শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

মানবাধিকার প্রসঙ্গ : একটি অন্তরঙ্গ দৃষ্টিপাত

জিয়া হাবীব আহ্সান : [চার]
১৯। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার : ইসলামী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু অমুসলিমরা তাদের সমস্ত সামাজিক অধিকার ভোগ করে থাকে। ইসলামী আইনে অমুসলিমদের জীবন ও স¤পত্তির নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে। একইভাবে তাদের শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে, রয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতা। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আমার ধর্ম আমার কাছে।”
২০। নারীর সতীত্বের নিরাপত্তা : কুরআন মাজীদ থেকে আরো একটি মৌলিক অধিকারের কথা আমরা জানতে পারি। এ সম্পর্কে হাদীসেও বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে। সেটি হলো, নারীদের মান-সম্মানের প্রতি সর্বাবস্থায় অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে। কুরআনের নির্দেশ অনুসারে যে কোন নারীর সাথে ব্যভিচার হারাম। সে নারী মুসলিম হোক বা অমুসলিম, স্বজাতির হউক বা বিজাতির এবং বন্ধুদেশের হউক বা শত্রুদেশের তাতে কিছু আসে যায় না।
২১। পারিতোষিক ও বিনিময় লাভের অধিকার : ইসলামী রাষ্ট্রে শ্রমিক, চাষী এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে কেউ বিনা পারিশ্রমিকে খাটাতে পারবে না। তাদের ন্যায়সংগত পারিতোষিক তাদের দিতেই হবে। এই ব্যাপারে বলা আছে :
(ক) আল কুরআন : “তোমার মজুর হিসাবে উত্তম হবে সে, যে হবে শক্তিশালী বিশ্বস্ত” (কাসাস : ২৬)।
(খ) আল হাদিস : শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার মজুরী দিয়ে দাও।
(গ) নজীর : হযরত উমর (রা.) এর অভ্যাস ছিল যে, তিনি প্রত্যেক শনিবার মদীনার আশেপাশে তদারকি করতেন এবং কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজে নিয়োজিত দেখলে তার কাজের বোঝা লাঘব করে দিতেন।
২২। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় হেরে গেলে সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অধিকার : পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহকারী ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসুল (সা.) আল্লাহর বন্ধু বলে আখ্যায়িত করেছেন। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সবাই সমান কৃতিত্ব দেখাতে পারে না। এ প্রতিযোগিতায় যারা হেরে গেলো কোন বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে তারা অর্থনৈতিক জগতে ক্রমশ অধঃপতিত হতে থাকাটাই স্বাভাবিক। আবার সমাজে এমন কিছু লোক থাকে যারা নিজেদের অর্থ-সম্পদ আহরণের যোগ্যতাই রাখে না। অথচ এদেরও থাকে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদির চাহিদা। অন্ধ, পাগল, বিকলাঙ্গ, প্রতিবন্ধী লোকেরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দারুণভাবে বঞ্চিত। দরিদ্র বিধবা, দরিদ্র ইয়াতীম আদম সন্তান এবং চির রোগীরাও একই ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হন। ইসলাম সমাজ নানাভাবে বঞ্চিত অথবা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়া মানুষগুলোকে অসহায়ভাবে ছেড়ে দেয় না। বরং এই জীবন-বিধান দুস্থ মানবতার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বিধান করে থাকে। মেহেরবান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “তাদের স¤পদে সাহায্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে” (সূরা আয-যারিয়াত : ১৯)। এ উদ্দেশ্যেই ধনীদের স¤পদের উপর যাকাত ফরজ করা হয়েছে। সরকারের কর্তব্য হচ্ছে যাকাত সংগ্রহ করে তা সুষ্ঠুভাবে সমাজের দুস্থ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাতে একজন মানুষও অন্ন-বস্ত্র, চিকিৎসাহীন না থাকে।
২৩। অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসীদের অধিকার : ইসলামী রাষ্ট্র অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে তাদের কখনই বাধ্য করবে না ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতে। বরং তাদের ধর্মীয় বিধিবিধান পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। রাসূল (সা.) নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে স¤পাদিত চুক্তিতে তাদের ধর্মীয় নিরাপত্তাকে এভাবে নিশ্চয়তা দান করেছেন, “কোন ধর্মযাজককেই গীর্জা থেকে বহিষ্কার করা হবে না, তাদের কোনরূপ অবমাননা করা হবে না। মুসলিম সৈনিকরা তাদের ভূমি জবরদখল করবে না, তাদের সাথে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে আচরণ করা হবে” (বালাযুরী প্রণীত ফতুহুল বুলদান, পৃ.৬৫)।
অন্যত্র ২য় হিজরী শতাব্দীতে মীনার খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিনামায় তিনি এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হন যে, “আমি এ মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছি, কোন খ্রিস্টান ধর্মযাজককেই বিতাড়িত করা হবে না, তাদের উপাসনালয়ের কোনরূপ ক্ষতিসাধন করা হবে না, তাদের গীর্জা হতে মসজিদের জন্য কোন কিছু আনা হবে না। কোন মুসলমান এরূপ করলে সে আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে খ্রিস্টানদের প্রতি কোনরূপ জবরদস্তি করা হবে না। তাদের সঙ্গে সদাচরণ করা হবে, তাদের ওপর জুলুম করা হতে বিরত থাকা হবে, তারা যেখানেই থাকুক তাদের সাথে সম্মানজনক আচরণ করা হবে” (জুরজি যাইদান প্রণীত তারিখে তামাদ্দুনে ইসলাম, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ১২০)। উপরিউক্ত আলোচনা হতে সুস্পষ্ট, ইসলামে ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে এ অর্থে যে, ইসলামী রাষ্ট্রে অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে জীবন যাপন ও ধর্মীয় আচার পালন করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণার ১৮ নম্বর ধারায় বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি ইসলামে স্বীকৃত। তবে এ ধারাতে ধর্ম পরিবর্তনের স্বাধীনতার বিষয়টিকে ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না। যদিও ইসলাম অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টিকে স্বাগত জানায়, কিন্তু কোন মুসলমানের ইসলাম ধর্ম ত্যাগের অনুমতি দেয় না। কারণ ইসলাম এ বিষয়কে ইসলামী সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করার শামিল বলে মনে করে এবং একে ইসলামের বিরুদ্ধে এক রকম বিদ্রোহ বলে মনে করে। বিশেষত যদি কেউ জন্মসূত্রে মুসলমান হয়ে থাকে সে যদি ইসলামকে ত্যাগ করে তবে তার এ কর্মকে ইসলামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে ধরা হয়। কারণ এরূপ ব্যক্তি ইসলামী পরিবেশে ইসলামের মৌল নীতিকে পূর্ণরূপে অনুধাবন করার পরও তাকে বর্জন করেছে। ইসলামী আইনে সে মুরতাদ হিসেবে পরিগণিত এবং মৃত্যুদ-ের শাস্তিতে দ-িত।
২৪। নারী ও ইয়াতীমের অধিকার: ইসলামপূর্ব যুগে আরব-অনারব জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে দুর্বল, ইয়াতীম, বালক-বালিকা ও অবলা নারী চিরকালই জুলুম ও বঞ্চনার শিকার ছিল। তাদের অধিকারকে স্বীকার করা হত না। কোন অধিকার পাওনা হলেও তা আবার তাদের আদায় করার সাধ্য ছিল না। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে চলত সমাজ। ইসলাম সেই অন্যায় ধারা পরিবর্তন করে অনাথ-ইয়াতীম, শিশু ও অবলা নারীদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। তখন কন্যাশিশুকে জীবিত কবর দিত নির্দ্বিধায়। মায়া-মমতার লেশমাত্রও অবশিষ্ট ছিল না। মানবাধিকার সেখানে ছিল ভূলুণ্ঠিত। সে যুগকে এ জাতীয় বর্বরতার কারণে নাম দেয়া হয়েছিল আইয়ামে জাহিলিয়াত। সে সময়ে মুহম্মদ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আগমন ছিল বিশ্বমানবতার জন্য একটি বিশেষ করুণা। যার আগমনে পেয়ে গেল অধিকারহারা মানুষগুলো অধিকারের নিশ্চিয়তা, দিশাহারা ও শান্তিহারা মানুষ পেল শান্তি ও সহজ পথের সন্ধান। ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার তার মেরুদ- সুদৃঢ় করে দাঁড়াতে আরম্ভ করল। সুপ্রভাতের মনোমুগ্ধকর কোমল বায়ুর ন্যায় তার মহান আদর্শের হৃদয়স্পর্শী শীতল বায়ু সমগ্র পৃথিবীকে পরিণত করে দিল সুখরাজ্যে। ইয়াতীম, বিধবা ও অনাথসহ সকল শ্রেণির মানুষ পেয়ে গেল অধিকারের গ্যারান্টি। অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত, অবহেলিত, পদদলিত ও বিতাড়িত সকল মানুষ পেয়ে গেল স্ব স্ব অধিকার এবং জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তার এক অলংঘনীয় প্রতিশ্রুতি। চির অবসান হল বংশ ও মর্যাদার অহমিকার। পার্থক্য রইল না আর সাদা ও কালোর মাঝে, আরবী ও অনারবদের মাঝে। সকলেই হয়ে গেল ভাই-ভাই। আবার পৃথিবীর সকল মতবাদই নারী সমাজকে ভোগের বস্তু হিসেবে জানে এবং ব্যবহার করে থাকে। তারা সমাজে মানুষ বলেই স্বীকৃত ছিল না। একমাত্র বিশ্বনবীর মতাদর্শই নারীকে অতুল্য সম্মানিতা মায়ের মর্যাদা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত করেছে তাদের ন্যায্য পাওনা ও অধিকার। নারীসমাজের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সকল আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে মীরাসে নারীর স্বত্বাধিকার ইসলামই দান করেছে। সে পিতার সম্পত্তিতে যেমনি অংশ পাবে, তেমনি সে স্বামী ও ছেলের সম্পত্তিতেও ভাগ পাবে।
২৫। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা: ইসলামী বিচারব্যবস্থায় মানবাধিকার অনন্য বৈশিষ্ট্যের আসনে সমাসীন হয়েছে। এখানে মানুষে-মানুষে কোন পার্থক্য করা হয়নি। শাসনবিভাগ যাতে বিচারবিভাগকে প্রভাবিত করতে না পারে সেজন্য ইসলামে শুরু থেকে শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগ আলাদা করার ওপর জোর দিয়েছে। অসামরিক বিচারপতিদের দিয়ে বিচারকাজ স¤পন্ন করা হতো। খলিফা বিচারপতিদের নিয়োগ করতেন কিন্তু তারা বিচারকাজে খলিফা বা শাসনকর্তাদের অধীন হতো না। খলিফা কিংবা শাসনকর্তারা অভিযুক্ত হলে সাধারণ আসামীদের মতই তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারের সম্মুখীন হতে হতো। এমন বিচারের দৃষ্টান্তে ইসলামের ইতিহাস ভরপুর। অনেক মামলায় নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাবে খলিফারা হেরেছেন এবং এই হেরে যাওয়াকে তারা মাথা পেতে নিয়েছেন।
পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের সাথে এর প্রভেদ: পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের সাথে ইসলাম প্রদত্ত মানবাধিকারের মৌলিকভাবে এবং বিষয়গতভাবে তেমন প্রভেদ না থাকলেও ধারণাগতভাবে কতিপয় প্রভেদ পরিলক্ষিত হয়। যেমন:
(ক) উৎপত্তিগতভাবে: পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের উৎপত্তি সাধিত হয়েছে জাতিসংঘ সনদ থেকে কিংবা ইংল্যান্ডের ম্যাগনাকার্টা থেকে। পাশ্চাত্য জগতে দু’-তিন শতাব্দী আগেও মানবাধিকারের কোন ধারণার ইতিহাস নেই। কিন্তু ইসলামী মানবাধিকারের এ বিপ্লবী ধারণার সূচনা হয়েছে অনেক আগে অর্থাৎ ১৪ শত বৎসর পূর্বে।
(খ) বাস্তবায়নগতভাবে: ইসলাম কেবলমাত্র মুসলিম এবং অমুসলিমদের জন্য কিছু মৌলিক মানবাধিকারের ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং ঐ সমস্ত অধিকার যদি কেউ লংঘন করে তাহলে বলবৎকরণের ২টি পদ্ধতি রয়েছে। যেমন: (১) একটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় আদালতের মাধ্যমে এবং অপরটি হচ্ছে (২) পরকালে অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে। যদি কোন ব্যক্তির অধিকার লংঘিত হয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার অধিকার বলবৎকরণের জন্য রাষ্ট্রীয় আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে। পক্ষান্তরে পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের এ ধরনের তেমন কোন ধারণা পরিলক্ষিত হয়নি। কেননা তার পেছনে কোন শক্তি (Authority) বা কর্তৃত্ব (Sanction) নেই যা তাকে কার্যকর করতে পারে।
(গ) শাশ্বত ও চিরন্তনগতভাবে: ইসলামে যে সমস্ত মৌলিক মানবাধিকারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, সেগুলো সার্বজনীন, শাশ্বত ও চিরন্তন। মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে ২টি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে সেগুলো প্রকৃতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় এবং যা আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে পরিলক্ষিত হয় না। অন্যদিকে পশ্চিমা মানবাধিকার তাই শাশ্বত ও চিরন্তন নয়।
(ঘ) অনুপম দৃষ্টান্তগতভাবে: ইসলাম কুরআন মাজিদে মানবাধিকারের যে ঘোষণা প্রদান করেছে এবং বিদায় হজ্জ্বের সময় নবী (সাঃ) যে সার সংক্ষেপ পেশ করেছেন তা নবী (সাঃ) স্বয়ং নিজে এবং খোলাফায়ে রাশেদীন এসব অধিকার কার্যত: প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। পক্ষান্তরে পশ্চিমা মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এরূপ কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। তাদের কথায় ও কাজে কোন মিল নেই।
(ঙ) ধর্মীয় অংশ: ১৪ শত বৎসর পূর্বে প্রদত্ত মানবাধিকারগুলো ইসলামের আকিদা, বিশ্বাস, নৈতিকতা ও ধমের অংশ হিসেবে অবশ্য পালনীয়। পক্ষান্তরে, পশ্চিমা মানবাধিকারগুলো এরূপ ধর্মীয় অংশ হিসাবে অবশ্য পালনীয় নয়।
ইসলামে মানবাধিকার লংঘনের প্রতিরোধসমূহ: ইসলাম কর্তৃক প্রদত্ত মানবাধিকার লংঘনের প্রতিরোধসমূহ অদ্বিতীয়। এই প্রতিরোধ বা নিরাপত্তাসমূহ ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহ মানবাধিকার নিশ্চিত করে এবং তা অপরিবর্তনীয় ও অসংশোধনীয় সেহেতু ব্যক্তিবিশেষ বা রাষ্ট্র দ্বারা মানবাধিকার লংঘিত হওয়া থেকে ইসলাম চিরন্তন প্রতিরোধ প্রদান করে থাকে। কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, যুক্তিতর্ক ও আইনের ভেল্কি দ্বারা এই অধিকার পরিবর্তনের ক্ষমতা আদালতেরও নেই। এই অধিকারসমূহ রাসূল (সাঃ) এর যুগে এবং তাঁর ন্যায়নিষ্ঠ খলিফাদের (রাঃ) যুগে কার্যকর হয়েছিল। ইসলামে মানবাধিকার লংঘন প্রতিরোধের আরেকটি পন্থা হলো, যখন কোন রাষ্ট্রে ইসলামী শরীয়াহ্ কর্তৃক প্রদত্ত মানবাধিকার রক্ষাব্যবস্থার তাগিদ এসেছিল ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর ঘোষণার মাধ্যমে তা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “ততক্ষণ আমার আনুগত্য কর যতক্ষণ আমি আল্লাহ এবং রাসুল (সাঃ)-এর আনুগত্য করবো।” মানবাধিকারের অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হচ্ছে রাষ্ট্র ও নাগরিকগণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ঐক্য। রাষ্ট্র ও তার প্রজাগণ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। উভয়ের অভিন্ন লক্ষ্য হলো মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো। এবং একটি আদর্শিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ।
পশ্চিমা মানবাধিকার ধারার উন্নয়ন: ১২১৫ সালে সংকলিত ম্যাগনাকার্টাকে মানবাধিকারের সর্বপ্রথম দলিল হিসেবে দাবী করা হয়। মূলত: ম্যাগানাকার্টা ছিল একটি সাধারণ চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাষ্ট্র এবং সম্ভ্রান্ত শ্রেণির মধ্যকার অধিকার রক্ষার্থে। এটাতে সমগ্র মানবজাতির অধিকার রক্ষার স¤পৃক্ততা ছিল না। অনেক দিন পরে একে মানবাধিকার প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়। ১৩৫৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একে অনুমোদনের মাধ্যমে একটি আইন প্রণয়ন করে। উল্লিখিত আইনের প্রয়োগ ব্যতীত কাউকে তার জীবন, স্বাধীনতা অথবা ভূমি হতে বঞ্চিত করা যাবে না। যাহোক, চতুর্দশ হতে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা মাত্রাতিরিক্ত ভাবে ম্যাকিয়াভ্যালি ও লুথারের মতাদর্শে প্রভাবিত হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র সাধারণ জনগণের উপর চরম ক্ষমতার অধিকার চর্চার সুযোগ পেয়ে যায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রের বলগাহীন ক্ষমতা প্রতিরোধকল্পে সাধারণ অধিকার ধারণার সূত্রপাত হয়। রুশো ও অন্যান্য দার্শনিক কর্তৃক প্রভাবিত এই আন্দোলনের ফলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সংবিধানে বর্ণিত মানবাধিকারসমূহ একটি সামগ্রিক রূপলাভ করে এবং ঘোষণা চূড়ান্তভাবে ১৯৪৮ সালে সার্বজনীন মানবাধিকার রূপে স্বীকৃতি পায়। এই সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ছাড়াও জাতিসংঘ বহুবিধ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে যথা : গণহত্যার শাস্তি ও এর প্রতিরোধ বিষয়ক সম্মেলন ১৯৪৮, নির্যাতন প্রতিরোধব্যবস্থা সংক্রান্ত ঘোষণা ১৯৭৫, শরণার্থীর মর্যাদা বিষয়ক সম্মেলন ১৯৫১, উদ্বাস্তু বিষয়ক সম্মেলন ১৯৫৪, নারীদের রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক সম্মেলন ১৯৫৩, সকল প্রকার অসহিঞ্চুতা ও ধর্মীয় বৈষম্য দূরীকরণ ঘোষণা ১৯৮১, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ১৯৬৬, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক সম্মেলন ১৯৬৬, সকল প্রকার বর্ণ বৈষম্য দূরীকরণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ১৯৬৬ ইত্যাদি। কিন্তু এই সমস্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনসমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে লক্ষ্য করা যায় যে, এই সম্মেলনগুলো দেড় সহস্রাধিক বছর পূর্বে ইসলাম ঘোষিত মানবাধিকারের সাথে ফলপ্রসূ তেমন কিছু যোগ করতে পারেনি। অধিকন্তু এই সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা, চুক্তি ও সম্মেলনগুলো হল কাগুজে বিষয়। এগুলো নির্দেশনামূলক হওয়ায় কোনটি কার্যকর হয়নি। যেমন সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সূচনা বাণী নিম্নরূপ:
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মানবিক অধিকারের এই সার্বজনীন ঘোষণাকে সকল গোষ্ঠীর ও সকল জাতির জন্য অভীষ্ট সাধারণ মান হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করছে। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিটি অংশ এই ঘোষণাকে সর্বদা মনে রেখে জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এসব অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের জনসাধারণ এবং স্বায়ত্তশাসিত ভূ-খ-ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব অধিকার ও স্বাধীনতার সার্বজনীন ও কার্যকর স্বীকৃতি প্রদান ও বাস্তবায়নের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাবে। এই সার্বজনীন ঘোষণার প্রকৃতি থেকে এটা সুস্পষ্ট যে একটি রাষ্ট্র এই ঘোষণায় স্বাক্ষর করার পরও তা মানতে বা বর্জন করতে স¤পূর্ণ স্বাধীন। আর উল্লিখিত ঘোষণায় আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের অক্ষমতা থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, এই সমস্ত সংস্থাসমূহ বাস্তব মূল্যায়ন থেকে আলংকারিক মূল্যায়ন বেশি করে থাকে। এছাড়াও এটা সর্বজন বিদিত যে, যেসব পশ্চিমা দেশ এই অধিকার অর্জনে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারাও ব্যর্থতার সম্মুখীন হচ্ছে। তারা ব্যর্থ হচ্ছে প্রথমত তাদের দ্বিমুখী নীতির কারণে। নিজ দেশের জন্যে এক রকম নীতি এবং দরিদ্র দেশগুলোর জন্যে আরেক নীতি। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে এই অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব নৈতিকতার অভাব। তাদের নিজেদেরই নৈতিক কোন মূল্যবোধ নেই যা এ জাতীয় অধিকার আইনানুগভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। উদাহরণস্বরূপ, সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১নং ধারামতে, সকল মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং অধিকার ও মর্যাদার দিক হতে সমান। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষে এই বাস্তবতাকে মেনে নেয়া প্রায় অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে যে, অধিকার ও মর্যাদার দিক হতে সকল মানুষ সমান। একজন শ্বেতাঙ্গ কোনক্রমেই একজন কৃষ্ণাঙ্গকে তার সমান ভাবতে নারাজ। ঐতিহাসিকদের মতে, মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আধুনিক পশ্চিমা বিশ্ব তার সকল বৈষয়িক উন্নতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দ্বারা শত বৎসরের চেষ্টা সত্ত্বেও যে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে তা অতি অল্প সময়ে আরবের মরু প্রান্তরে অর্জিত হয়েছিল এবং এই প্রাপ্তি খুব সহজেই ও কার্যকর উপায়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
উপসংহার: ইসলাম দুনিয়াবাসীকে মানবাধিকারের উৎকৃষ্ট উদাহরণ দিয়ে গেছে। মহানবী (সাঃ) এর বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে মানবাধিকার সম্পর্কিত এই সুদীর্ঘ আলোচনায় এ কথাই প্রতিফলিত হয়েছে যে, ইসলাম সর্বাগ্রে মানবাধিকারের সৌরভ উপহার দিয়েছে দুনিয়াবাসীকে। পশ্চিমা বিশ্বের মত কেবল উপহার পেশ করেই ক্ষান্ত হয়নি। বরং বাস্তবায়ন করে বাস্তবে তার চিত্রায়ন করে গেছে। পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারগুলো কল্পনাপ্রসূত কোন শিল্পীর তুলির নৈপুণ্য বৈ আর কিছু নয়। কিন্তু ইসলামী মানবাধিকার একটি বাস্তব ও জীবন্ত ছবি, একটি ব্লুপ্রিন্ট। বিশেষ করে এক্ষেত্রে বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ প্রণিধানযোগ্য। কেননা, দেড় হাজার বৎসর পূর্বে মহানবী (সাঃ) মানবাধিকারের যে সার-নির্যাস পেশ করেছেন তা বিংশ শতাব্দীতে বসে ভাবতে বড়ই বিস্ময় লাগে। বিশ্বের আনাচে-কানাচে, আজ মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত হচ্ছে, অধিকারহারা মানুষের মুখ থুবড়ে পড়েছে, বিশ্বের রাজপথগুলো রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। কিন্তু কেন? আজ জাতিসংঘ (পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মানবাধিকার সংগঠন) যা স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। তাহলে কি জাতিসংঘ ব্যর্থ? মানবাধিকারের বড় বড় বুলিও কি ব্যর্থ? আসুন ইসলামে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মহান আন্দোলনে নিজেদের নিবেদিত করি। কেননা মহানবী বিশ্বনবী (সাঃ) এর আদর্শ বাস্তবায়ন ছাড়া উত্তপ্ত, অশান্ত এই পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। [সমাপ্ত]
-লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার কর্মী ও সুশাসন কর্মী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ