রবিবার ২৯ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

বাংলা কবিতায় বসন্ত

মোহাম্মদ সফিউল হক : ষড়ঋতুর বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে অন্যতম বৈচিত্র্যময় দেশ। অফুরন্ত এ রূপ নব নব সাজে সজ্জিত হয়। ছয়টি ঋতুতে প্রকৃতির ছয় রকম অবস্থা দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের প্রকৃতি হয়ে ওঠে এক উদাসীন সন্ন্যাসীর মতো। তার রুক্ষ রৌদ্রের দাবদাহে মানবজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময়ে কালবৈশাখী তার উদ্দামতা নিয়ে আসে। গ্রীষ্মের পর আসে বর্ষা। বর্ষায় এ দেশের প্রকৃতিতে যেন নতুন করে প্রানের সঞ্চার হয়। তখন প্রকৃতি হয়ে ওঠে সজীব ও সতেজ। ফসল ভরা ক্ষেতগুলো দেখলে মনে হয় আবহমান। ধানসিঁড়ির সমুদ্র। তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন তার সমস্ত গ্লানি মুছে ফেলে। শরতের শেষে, শীতের আগে আসে হেমন্ত ঋতু। এ সময় সোনালী ফসলে ভরা থাকে মাঠ-ঘাট। আর সোনালি ধানের শীষে যখন বাতাসের খেলা চলে তখন বাংলার নিসর্গে স্বর্গের ছোঁয়া লাগে। হেমন্তের পর শুষ্ক শীতল চেহারা নিয়ে আসে শীত। এ সময়ে প্রকৃতি বিবর্ণ ও বিষণœ হয়ে পড়ে। শীতের বুড়ির কুয়াশার ঘোমটা খুলে প্রকৃতিতে হাজারো ফুলে রং ধরিয়ে দিতে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। ঋতুরাজের আগমনে মৃদুমন্দ দক্ষিণা বাতাসের যাদুস্পর্শে বর্ণবিরল পৃথিবীর সর্বাঙ্গে লাগে অপূর্ব পুলক প্রবাহ, বনবীথির রিক্ত শাখায় জাগে কচি কিশলয়ের অফুরন্ত উল্লাস। বাতাসের মৃদু মর্মর ধ্বনি এবং দূর বনান্তরাল থেকে ভেসে আসা কোকিলের কুহুগীতি পৃথিবীকে সৃষ্টি করে এক অপরূপ মায়া নিকেতন। অশোক পলাশের রঙিন বিহবলতায় ও শিমুল কৃষ্ণচূড়ায় বিপুল উল্লাসে, মধুমালতী ও মাধবী মঞ্জুরীর উচ্ছল গন্ধমদির প্রবলতায় সারা আকাশ তলে গন্ধ, বর্ণ ও গানের তুমুল কোলাহলে লেগে যায় এক আশ্চর্য মাতামাতি। প্রকৃতিতে কোনো কাঙালিপনা থাকে না; সে সাজে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। সঙ্গে এ দেশের কবিকুলও দু’হাতে লিখে যান নতুন ঢঙে, নতুন আবহে।
সেই প্রাচীনকাল থেকেই কবিরা বসন্তেকে নিয়ে কবিতার পঙক্তিমালা রচনা করেছেন। বসন্ত ঋতুটাকে বাংলার কবিরা তুলে ধরেছেন একটু বেশি গুরুত্ব দিয়েই। মধ্যযুগের কবি বড়– চ-ীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে বসন্তের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় দারুণভাবে। এ কাব্যের নায়িকা রাধা বসন্তের সৌন্দর্যে প্রেমিক কৃষ্ণের প্রতি আরও মোহিত হয়ে পড়ে। চারদিকে নানান পাখির গুঞ্জণে সে আরও আকুল ও ব্যাকুল হয়ে পড়ে :

বসন্ত কালে কোকিল রাএ।
মনে মনমথ সে বাণ তাএ।
আম্মার বোল সাবধান হয়;
বাহির চন্দ্রকিরণে সোঅ।
কি সুতিব আম্মে চন্দ্রকিরণে।
আধিকে বড়ায়ি দহে মদনে।
[বিরহ খ-: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন]
মধ্যযুগের অন্যতম কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। তার নির্মিত অন্যতম চরিত্র নায়িকা ফুল্লরাও বসন্তকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি :
সহজে শীতল ঋতু ফাল্গুন যে মাসে।
পোড়ায় রমণীগণ বসন্ত বাতাসে।
[ফুল্লরার বার মাসের দুঃখ: কালকেতুর উপাখ্যান]
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তও বসন্তের আবেগে নিজেকে জড়িয়েছেন। তিনিও পাখির কলরবে মুখরিত হয়েছেন। বসন্তের রঙে নিজের অন্তরকে রাঙিয়েছেন বাংলা ভাষার এ অমর শিল্পদ্রষ্টা :

নহ তুমি পিক, পাখি, বিখ্যাত ভারতে,
মাধবের বার্ত্তাবহ; যার কুহরণে
ফোটে কোটি ফুল-পুঞ্জ মঞ্জু কুঞ্জবনে! -
তবুও সঙ্গীত-রঙ্গ করিছ যে মতে
গায়ক, পুলক তাহে জনমে এ মনে!
[বসন্তে একটি পাখির প্রতি: চতুর্দশপদী কবিতাবলী]
বাংলা ভাষার অসামান্য কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বসন্তে প্রভাবিত হয়েছেন। বসন্তকে বুকে ধারণ করে তিনি আরও বেশি আবেগায়িত হয়েছেন। বলা যায়, তিনি এ ঋতুটি সম্পর্কে ভেবেছেন অনেক। নিজস্ব চিন্তার অনেকখানিই ব্যয় করেছেন এ বসন্ত নিয়ে। তিনি বসন্তকে জানিয়েছেন:
অযুতবৎসর আগে, হে বসন্ত, প্রথম ফাল্গুনে
মত্ত কৌতূহলী
প্রথম যেদিন খুলি নন্দনের দক্ষিণদুয়ার
মর্তে এলি চলি-
অকস্মাৎ দাঁড়াইলে মানবের কুটির প্রাঙ্গণে
পিতাম্বর পরি,
উতলা উত্তরী হতে উড়াইয়া উন্মাদ পবণে
মন্দার মঞ্জুরি
দলে দলে নরনারী ছুটে এল গৃহদ্বার খুলি
লয়ে বীণা বেণু,
মাতিয়া পাগল নৃত্যে হাসিয়া করিল হানাহানি
ছুঁড়ি পুষ্পরেণু।।
[বসন্ত : কল্পনা]
কবিতায় যার স্বল্প আয়ুষ্কালেই ঝরেছে ভীষণ রকম ক্ষোভ, করেছেন যিনি তীব্র প্রতিবাদ ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ চরণ লিখে। অতি প্রিয় সেই ক্ষণজন্মা কবি সুকা- ভট্টাচার্যও বসন্তে উতলা হয়ে ঠিকই সুখের ডাক দিয়েছেন, প্রাণের দোলায় দুলেছেন, অন্যকেও দুলিয়েছেন তার ‘চৈত্রদিনের গান’ কবিতায়-
চৈতীরাতের হঠাৎ হাওয়া
আমায় ডেকে বলে,
“বনানী আজ সজীব হ’ল
নতুন ফুলে ফলে ৷
এখনও কি ঘুম-বিভোর?
পাতায় পাতায় জানায় দোল
বসন্তেরই হাওয়া ৷
তোমার নবীন প্রাণে প্রাণে,
কে সে আলোর জোয়ার আনে?
নিরুদ্দেশের পানে আজি তোমার তরী বাওয়া;
তোমার প্রাণে দোল দিয়েছে বসন্তেরই হাওয়া।
বসন্ত এমনই, এ যেন মুষড়ে পড়া মানুষকে সামনে ঠেলে দেয়ার কিছু ক্ষণ। প্রচণ্ড বিপ্লব যার কবিতার পরতে পরতে সেই বিপ্লবের কবি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে, খুনেরা ফাগুন...।’ শব্দ চয়নে তিনি বিপ্লবী সুর বজায় রেখেও বসন্তের সেই একই ডাক, একই প্রাণ সঞ্চারী দোলার কথাই পক্ষান্তরে বলে গেলেন কি সুন্দর। কেবলই বিপ্লবী সুরে নয় মিষ্টি সুরের বাঁশী বাজিয়েও নজরুল বসন্ত বন্দনা করেছেন অন্য কোথাও অন্য কোন কবিতায়, এমনই তার ‘এলো বনান্তে পাগল বসন্ত’ কবিতা-
এলো বনান্তে পাগল বসন্ত।
বনে বনে মনে মনে রং সে ছড়ায় রে,চঞ্চল তরুণ দুরন্ত।
বাঁশীতে বাজায় সে বিধুর পরজ বসন্তের সুর,
পা-ু-কপোলে জাগে রং নব অনুরাগে
রাঙা হল ধূসর দিগন্ত।।
কবি সুফিয়া কামালও বসন্তকে আহ্বান জানিয়েছেন অমর পঙক্তিমালায়। তার ক্লান্ত-জীর্ণ মন বসন্তের নতুন বাতাসে নতুন করে জেগে ওঠে। তিনি আনমনা হয়ে যান। প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে তিনিও দুলে উঠেছিলেন যেন :
কখন হয়েছে শুরু বসন্তের পুষ্প সমারোহ,
কেটে গেছে শিশিরের ব্যথাঘন কুয়াশার মোহ,
বুঝি নাই- ছিলাম উন্মনা!
অকস্মাৎ দেখি শুরু হইয়াছে কী সে আনাগোনা
মধুপ অলির-
বাতায়ন পথে তারা করিয়াছে ভিড়
প্রভাতের স্বর্ণ আলো সাথে।
[বসন্তলিপি : মায়াকাজল]
বসন্তের পঙ্ক্তিমালা লিখে যে ক’জন কবি সবচেয়ে অধিক আলোচিত হয়েছেন পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এদের অন্যতম। বলা যায়, অনেকটা সাধ্যাতীত ভাষায় অলঙ্কৃত করেছেন বসন্তকে। তার কবিতায় বসন্ত পেয়েছে নতুন মহিমা :
ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত
সান-বাঁধানো ফুটপাথে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।
ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।
[ফুল ফুটুক না ফুটুক: ফুল ফুটুক]
বসন্ত নাগরিক কবি শামসুর রাহমানকেও  হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। বসন্ত বাতাস তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। বসন্ত সবাইকে সমানভাবে রাঙায়। ধনি-গরিব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বসন্তের আগমনে আপ্লুত হয়। কেননা বসন্তের সৌন্দর্য সর্বজনীন ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ