শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

স্বাধীনতার মাস

সাদেকুর রহমান : একাত্তরের মার্চ মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার সর্বত্র প্রতিবাদ বিক্ষোভের আগুন জ্বলছিলো। আন্দোলনমুখর এ ভূখ- যেনো জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। অসহযোগ আন্দোলনের সেই ষোড়শ দিবস আজ বৃহস্পতিবার। এ দিন ঢাকায় বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া আড়াই ঘণ্টাকাল স্থায়ী বৈঠক হয়। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সভা ও মিছিল অব্যাহত ছিলো। পুলিশ বাহিনীর মধ্যেও ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ততা পরিলক্ষিত হয়। প্রেসিডেন্টের ডিউটিতে নিয়োজিত পুলিশের ট্রাক ও জিপ গাড়িতে কালো পতাকা উড়তে দেখা যায়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে মহল্লায় মহল্লায় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের আমন্ত্রণে ঢাকার প্রেসিডেন্ট হাউজে তার সাথে আলোচনা করতে চান। সকাল ১০টা ২৭ মিনিটে শেখ মুজিব তার সহকর্মীদের নিয়ে প্রেসিডেন্ট হাউজে যান। সেখানে দুপুর একটা পর্যন্ত অবস্থান করেন। এদিন কোনো আলোচনা হয়নি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে শেখ মুজিবের কাছে জানতে চান। শেখ মুজিব পহেলা মার্চ প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর এখানে কী কী ঘটছে তার একটি বিবরণ দিয়ে সরাসরি বলেন, এখানকার ঘটনার জন্য এ দেশের মানুষ বা শেখ মুজিবকে দোষারোপ করা যায় না। শেখ মুজিব তাকে আরো বলেছেন, ৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তাকে (শেখ মুজিব) দোষারোপ করেছেন, এতে বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। তিনি প্রেসিডেন্টকে বলেন, তার যা বলার তিনি আগেই বলে দিয়েছেন। এখন যা করার প্রেসিডেন্টই করবেন। এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিব ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সামরিক আইন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, হত্যার তদন্ত ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চারটি দাবির কথা পুনরুল্লেখ করেন।

এদিন দুপুর ১টা ১০ মিনিটে প্রেসিডেন্ট হাউজ থেকে বেরিয়ে এসে গেটে অপেক্ষমাণ দেশী-বিদেশী দুই শতাধিক সাংবাদিকের সামনে শেখ মুজিব বলেন, আমরা আমাদের কথা ইয়াহিয়া খান সাহেবকে বলে এসেছি। আলোচনা শুরু হয়েছে। আরো আলোচনা হতে পারে। আপনারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। প্রেসিডেন্ট আমাদের দাবি নিয়ে উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠকে বসেছেন। পরে বিকেলে প্রেসিডেন্ট হাউজ থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা টেলিফোন করে পরের দিন সকাল ১০টায় আবার আলোচনায় বসার জন্য প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে আমন্ত্রণ জানান। শেখ মুজিব এদিন বিকেলেও সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। প্রায় একই সময়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মী ও জনতার একটি বিরাট মিছিল প্রেসিডেন্ট হাউজের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান দেয়।

এদিকে একই দিন কেন্দ্রীয় সরকারের আবগারি কর, শুল্ক ও বিক্রয় কর প্রভৃতি গ্রহণের জন্য ইস্টার্ন-মার্কেন্টাইল ব্যাংক বিশেষ একাউন্ট খোলে। বাংলাদেশ ত্যাগীদের নিয়ে এদিন প্রথম যাত্রীবাহী জাহাজ ‘এমভি শামস’ দুই সহস্রাধিক লোক নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করে। এ ছাড়া এদিন খুলনার হাদীস পার্কে জাতীয় লীগ জাতীয় সরকার গঠনের দাবিতে জনসভার আয়োজন করে। ঢাকা হাইকোর্ট বার এসোসিয়েশনের এক সভায় শেখ মুজিবের দেয়া যে কোনো নির্দেশ মেনে চলার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

২০১৪ সালের স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত মুক্তিসেনানী লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী তার ‘এবারের সংগ্রাম : ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১’ শীর্ষক গ্রন্থে ১৬ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের ফলাফল প্রসঙ্গ বর্ণনা করেন এভাবে, “পরদিন সংবাদ বের হলো : আলোচনা শেষে বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট ভবন ত্যাগ করলে বহির্দ্বারে অপেক্ষমাণ দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের জানান যে, রাজনৈতিক ও অন্যান্য পরিস্থিতি নিয়ে তারা উভয়ে আলোচনা করেছেন। জনৈক বিদেশী সাংবাদিক আলোচনার অগ্রগতি জানতে চাইলে শেখ মুজিব বলেন, আলোচনা চলছে এবং আরো চলবে। এর বেশি আমার কিছু বলার নেই। আরেক বিদেশী সাংবাদিক আলোচনার পরিবেশ বন্ধুত্বপূর্ণ কি না জানতে চাইলে শেখ সাহেব মুহূর্তকাল থেমে বলেন, সাংবাদিকদের কাছে যতটুকু বলেছি তার বেশি কিছু বলার নেই। এ সম্পর্কে আর কোনো প্রশ্ন করবেন না। পরে তিনি বলেন, আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং এ ব্যাপারে বেশ সময়ের প্রয়োজন। বিষয়টি দুই-এক মিনিটের নয়। আরেক সাংবাদিক তার ৬ দফা শর্ত ছাড়াও আলোচনায় অন্য কোনো প্রশ্ন তুলেছেন কি না জানতে চাইলে শেখ সাহেব আর কোনো মন্তব্য করতে অসম্মতি জানান।’’

একাত্তরের রণাঙ্গনের আরেক সশস্ত্র সৈনিক মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম পিএসসি তার ‘বিদ্রোহী মার্চ ১৯৭১’ গ্রন্থে এদিনের অন্যান্য ঘটনাবলীর সাথে উল্লেখ করেন, “একই তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদও সংবাদপত্রে এক বিবৃতি প্রদান করেন। পরিষদের সদস্য চতুষ্টয় বিবৃতিতে অভিযোগ করেন যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, জোহা হল, মন্নুজান হল, যশোর, রংপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ইপিআর ক্যাম্প, ফার্মগেট, দ্বিতীয় রাজধানী রায়পুরা ও কচুক্ষেতে স্বাধীনতাকামী জনগণ ও অন্যদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত রেখেছেন। তারা অভিযোগ করেন, বহু লোককে এ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া গত সোমবার রাতে ঢাকার ড্রাম ফ্যাক্টরি ও দ্বিতীয় রাজধানীতে দু’জনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারপিট করা হয়েছে। মা-বোনদের ওপর জুলুম চালিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ করা হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে এসব সৈন্যদের ফিরিয়ে নিতে বলেন।’’

এদিকে, একাত্তরের এদিন “মেশিনগান-প্রহরায় ঢাকায় আসছেন ইয়াহিয়া” শিরোনামে মার্টিন এডনের প্রতিবেদনের তৃতীয় অংশ ছাপে বৃটেনের প্রভাবশালী ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকা। যেখানে বলা হয়, “সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গুলাবারুদ, সৈন্য সামন্ত এবং সামরিক যান নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান রওয়ানা দিয়েছেন। তবে তিনি শেখ মুজিবের সাথে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে নাকি শেখ মুজিবের ধানমন্ডির বাড়িতে সংলাপে বসবেন তা জানা যায়নি। যেহেতু এই আলোচনার উপর পাকিস্তানের ভবিষ্যত নির্ভর করছে তাই জনমনে বিস্তার করছে নানা ভাবনা, আশংকা আর চিন্তার জাল। তবে মুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত বাঙালির দাবি একটাই আর তা হলো মুক্তি।” আন্দোলন রত ছাত্রদের ‘জঙ্গি এবং চরমপন্থী’ খেতাব দিয়ে মার্টিন এডন বলেন, “জঙ্গী ছাত্ররা আজ ঘোষণা দিয়েছে তারা আজ ‘বাংলাদেশ থেকে সম্পদ পাচার রোধ করা’-র জন্য চেকপোস্ট বসাবে।” 

উক্ত প্রতিবেদনে যে জিনিসটা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিলো, পূর্ব পাকিস্তান থেকে রফতানি করা সকল বৈদেশিক মুদ্রা পূর্ব পাকিস্তানে ফেরত আসছে না। ব্যাঙ্কগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নগদ অর্থ না আসায় দু’টি ব্যাংক ইতোমধ্যেই বিপদে পড়ে গেছে। একটি প্রচারণা-প্রত্যয় বাঙালিদের মধ্যে এভাবে কাজ করছে যে অনেক পশ্চিম পাকিস্তানী বিপুল অর্থ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করার চেষ্টা করছে। ইয়াহিয়া খান একদিন দিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছেন, অন্যদিকে সাথে করে নিয়ে আসছেন যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং বন্ধ করেছেন অর্থের যোগান, যার ইঙ্গিত শুভ নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ