শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

মাধবদী থেকে বিলুপ্তির পথে প্রবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি

মোঃ আল আমিন, মাধবদী (নরসিংদী): প্রবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্পাঞ্চল মাধবদী থেকে এখন বিলুপ্ত প্রায়। কালের বিবর্তণে ঢেঁকি এখন যেন শুধু ঐতিহ্যের স্মৃতি। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। এক সময় ঢেঁকি ছিল এ অঞ্চলের গ্রাম জনপদে চাল ও চালের গুড়া তৈরীর একমাত্র মাধ্যম। বধূরা ঢেঁকিতে চাল ভাঙতো গভীর রাত থেকে ভোর সকাল পর্যন্ত। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আবহমান বাংলার ঢেঁকি হারিয়ে গেছে, এখন ঢেঁকির সেই ধুপধাপ শব্দ আর শুনা যায় না। শুনা যায়না গ্রাম্য বউ, ঝি ও কৃষাণীদের কণ্ঠের সেই চির চেনা সুর ‘ও বউ চাল ভাঙ্গে রে, ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, নতুন চাল ভাঙ্গে হেলিয়া দুলিয়া, ও বউ চাল ভাঙ্গে রে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া’। আগে অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কৃষক ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে গৃহস্থ ও কৃষাণীদের ঘরে ঘরে ধানের নতুন চাল ভাঙ্গা বা চাল গুড়া করা, আর সে চাল দিয়ে পিঠা, পুলি, ফিরনি, পায়েস তৈরী করার ধুম পড়ে যেত। বাতাসে বেসে বেড়াতো পিঠার সুঘ্রাণ। এখন ঢেঁকির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে নবান্নের উৎসবও। শিল্পাঞ্চল ম্যানচেস্টারখ্যাত নরসিংদী জেলার মাধবদী বাবুরহাটে একসময়ের জনপ্রিয় ঢেঁকির ব্যবহার এখন আর নেই। ফলে বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ জনপদের কাঠের তৈরী ঢেঁকি। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যেখানে পৌঁছেনি বিদ্যুৎ আলো সেখানেও নেই ঢেঁকির ব্যবহার। তবুও গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কেউ কেউ বাড়ীতে ঢেঁকি রাখলেও তারা তা ব্যবহার করছে না। একসময় ঢেঁকি শিল্পের বেশ কদর ছিল। যখন মানুষ ঢেঁকিতে ধান ও চাল ভেঙ্গে চিঁড়া-আটা তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করতো। তবে কৃষকের ঘরে এখন আর ঢেঁকি চোখে পড়ে না। তেল-বিদ্যুৎ চালিত মেশিন দিয়ে ধান ও চাল ভাঙার ফলে ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে। হয়ত এমন একদিন আসবে যখন ঢেঁকি আর কোথাও দেখা যাবে না। ঢেঁকি দেখার জন্য যাদু ঘরে যেতে হবে। এ যুগের ছেলে মেয়েদের ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে ও পরিচয় করিয়ে দিতে হবে ঢেকি শিল্প কি ছিল। সভ্যতার প্রয়োজনে ঢেঁকির আবির্ভাব হয়েছিল আবার গতিময় সভ্যতার সারাপথে প্রযুক্তি গত উৎকর্ষই টেঁকি বিলুপ্তি করে দিয়েছে। টেঁকি কাঠের তৈরী কুল, বাবলা, জামগাছ ইত্যাদি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো। সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাত দৈর্ঘ্য। আর পৌনে ১ হাত চওড়া। মাথার দিকে একটু পুরু এবং অগ্রভাগে সরু। এর মাথায় এক হাত কাঠের ওচা বা দস্তা থাকে। এর মাথায় লাগানো থাকে লোহার গুলা। গুলার মুখ যে নির্দিষ্ট স্থানে পড়ে সে স্থানকে গড় বলে। ধান বানতে ন্যূনতম ২ জন লোকের প্রয়োজন । সরেজমিন এ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে ঘুরে একটি ঢেঁকিও দেখতে পাওয়া যায়নি। সে সময়ে কবি সাহিত্যিকগণ ঢেঁকি কে নিয়ে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। 

আর ঢেঁকি ছাঁটা আউশ চালের পান্তা ভাত পুষ্টিমান ও খেতে খুব স্বাদ লাগতো। বর্তমান প্রজন্ম সে স্বাদ থেকে বঞ্চিত। প্রাচীনকালে ঢেঁকির ব্যবহার বেশী হলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে গ্রাম বাংলার ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে। আলম টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঢেঁকি কে নিয়ে বহু গান আমাদের এলাকার প্রবীণদের মুখে শুনেছি। এবং আমাদের মা চাচীদের ঢেঁকিতে ধান ভাঙতে দেখেছি। এখন ঢেঁকি নেই বহু গ্রামীণ গান আর শুনা যায় না। এক বৃদ্ধা মহিলা জানান, আগে ধান ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে সে চালের গুঁড়ায় পিটা-পুলি ও পায়েস তৈরী করে স্বামীকে খাওয়াতাম। কিন্তু আজ কোথাও ঢেঁকি পাওয়া যায়না। মাধবদী প্রেস ক্লাবের সাধারন সম্পাদক মোঃ হোসেন আলী বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে গ্রাম বাংলায় ঢেঁকি’র ব্যবহার কমে গেছে। 

তবে ঢেঁকি আমাদের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। ঢেঁকি একটি শিল্প হলেও এ শিল্পকে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছেনা। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ ঢেঁকি শিল্প রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য সকলের সহযোগিতা ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এবং ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প রক্ষায় সকলকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ