জন্য প্রধান শিক্ষক ও সহকারি শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাধ্য করাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ দিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত নোট ও গাইড বই বিক্রি বন্ধে মোবাইল কোর্টসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা থাকা ও গত ৯ জানুয়ারি উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত রহস্যজনক কারণে বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত দুই মাস পেরিয়ে গেলেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় অভিভাবকদের মাঝে ক্ষোভ সঞ্চার হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকার শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের জন্য যুক্ত করেছে সৃজনশীল পদ্ধতি। একই সঙ্গে সরকার ও দেশের সর্বোচ্চ আদালত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নোট ও গাইড বই বিপণন, প্রদর্শন, প্রস্তুতকরণ, মুদ্রণ ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মুরাদনগর উপজেলার এক শ্রেণির লাইব্রেরি মালিকরা ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত নোট ও গাইড বইয়ের মজুদ গড়ে তুলেছে। প্রকাশ্যেই বিক্রি করছেন চড়া দামে। এ ছাড়া লাইব্রেরি মালিক ও প্রকাশনার প্রতিনিধিরা উপজেলার ২০৩টি প্রাথমিক, ১৫৭টি কিন্ডার গার্টেন, ৫৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৩৭টি মাদরাসার অধিকাংশ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা মোটা অংকের টাকার কমিশন ও ডোনেশনের বিনিময়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা চড়াদমে পপি, সংসদ, জুপিটার, গ্যালাক্সি, একের ভিতর তিন ও দিগন্ত, আল-ফাতাহ্ নামের গাইড ও ব্যাকরণ বইয়ের বুক লিস্টের মাধ্যমে ক্রয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রামচন্দ্রপুর রামকান্ত উচ্চ বিদ্যালয়, কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম উচ্চ বিদ্যালয়, মোচাগড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয, যাত্রাপুর এ. কে উচ্চ বিদ্যালয়, শ্রীকাইল কে. কে উচ্চ বিদ্যালয়, বাশঁকাইট পি. জে উচ্চ বিদ্যালয়, নূরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, পায়ব হাজী আব্দুল গনি উচ্চ বিদ্যালয়, জাহাপুর কমলাকান্ত একাডেমি, বাঙ্গরা উমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়, ধনিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়, কোরবানপুর জি. এম উচ্চ বিদ্যালয়, বিষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পপি গাইড বইয়ের কাছে জিম্মির চিত্র। অষ্টম শ্রেণির একটি গাইড বই বিক্রি হচ্ছে ৮১০ টাকা থেকে ৯৫০ টাকায়। চতুর্থ শ্রেণির একটি গাইড বইয়ের মূল্য কমপক্ষে ৪৫০ টাকা।
স্কুল ছাত্রের অভিভাবক মহিউদ্দিন বলেন, সরকার বিনামূল্যে বই দিলেও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া আমার ছেলের জন্য স্কুল শিক্ষকদের চাপে ৬১০ টাকায় একটি গাইড বই কিনেছি। কোচিং সেন্টারের শিক্ষকদের চাহিদা অনুযায়ী অন্য প্রকাশকের আরো একটি গাইড বই কিনতে হবে।
উপজেলার প্রাণী সম্পদ হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা অভিভাবক ফাতেমা আক্তার জানান, মিতালী, ইসলামিয়া, মনি লাইব্রেরি, ফরিদ বুক ডিপো, সোহাগ ও সবুজ লাইব্রেরির মালিকরা কোচিং সেন্টার ও স্কুলের শিক্ষকদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকাশকের বুক লিস্ট ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা লিস্টে উল্লেখিত প্রকাশকের নোট, গাইড ও ব্যাকরণ বই নিদিষ্ট লাইব্রেরি থেকে চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
গাইড বই মালিকের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে পায়ব হাজী আব্দুল গনি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের স্কুলের সকল শিক্ষক পিকনিকে যাওয়ার জন্য ৪০ হাজার টাকা দিয়েছে একটি গাইড বই মালিক পক্ষ। তবে আমরা ছাত্রদেরকে ওই বই কিনতে চাপ দেই না।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার এএনএম মাহবুব আলম জানান, শিক্ষকরা গাইড বই মালিকদের সাথে কোন প্রকার চুক্তি না করার জন্য তাদেরকে কড়া ভাবে নিষেধ করেছি। তার পরও কিছু শিক্ষক নিষেধ অপেক্ষা করেছে। আমি বিষয়টি দেখব।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সফিউল আলম তালুকদার বলেন, শিক্ষক সংগঠন আমাদেরকে তোয়াক্কা করে না। তারা তাদের মতো চলে। গাইড বই মালিক থেকে শিক্ষকরা যে উপঢৌকন নেয় তা আমার কানে এসেছে। আমি তা উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থাপন করেছি। এখন বিষয়টি কর্তৃপক্ষ দেখবে।
বিষয়টির ব্যাপারে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো বক্তব্য আসলে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রাসেলুল কাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিষয়টি নিভৃত করার চেষ্টা করেছেন।
কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার আবদুল মজিদ বলেন, নোট-গাইডের সঙ্গে শিক্ষকেরা জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর বাজারে নোট-গাইডের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের বই সরবরাহ করা হচ্ছে। আলাদা ভাবে কোন বই কেনার প্রয়োজন নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ