বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

‘ইলেক্ট্রনিক পারসন’ মর্যাদা পাচ্ছে রোবট

আবু হেনা শাহরীয়া: ‘ইলেক্ট্রনিক পারসন’ মর্যাদা পাচ্ছে রোবট।  সবার আগে ইউরোপেই রোবটদের ‘ইলেক্ট্রনিক পারসন’ হিসেবে আইনী মর্যাদা দেয়ার চিন্তা করছে। ইউরোপিয়ান পার্লমেন্টের নতুন পরিকল্পনায় এমনটা রয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড মিরর। এমইপি (মেম্বারস অফ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট) মানুষের সঙ্গে রোবট, অ্যান্ড্রয়েড এবং অন্য এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করবে তার ওপর বিস্তৃত নীতিমালা প্রস্তাব করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই যন্ত্রগুলো নতুন শৈল্পিক বিবর্তনে প্রভাব ফেলবে যা সমাজের কোন স্তরকে বাইরে রাখবে না। প্রায় সকল অত্যাধুনিক স্বচলিত রোবটকে ইলেক্ট্রনিক পারসনের পদমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এর সঙ্গে নির্দিষ্ট অধিকার এবং সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা হবে যার মধ্যে তাদের কারণে ঘটা ভাল এবং ক্ষতিকর দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’ রোবটদের জন্য মর্যাদার পরিবর্তনের আলোচনা হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেদনে বলা হয় আইনগুলোর মধ্যে সকল যন্ত্রের জন্য ‘কিল সুইচ’ (ইলেক্ট্রনিক পণ্যের জন্য যে কোন সময় তার সক্রিয়তা বন্ধ করে দেয়ার সুইচ) আইনটি অন্তর্ভুক্ত। ব্যবহারকারীর সঙ্গে রোবটের পারস্পরিক যোগাযোগ হতে হবে ‘ঝুঁকিমুক্ত বা শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতির ভয় ছাড়া।’ ইউরোপিয়ান সংসদের এমন পদক্ষেপে সম্মতি জানাননি অনেকেই। বিবিসিকে আইনী প্রতিষ্ঠানের অংশীদার লর্না ব্র্যাজেল জানান, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর চেয়ে রোবটের ‘ব্যক্তিত্ব’ পাওয়ার বেশি অধিকার নেই। ‘নীল তিমি এবং গরিলার ব্যক্তিত্ব নেই। কিন্তু আমার ধারণা তাদেরও রোবটের মতো মনুষ্যত্ব রয়েছে, তাই আমি জানি না কেন রোবটকেই মর্যাদা দিতে হবে।’ মানুষের সঙ্গে রোবটের পার্থক্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়। কয়েক দশকের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় রোবট মানুষকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হয়।
২০১৩-এর ছায়াছবি ‘হার’-এ নিঃসঙ্গ লেখক তার সব রকমের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নির্মিত ডিজিটাল এসিস্ট্যান্ট সামান্থার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। সামান্থা তার সব কাজই করে দেয়। ই-মেইল বেছে দেয়, বই ছাপাতে সাহায্য করে।
ব্যক্তিগত উপদেশ দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তার গার্লফ্রেন্ড হয়ে দাঁড়ায়। বলাবাহুল্য ডিজিটাল এসিস্ট্যান্ট সামান্থা কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন সফ্টওয়্যার যা বিস্ময়কর গতিতে শিখতে পারে। সামান্থা বৈজ্ঞানিক কল্পকথার জগতে কমপক্ষে আরও এক দশক থাকবে। তবে বিশেষ নামে তার চেয়ে কম কাজের ডিজিটাল এসিস্ট্যান্টের অস্তিত্ব আগে থেকেই রয়েছে। ২০১৭ সালে আমরা আমাদের বাড়িঘরে এই প্রযুক্তির আরও বিস্ময়কর অগ্রগতি দেখতে পাব।
চলতি ছুটির মওসুমে বিশেষ নামের রোবটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে অ্যামাজন ডটকমের ইকো এবং গুগল হোম। এই রোবটগুলো স্পীকারের মাধ্যমে তাদের ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের বিল্ট ইন মাইক্রোফোনে রুমের বাইরে থেকে শুনতে পায়। ইকো আলেক্সো নামটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার এলইডি রিংটি ব্যবহারকারীর দিকে জ্বলে উঠবে। সে যে শুনতে পাচ্ছে এর দ্বারা যেন সেটাই স্বীকার করে নেয়া হলো। এই রোবটটি প্রশ্নের জবাব দেয়, মিউজিক বাজায়, এ্যামাজন পণ্যের ফরমায়েশ দেয় এবং কৌতুক বলে। অন্যদিকে গুগল হোম এগুলো ছাড়াও গুগুল অ্যাকাউন্ট দেখাশোনা করে, ই-মেইল পাঠ করে ও লিখে এবং দিন তারিখ নোট রাখে।
গুগল ও অ্যামাজন উভয়েই তাদের এসব ডিভাইস থার্ড পার্টি ডেভেলপারের হাতে দিয়েছে যারা আবার পিৎসা অর্ডার দেয়ার টিকেট বুক করার, লাইট জ্বালান-নিভান এবং ফোনকল করার ক্ষমতা যোগ করে দিয়েছে। আমরা শীঘ্রই এসব রোবটকে স্বাস্থ্য ও ফিটনেস ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় দেখতে পাব। ফলে এই ডিভাইসগুলো মানুষকে ব্যায়ামের উন্নততর কৌশল উদ্ভাবনে এবং সময়মতো ওষুধ খাওয়ার কথা মনে রাখতে সাহায্য করবে। শুধু কি তাই এরা ডিশওয়াটার ও মাইক্রোওয়েভও নিয়ন্ত্রণ করবে, রিপ্রিজারেটরে কি রয়ে গেছে দেখতে এবং জরুরী অবস্থায় এ্যাম্বুলেন্স ডাকবে।
অনেক আগেই আমাদের সংসারের সাজসরঞ্জামগুলো ইলেকট্রিফায়েড হয়েছে অর্থাৎ বিদ্যুতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অচিরেই সেগুলো ‘কগনিফাইড’ হবে অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে যার সুযোগ পাওয়া যাবে ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে। আমরা আমাদের মেশিনের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে পারব যা স্বাভাবিক মনে হবে। মাইক্রোসফট কণ্ঠস্বর চেনার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যা মানুষের মতোই বক্তব্য দিতে এবং বহুবিধ ভাষায় অনুবাদ করতে পারবে। গুগল কণ্ঠস্বর সংশ্লেষণের এমন এক ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে যা মানুষের থেকে পার্থক্য টানা কঠিন। রোবট আমাদের ওভেনকে বলবে কিভাবে আমাদের খাবার রান্না করতে চাই এবং ওভেনের পক্ষ থেকে আমাদের প্রশ্ন করবে।
কৃত্রিম বুদ্ধির বা এআইএর অগ্রগতির ফলেই এটা সম্ভব হয়ে উঠেছে বিশেষত ডিপ লার্নিং নামে একটি ক্ষেত্র আছে যেখানে মেশিন নিউরাল নেটওয়ার্কের মধ্যেই শিখে। সেই নেটওয়ার্কে তথ্যাবলী স্তরে স্তরে প্রসেস করা এবং স্তরগুলোর মধ্যকার সংযোগগুলো অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জোরদার হয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে তারা অনেকটা মানুষের মস্তিষ্কের মতোই শেখে। শিশু যেমন তারা বাবা-মা খেলনা জীবন্ত প্রভৃতিকে চিনতে শেখে তেমনি নিউরাল নেটওয়ার্কগুলোও দৃষ্টান্ত দেখে ও সংযোগ গঠন করে শেখে। গুগলের এআই সফট্ওয়্যারও বিড়ালের এক কোটি দৃষ্টান্ত দেখার পর দুই চোখে, এই কানওয়ালা লোমশ শরীরের এই প্রাণীটিকে চিনতে শিখেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ