রবিবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর সাহিত্যে সমাজ মানুষ এবং স্বদেশ

আবদুল হালীম খাঁ : সকল লেখকই তাদের সময়ের কথা লিখে থাকেন। তাদের সমাজ ও স্বদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে এবং লেখায় তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর সাহিত্য কর্মে তার সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় যাবতীয় বিষয়াদি উঠে এসেছে। সে সময়ে মুসলমানরা শুধু রাজ্যহারাই ছিল না, ছিল চাকরিহারা, ব্যবসা-বাণিজ্য হারা এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। মুসলমানরা প্রায় সবাই ছিল কৃষক, ভূমিহীন, বেকার। মহাজন ও জমিদারদের শোষণ এবং নির্যাতনে তারা নিঃস্ব ও সর্বহারা হয়ে পড়েছিল। এদেশে নিঃস্ব মুসলমানদের মাথাগুঁজে পড়ে থাকারও উপায় ছিল না। মহাজনের ঋণ শোধ করতে করতে তাদের জমিজমা বাড়িঘর সবই বিক্রি করে ফেলেছিল। এমনকি থালা-বাটি, ঘটি গ্লাস, সবই হারিয়েছিল। এসব সর্বহারা দলে দলে আসামের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাতায়ন’-এর ‘আসাম যাত্রী’ অধ্যায়ে এক করুন দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:
আমাদের বাড়ির লাগ প্রতিবেশী ছিল সোনা শেখ। সোনা শেখ জামালপুর মহকুমার রামনগরে গিয়ে বাড়ি করল। কারণ সেখানে জমির দাম কম। বিদায়ের দিন সোনা শেখের স্ত্রী আমাদের বাড়ি এসে আমার পিতার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগলো। আমি দৌঁড়ে ঘরে গিয়ে চোখের কোণা মুছতে লাগলাম। অর্ধশতাব্দী আগের কথা- আজো সে দৃশ্য মনে পড়লে আমার কানে সে করুণ কান্না বেজে উঠে।
বিদেশগামীর মধ্যে বেশিরভাগ লোক চলল আসামের দিকে। আসামে বেবাদী জঙ্গল, ভেঙে নিলেই জমি বের হয়; নজর নাই, নামমাত্র বিবাদী জঙ্গল, ভেঙে নিলেই জমি বের হয়; নজর নাই, নামমাত্র খাজনা, শস্য জন্মে অসম্ভব রকমের বেশি। তাদের মাতৃভূমি হতে বিদায়ের যে দৃশ্য তখন দেখেছি, তা স্মৃতির পাষাণে অক্ষয় রেখাপাত করে রেখেছে....
স্টীমার ঘাটে, রেল স্টেশনে কতবার দেখেছি সেই হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য। নারী-পুরুষ বালক-বালিকার কাফেলা চলেছে, তাদের গায় শত ছিন্ন কাপড়, তাদের পোটলায় শত ছিন্ন কাঁথা, ছেঁড়া ছালায় হাড়িপাতিল, চুনের খুটি পর্যন্ত। মায়েরা মেয়েকে বিদায় দিতে এসেছে। স্টীমার ছাড়ার সময় উপস্থিত। মেয়ে মায়ের কাছে মাথা রেখে গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে অস্থির। ঘাটের মানুষের মুখে বেদনার কাঁপন, নদীর পানি টলমল, বাতাসের বুকে মর্মাহত দোলা। জাহাজের সারেং উপরে, দাঁড়িয়ে চোখ মোছে, খালাসীদের ডেকে বলে, সবুর রে সবুর, তোরা আজ আস্তে সিঁড়ি তোল। তারপর মায়ের বাহু বন্ধন থেকে মেয়ে বিদায় হয় চিরতরে। ....
আবার দেখেছি এদের পাকিস্তান হওয়ার পর পর। জঙ্গল কেটে বাঘ মেরে, সাপ তাড়িয়ে আসামের বনকে যারা বাগানে পরিণত করেছে, তাদেরে উগ্র উৎক্ষিপ্ত- হিন্দু জাতীয়তা নির্মমভাবে তাড়িয়ে দিয়েছে। দলে দলে তারা তাদের পুরান দেশের পানে ছুটেছে। চিন্তায় ক্ষুধায় ক্লান্তিতে কতজন পথে ঢলে পড়েছে, কতজন রেল স্টেশনে এসে ভিড় করেছে, রাতে শুয়েছে, ভোরে আর চোখ মেলে নাই। বাকিরা এসে তাদের পিতা, পিতামহের গায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের পেটে নিদারুণ ক্ষুধা, তাদের বুকে নিদারুণ ব্যথা, তাদের চোখে নিদারুণ নিরাশা।’....
এ সময়ে মুসলমান কৃষকদের অবস্থা সম্পর্কে নিরোদ সি. চৌধুরী নামের এক ভদ্রলোক তার আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন যে, মুসলমান কৃষকদের আমরা হালের বলদ গরুর চেয়ে উন্নত কোনো জীব বলে গণ্য করতাম না। সত্যি ভদ্রলোক তার লেখায় মানুষরূপী যে গরু-ছাগলের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, তারা ছিলেন এদেশের মুসলমান, আমাদের পূর্ব পুরুষ, ইবরাহীম খাঁর কালের মানুষ।
বর্তমানে আমাদের জাতীয় জীবনে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষা-দীক্ষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে যে বিপুল পরিমাণে উন্নতি সাধিত হয়েছে, এ অবস্থায় থেকে সেই একশ’ বছরের পেছনের অবস্থার কথা চিন্তা করা খুব কঠিন।
আর একটি কথা। জাতীয় জাগরণের জন্য কি রকম সাহিত্য প্রয়োজন। সে রকম সাহিত্য তৎকালে আমাদের ছিল? মোটেই ছিল না। এ প্রসঙ্গে সুসাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ অতি মূল্যবান একটি কথা বলেছেন। ইবরাহীম খাঁর সাহিত্য আলোচনার সময় তাঁর কথাটি অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন,
‘আমরা সাহিত্যিকরা শুধু এই কথাই বলতে পারি যে, তমদ্দুনী আজাদী ছাড়া কোনো সাহিত্য বাঁচতে পারে না, জন্মাতেও পারে না। বাংলা আসামের সাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি, তা বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্র শরৎচন্দ্র যুগের সাহিত্যিকদের সাহিত্য। এটা খুবই উন্নত সাহিত্য। বিশেষতঃ রবীন্দ্রনাথ এ সাহিত্যকে বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে স্থান দিয়ে গিয়েছেন। তবুও সাহিত্য পূর্ববাংলার সাহিত্য নয়। এ সাহিত্যে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোন দান নেই। অর্থাৎ এ সাহিত্য থেকে মুসলিম সমাজ-প্রাণ প্রেরণা পায়নি এবং পাচ্ছেও না। এর কারণ আছে। সে কারণ এই যে, এ সাহিত্যের স্রষ্টাও মুসলমান নয়, এর স্পিরিটও মুসলমানি নয়। এর ভাষাও মুসলমানের ভাষা নয়। প্রথমতঃ এ সাহিত্যের স্পিরিটের কথাই ধরা যাক, এ সাহিত্য হিন্দু মণিষার সৃষ্টি। সুতরাং স্বভাবতই হিন্দু সংস্কৃতিকে বুনিয়াদ করে তারা সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। ঠিকই তারা করেছেন। নইলে ওটা জীবন্ত সাহিত্য হতো না। কিন্তু সত্য কথা এই যে, ঐ সাহিত্যকে মুসলমানরা তাদের জাতীয় সাহিত্য মনে করে না। কারণ ত্যাগ, বৈরাগ্য, ভক্তি প্রেম যত উঁচু দরের আদর্শ হোক, মুসলমানদের জীবনাদর্শ তা নয়। সাহিত্যের স্পিরিট সম্পর্কে যা বলেছি, বিষয়বস্তু সম্বন্ধে তাই বলতে হয়। সাহিত্যের নায়ক-নায়িকা যদি আমরা না হলাম, সাহিত্যের পটভূমি যদি আমার কর্মভূমি না হলো, সাহিত্যের বাণী যদি আমার কর্মবাণী না হলো, তবে সে সাহিত্য আমার হয় কিরূপে? আমার ঐতিহ্য আমার ইতিহাস আমার ইতিকথা এবং আমার উপকথা যে সাহিত্যের উৎস নয়, সে সাহিত্যে আমার জীবন উৎস হবে কেমন করে? সব জাতীয় চেতনাই তার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে। যতদিন সে ঐতিহ্যকে বুনিয়াদ করে সাহিত্য রচিত না হবে, ততদিন সে সাহিত্য থেকে কোনো জাতি প্রেরণা পাবে না।’
[আবুল মনসুর আহমদ, বাংলাদেশের কালচার]
ইবরাহীম খাঁ ছাত্রজীবনে অনেক কবিতা লিখেছেন। করটিয়ায় শিক্ষকতা জীবনেও কবিতা লিখেছেন। ইংরেজি, উর্দু ও ফারসি ভাষা থেকে খ্যাতিমান কবিদের কিছু কবিতা বাংলা ভাষায় কাব্যানুবাদ করেছেন। কিন্তু তার প্রকাশিত কোনো কবিতার বই নেই। তিনি একজন কথাশিল্পী। সচেতন জীবনবাদিতা এবং মানবকল্যাণকামিতা তার কথাসাহিত্যের মূলবাণী এর আখ্যানভাগের শিকড় দেশ ও সামাজিক পরিবেশে প্রোথিত। সামাজিক চিত্র ও চরিত্রকে রূপ দিতে তিনি চেষ্টা করেছেন। গ্রামের অশিক্ষিত ও দরিদ্র চরিত্রগুলো ইবরাহীম খাঁর হাতে রূপায়িত হয়েছে, সহজ স্বাভাবিকতায় ও মানবীয় মহিমায়। সহজবোধ্য আটপৌরে ভাষায় জনগণের কথাই ধ্বনিত হয়েছে তার লেখায়। বর্ণণার আতিশয্য, মনস্তাত্বিক জটিলতা ও দুর্জ্ঞেয় মনোবিশ্লেষণ দ্বারা তার রচনা ভারাক্রান্ত হয়নি কোথাও।
উদার চেতনাসমৃদ্ধ চিন্তার ফসল ইবরাহীম খাঁর কথাসাহিত্যের মানুষেরা। ইবরাহীম খাঁর কথা সাহিত্যের প্রধান বিষয়বস্তু মানুষ। তার গল্প উপন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছে চরিত্র, ঘটনা নয়। চরিত্রের চারিত্র্য প্রকাশে যতটুকু প্রয়োজন ঘটনা এসেছে ততটুকুই।
ইবরাহীম খাঁ একমাত্র উপন্যাস ‘বৌ বেগম।’ এটি একটি সংস্কার ও মিশনধর্মী উপন্যাস।
গল্প গ্রন্থ আলু বোখারা’র অধিকাংশ রচনাই রম্য প্রকৃতির। মজলিশি ঢং-এ লিখিত গল্পগুলোতে নানান বিষয়ক উইট আর হিউমার সমৃদ্ধ বর্ণনারীতিতে উপস্থাপিত হয়েছে। জীবন ও জগতের বিচিত্র বিষয়ের সমাবেশ ঘটেছে। লেখকের সুতীক্ষè জীবন দৃষ্টি তির্যক বাক্যালঙ্কারে নানা উপমা উৎপ্রেক্ষার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি প্রকৃত কর্মী সাহিত্যিক। তিনি যা ভেবেছেন, যা বিশ্বাস করেছেন, মানুষের জন্য যা কল্যাণকর মনে করেছেন, তাই লেখায় প্রকাশ করেছেন। অজ্ঞানতার অতলে নিমজ্জিত গ্রামীণ সমাজ জীবনে শিক্ষার আলো পৌঁছানোকে তিনি দায়িত্ব মনে করতেন এবং সেই অশিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে মূল্যবোধ বিকাশের জন্য লেখনীকে প্রধান অবলম্বন হিসাবে বেছে নেন। এই প্রেক্ষাপটে তার যাবতীয় রচনাই মিশনধর্মী। নিছক ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ এই নীতিতে ইবরাহীম খাঁ বিশ্বাসী ছিলেন না। সাহিত্য তার কাছে ছিল সামাজিক জাগরণ, মানব কল্যাণের হাতিয়ার, মহৎ জীবনবোধ, আদর্শ প্রচারের মাধ্যম। প্রবন্ধ, নাটক, গল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা ইত্যাদির মাধ্যমে স্বদেশের মানুষ ও স্বসমাজকে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন।
স্বদেশ ও সমাজ নির্ভরতা তার কথা সাহিত্যের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে। বিশেষ করে তাঁর ছোট গল্পে সামাজিক চিত্র ও চরিত্রকেই রূপ দিতে চেষ্টা করেছেন। খণ্ড-খণ্ড জীবনের পটে গ্রামের অশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষগুলো তাঁর হাতে রূপায়িত হয়েছে মানবীয় মহিমায়। তার গল্প উপন্যাস নাটকে যেমন চিত্রিত হয়েছে স্বদেশ ও সন্নিহিত সমাজ পরিবেশের ছবি, তেমনি রূপ পেয়েছে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের জীবন ও চরিত্র। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমার সাহিত্যের অঙ্গনে বেশিরভাগ স্থান দখল করে আছে ধোপা, নাপিত, জেলেনী, বেদেনী, কৃষক, দফতরি, দিনমজুর, সাপুড়ে, পেয়াদা, ফকিন্নী, চাকরানী, ডাকাত, খুনী, লাঠিয়াল, বারবণিতা। এ জুতাহীন অতিথিরা আমার দুয়ারে পায়ের ধুলি রেখে যায়, আমি তা আমার ভান্ডার ঘরে অমূল্য সঞ্চয় রূপে তুলে রাখি।’
ইবরাহীম খাঁ কথা সাহিত্য বিশেষ করে ছোট গল্প ও নকশা জাতীয় রচনার ক্ষেত্রে এ কথা কত যে সত্য, যারা তার ‘মানুষ’ গায়ের গোলাপ, লক্ষীছাড়া, সোনার শিকল, ওস্তাদ প্রভৃতি ছোটগল্প সংকলনের অন্তর্গত রচনাগুলো পড়েছেন, তারাই জানেন, গ্রামবাংলার সামাজিক পরিবেশ ও জনজীবনের সাথে ছিল তার গভীর নৈকট্য ও আন্তরিক সম্পর্ক। তিনি পাড়াগাঁয়ের দরিদ্র, শিক্ষাবঞ্চিত ও নানা সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ মানুষকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে, আর এ কারণেই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে তাদের জীবনালেখ্য ও চরিত্র বাস্তবতার পটে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা। ইবরাহীম খাঁর নছর পেয়াদা, মনি সাপুড়ে মহিমায় সমুজ্জ্বল অবিস্মরণীয় চরিত্র। চরিত্র সৃষ্টিতে যে তিনি খুব সুদক্ষ এরাই তার প্রমাণ।
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ জনগণের মুখের বুলি সহজবোধ্য ভাষায় জনসাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন, তাই নাগরিক জীবনের চেয়ে গ্রামীণ জীবনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। যারা গণসাহিত্য রচনা ও সাহিত্যে গণজীবন ফুটিয়ে তোলার কথা বলেন, তারাও অনেকে এমন ভাষায় ও ভঙ্গিতে লেখেন যে, জনগণ তো দূরের কথা পন্ডিতদের তার মর্মোদ্ধার করতে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইবরাহীম খাঁ তেমন দুরহতার সাধনা করেননি। তিনি গল্প উপন্যাসে সাধারণ মানুষের জীবন ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন সহজবোধ্য ভাষায় অনেকটা মজলিশী ঢঙে, ঘরোয়া বুলিতে। গ্রামীণ সমাজ পরিবেশ পারিবারিক জীবন ও চরিত্র চিত্রণে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তার ‘নছর পেয়াদা’ গল্পটি শুরু এইভাবে:
কোথায় তার বাপের বাড়ি কেউ তা জানতো না। কথার ঢং চমৎকার- শুনে লোকে মনে করতো, ওর জন্মস্থান বুঝি শান্তিপুর। কেন সে তরুণ বয়সে দেশ ছেড়ে চলে এসেছিল, তাও কেউ বলতে পারতো না। অথচ যারা তাকে দেখতো তারাই ভাবতো, এই নধর ক্লান্তি সুন্দর যুবক, আহা! না জানি কোন বুকের খাঁচা খালি করে এ নিষ্ঠুর পাখি পালিয়েছে রে।’ এই ভাষা সহজ সাবলীল এবং জনজীবনের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। ইবরাহীম খাঁর কথাসাহিত্যে আছে অনায়াস বর্ণনা ও চরিত্র চিত্রনের পরিচয়।
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ এক সময় জজকোর্টের উকিল ছিলেন, ছিলেন কলেজের প্রিন্সিপাল, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবোর্ডের প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং দেশ বিদেশের অনেক রাজা-বাদশাহর সঙ্গে উঠাবসা করেছেন। কিন্তু তিনি সমাজের এই উপরতলার লোকদের কথা সাহিত্যে তেমন একটা উল্লেখ করেননি বলা চলে, উল্লেখ করেছেন সমাজের নিচতলার ভাঙ্গাচুড়া শ্রমজীবী বেকার ভাসমান দুঃখে ম্লান মানুষগুলো। তাদের সরলতা আশা বিশ্বাস আচরণ মহত্বে মহীয়ান হয়ে ওঠেছে তার সাহিত্য। জহুর ধোপার সরলতা আর বড় মিয়ার মহত্ব উপরতলার সব বড়লোকদের মুখ ম্লান করে দিয়েছে। আর সাধারণকে এমন অসাধারণ করার যাদুকরী ক্ষমতা ছিল ইবরাহীম খাঁর হাতে। সাধারণের মধ্যেও যে কিছু অসাধারণ গুণ আছে, সেটা দেখার চোখ ছিল, বুঝার মত হৃদয় ছিল তার। তিনি তার সাহিত্য সাধনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, ‘সাহিত্য সাধনা আমার বিলাস ছিল না, এ ছিল আমার জীবনের অন্যতম তপসা। এ তপস্যার মারফত আমি আমার তন্দ্রাহত জাতিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।’
ইবরাহীম খাঁ ছিলেন রসের সম্রাট। তার রচনার পরতে পরতে আমরা তার রসিক মনের পরিচয় পাই। তিনি রস সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠকদের প্রচুর আনন্দ দিয়েছেন।
স্বদেশ ও সমাজনির্ভর হয়েই ইবরাহীম খাঁর সাহিত্য-অপরিসীম প্রাণরসে বাঙময় হয়ে ওঠেছে গঠনমূলক প্রতীতে। অনিবার্যভাবে তার রচনাশৈলীতে ফুটে উঠেছে এক বিশেষ উদ্দেশ্যময়তা।
এক অনির্বচনীয় মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তার আন্তরিকতা সর্বত্র সুস্পষ্ট। শব্দ চয়নে, বাক্য নির্মাণে, বক্তব্য প্রকাশে বিভিন্ন অনুষঙ্গ বর্ণনায় তার রসিক ও ঐশ্বর্যশীল মনের মাধুরী মেশানোর প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়।
সর্বোপরি তার সাহিত্য একাধারে রসোত্তীর্ণ ভাবের এবং সারবান সাহিত্যও বটে। তার সমকালে এবং বর্তমানেও তিনি কথাসাহিত্যে অনন্য উজ্জ্বলতায় দীপ্তিমান। স্বকীয়তা তার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার লেখা পাঠে পাঠক কখনোও ক্লান্তি বোধ করেন না বরং অনাবিল আনন্দ ও তৃপ্তি উপভোগ করেন।
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর তৎকালের আমাদের সমাজের ও গণমানুষের চরিত্র চিত্রনে একজন সফল রূপকার। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ