সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

মিথিলার জন্মদিন

হেলাল আরিফীন : জাফর অফিস থেকে ফিরে দেখেন মৌরি মন খারাপ করে বসে আছেন। জাফর হাতের ব্রিফকেসটা রেখে সোফায় বসতে বসতে বললেন, কী হয়েছে মৌরি? আজও তোমার মন খারাপ?
মৌরি রেগে বললেন, মন খারাপ বলছ কী, বল মেজাজ খারাপ?
কেন, মেজাজ খারাপ কেন?
কেন আবার, তোমার ছেলে? একটুও মন দিয়ে পড়াশোনা করলে তো? বাসায় যতক্ষণ থাকে সব সময় মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। মোবাইলে এতক্ষণ কী করে কে জানে।
কী আর করবে, ফেসবুকে বন্ধুদের সাথে চ্যাট ট্যাট করে। আর হয়ত-
মৌরি জাফরকে থামিয়ে দিয়ে রেগে বললেন, ছেলের কান্ডকারখানা তুমি সব জেনে বসে আছ, না? স্কুল পড়–য়া ছেলেকে দিলে স্মার্ট ফোন কিনে। এটা তোমার একদম উচিত হয় নি।
জাফর অসহায় গলায় বললেন, কী করব বল, ছেলেটা এমনভাবে আব্দার করল?
মৌরি ঝাঁঝের গলায় বললেন, ছেলেটা যদি একটা পিস্তলের আব্দার করত তাহলেও কি তুমি কিনে দিতে?
জাফর শান্ত গলায় বললেন, এসব কী বলছ তুমি? ওর বয়সী ছেলেমেয়েরা কি স্মার্ট ফোন ব্যবহার করছে না?
করছে। তবে উচ্ছন্নেও যাচ্ছে।
আকাশ বাইরে যাবার জন্যে ড্রইং রুম দিয়ে আসতেই বাবা-মায়ের সাথে চোখাচোখি হলো। মৌরি ছেলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, কোথায় যাচ্ছ?
বাইরে যাচ্ছি।
বাইরে কী জন্য?
একটা নোট  ফটোকপি করতে হবে।
নোট কোথায়? তোমার হাত তো খালি।
আকাশ ইতস্তের গলায় বলল, পিকলুর কাছে নোট। ও ফটোকপির দোকানের সামনে নোট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মিথ্যা  কথা বলছিস?
পকেট থেকে মোবাইল সেটটা বের করতে করতে বলল, মিথ্যে কথা বলছি না মা মণি। এই দেখ পিকলু কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল।
মৌরি রেগে বললেন, পিকলু কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিল, না? আমি এখন তোর সাথে যাব। পিকলু কোথায় দাঁড়িয়ে আছে দেখব। চল আমার সাথে।
জাফর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বিরক্তির গলায় বললেন, আহা, রাখ তো। আজকাল তুমি বড্ড ছেলেমানুষী কর।
মৌরি রেগে বললেন, কী বললে তুমি? আমি ছেলেমানুষী করি? আচ্ছা, আর কিস্যু বলব না তোমার ছেলেকে। যত পারে উচ্ছন্নে যাক।
মৌরি রাগে কিছুক্ষণ গজগজ করতে থাকেন।
জাফর ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, তুমি নাকি একটুও পড় না? সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে থাক?
আব্বু, আমি আর কত  পড়ব? স্কুলে  যাওয়ার আগে একটা প্রাইভেট, স্কুল থেকে ফিরে দুইটা, রাতে একটা। তারপর আবার গানের টিচার...?
মৌরি ছেলের দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে বললেন, ও, কয়েকটা টিচারের কাছে পড়েই তোমার সময় শেষ হয়ে গেল? তুমি আসলে একটা প্রোবলেম চাইল্ড। তোমাকে দিয়ে কিস্যু হবে না। না হবে ভাল রেজাল্ট, না হবে ভাল অন্য কিছু। এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকার কাজ নেই। নোট ফটোকপি করার নাম করে বাইরে যাও। বন্ধুদের সাথে আড্ডা ফাড্ডা দিয়ে আস।
আকাশ ক্ষিপ্ত গতিতে হেঁটে ড্রইং রুমের দরজা খুলে বাইরে চলে যায়। জাফর সোফায় নিজেকে এলিয়ে দিতে দিতে ভাবেন- টিন এজার একটা ছেলের সাথে মৌরির কি এরকম আচরণ করা ঠিক হচ্ছে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মৌরিও এখন একজন টিন এজার হয়ে গেছে। একটুতে ছেলেকে শুনিয়ে দিল ও একটা প্রোবলেম চাইল্ড। না, ছেলের সাথে এরকম আচরণ করাটা ওর একদম ঠিক  হচ্ছে না।
বসের মেয়ের বার্থ ডে পার্টিতে এসেছেন জাফর। সাথে মৌরি ও আকাশও রয়েছে। অচেনা কারো বার্থডে  পার্টিতে আসার আকাশের একটুও ইচ্ছে ছিল না। মৌরি ওকে জোর করে নিয়ে এসেছেন। এবং আসার আগে ওকে শুনিয়ে দিয়েছেন- তোমার আব্বুর বসের মেয়ের জন্মদিন। মেয়েটা  পড়ালেখায় না জানি কত ভাল। তবে তোমার মত মোবাইল নিয়ে যে থাকে না এটা আমি  হলফ করে বলতে পারি।
মৌরির কথা শুনে আকাশ হেসে বলেছে, আমার মত মোবাইল নিয়ে থাকতে না পারে, ট্যাব ও ল্যাপটপ নিয়ে তো থাকতে পারে? আব্বুর বসের মেয়ে বলে কথা। হা-হা-হা.....।
বসের মেয়ের নাম মিথিলা। আজ মিথিলার পনেরোতম জন্মদিন। জন্মদিনের কেক আনা  হয়েছে। কেকের চারপাশ ঘিরে পনেরোটি মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু মিথিলাই কেকের আশেপাশে নেই।
মৌরি ফিস ফিস করে বললেন, এই, তোমার বসের মেয়ে মিথিলা কই? ওকে তো দেখছি না?
হুইলচেয়ারে বসে পনেরো বছরের একটা মেয়ে এল। চেহারাটা  মনকাড়া মায়াবী। শান্ত, সুশ্রী চাহনী। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মৌরি অস্ফূট গলায় বললেন, এই কি মিথিলা?
জাফর স্ত্রীর দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকালেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ