রবিবার ২৯ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

আল মাহমুদের সাথে কথোপকথন

ড. আশরাফ পিন্টু : ১৯৯৭-এর ৩০শে মার্চ। আকাশে মেঘ। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। হঠাৎ তফাজ্জল বলল, চল কবি আল মাহমুদের বাসায় যাই। আকাশের দিকে তাকিয়ে পরোক্ষণেই প্ল্যান বানচাল করে বলল, আজ থাক অন্য একদিন যাবো। তাছাড়া তিনি ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। আগে থেকে ফোন না করে গেলে তাকে পাওয়া মুশকিল।
লিটনও সায় দিলো, এই দুপুর বেলা তাকে পাওয়া যাবে এমনটি আশা করা বাতুলতা মাত্র।
আমার মাথায় একবার পোকা ঢুকে গেলে তা সহজে বের হয় না। ইতোমধ্যে আমার মাথায় পোকা ঢুকে গেছে। কাজেই আল মাহমুদের বাসায় না যাওয়া পর্যন্ত সেটি বেরুবে না। তাই দু’বন্ধুর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও যাত্রা করলাম আল মাহমুদের বাসার উদ্দেশে। পরিবহন ধর্মঘট  চলছে। চলছি তিন বন্ধু পায়ে হাঁটা পথে- বাংলা একাডেমি থেকে মগবাজার। বৃষ্টি থেমে রোদ ঝরছে মাথার উপর।
তিনবন্ধু চলছি তো চলছি। হঠাৎ লিটন বলল, পা লেগে গেছে, দাঁড়া একটু জিরিয়ে নিই। বলেই সে রাস্তার পাশের একটি দোকানের খালি বেঞ্চিটাতে বসে পড়ল।
তফাজ্জল বলল, এত কষ্ট করে যাচ্ছি কবিকে যদি না পাওয়া যায় তবে তোর ফাইন হবে।
আমি বললাম, কষ্ট করে যাচ্ছি নিশ্চয়ই কেষ্ট মিলবে।
লিটন বলল, এ সময় কবি সংবাদপত্রের অফিসে থাকেন কাজেই না পাওয়ার সম্ভাবনা ৯৯%।
আমি বললাম যা থাকে কপালে।
অনেক জল্পনা-কল্পনার পর কবির দরজায় পৌঁছলাম। কলিংবেল টিপলাম। অনেকক্ষণ কোনো সাড়া-শব্দ নেই।
লিটন বলল, তুই যত নষ্টের গোড়া। আমাদের কথাই তো ঠিক হলো দ্যাখ কবি নেই।
চলে যাবো যাবো ভাবছি এমন সময় দোতলা থেকে একটি মেয়ে নেমে আসল গ্রিলের সামনে। বলল, কাকে চাই?
আমি বললাম, কবি আল মাহমুদকে।
মেয়েটি গ্রিলের তালা খুলে বলল, উনি দুপুরের ভাত খেতে এসেছেন; আসুন, উপরে আসুন।
আমরা ড্রয়িং রুমে ঢুকলাম। সুন্দর সাজানো-গোছানো রুম। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের বই সাজানো আছে সেলফে। মাঝে-মাঝে পুরস্কারের পদকগুলো শোভা পাচ্ছে।
হঠাৎ কবি রুমে ঢুকে বললেন, আমি এখুনি অফিসে যাচ্ছি। তোমরা কি জন্যে এসেছো ঝটপট বলো?
আমি আগেই শুনেছি আল মাহমুদ খুব ব্যস্ত লোক। এই প্রবীণ বয়সেও তিনি যুবকের মতো খাটতে পারেন। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আমরা বাংলা একাডেমির তরুণলেখক। আমাদের কিছু কবিতা আপনাকে দেখাতে এসেছি।
তিনি বললেন, আমার হাতে সময় খুবই কম। একটু পরে এলেই আমাকে পেতে না। অন্য একদিন এসো, ভালো করে দেখে দেবো।
কথাগুলো শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। সবাই চুপচাপ বসে আছি। মনে মনে ভাবছি চলে যাবো, এমন সময় কবি নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, দাও দেখি, তবে সব দেখবো না।
আমি আমার কবিতার ডায়েরিটি তাঁর হাতে তুলে দিলাম। কিছুক্ষণ দেখার পর ডায়েরিটি টেবিলের পর রেখে দিয়ে বললেন, কবিতা দেখতে ভালো লাগছে না। তারচে’ তোমাদের সাথে একটু গল্প করি। আমার জীবনের অভিজ্ঞতার গল্প, তবে সময় খুব কম।
আমরা আনন্দে একসঙ্গে লাফিয়ে উঠলাম, হ্যাঁ বলুন বলুন, সংক্ষেপে বলুন।
একবার কোলকাতা থেকে কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী এলো শামসুর রাহমান ও আমাকে দাওয়াত করতে। দু’জনেই একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। তারা আমাদের ঠিকানা দিয়ে বললেন, বেনাপোল পর্যন্ত ট্রেনে যাবেন, ওখান থেকে আমরা আপনাদের এগিয়ে নিয়ে যাবো।
আমরা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম।
এরপর একজন অনুরোধের স্বরে বলল, আমরা জসীমউদ্দীনের বাসা চিনি না, আপনারা যদি কেউ তাঁর বাসায় একটু নিয়ে যান।
হঠাৎ লিটন প্রশ্ন করল, কত সালের কথা?
আল মাহমুদ বললেন, ঠিক মনে নেই, তবে ৬৭/৬৮ সালের দিকে হবে। তিনি লিটনের প্রশ্নের জবাব দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন...
জসীমউদ্দীনের বাসায় ঢুকতে সবাই সাহস পায় না। কারণ তিনি সবার সাথে দেখা করেন না। তাঁর সঙ্গে আমার একটু ঘনিষ্ঠতা ছিল। কাজেই সরাসরি ঢুকে পড়লাম ওনাদের নিয়ে।
জসীমউদ্দীন ওদের দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা?
আমি উৎফুল্ল হয়ে বললাম, ওনারা কোলকাতা থেকে এসেছে আপনাকে একটি অনুষ্ঠানে দাওয়াত করতে।
শুনে তিনি বললেন, আমি যাবো তবে আমার কিছু শর্ত আছে।
ওরা বিনীত ভঙ্গিতে বলল, জে আজ্ঞে বলুন?
-আমাকে অনুষ্ঠানে নিতে হলে প্রধান অতিথি করে নিতে হবে।
ওরা ঘাড় নেড়ে বিনীত ভঙ্গিতে বলল, জে আজ্ঞে রাজি।
-আমার শরীর খারাপ, ট্রেনে যেতে পারব না, প্লেনে করে নিতে হবে, রাজি?
ওরা ঘাড় নেড়ে বিনীত ভঙ্গিতে বলল, জে আজ্ঞে রাজি।
-আমি যখন পৌঁছিব তখন বিমানবন্দরে প্রাদেশিক মন্ত্রীর উপস্থিত থাকতে হবেÑ আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে।
ওরা এবারো ঘাড় নেড়ে বিনীত ভঙ্গিতে বলল, জে আজ্ঞে।
জসীমউদ্দীনের কথা শুনে তো আমার আক্কেল গুড়–ম! একজন কবির এ কেমন গর্ব! এ কেমন অহঙ্কার?
হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, তাই বুঝি আপনি আমাদের সাথে এমন অহঙ্কার করছিলেন?
আল মাহমুদ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, না! না! এ অহঙ্কার বলতে আমি বুঝাচ্ছি ব্যক্তিত্বের অহঙ্কার। একজন কবিকে অবশ্যই ব্যক্তিত্ব সচেতন হতে হবে। আর এ অহঙ্কার মানে কারো সাথে কথা না বলা বা অভদ্রতা করা নয়। আমরা যখন কবির কাছে থেকে বিদায় নিলাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। কবি তড়িঘড়ি করে অফিসের দিকে পা বাড়ালেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ